দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে আসছেন বন বিভাগের ফরেস্টার ও ফরেস্ট গার্ডরা। এ দুটি পদে নিয়োগ পাওয়া অনেকেই নির্ধারিত চাকরির মেয়াদ পার করলেও পদোন্নতি না পেয়ে বছরের পর বছর একই পদে থেকে অবসর নিচ্ছেন। অথচ চাকরিবিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর পদোন্নতির কথা ছিল। এ বৈষম্যের বিরুদ্ধে সম্প্রতি চট্টগ্রামসহ সারা দেশে মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি থেকে শুরু করে আগাম আমরণ অনশনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পদোন্নতি বঞ্চিতরা।
বন বিভাগের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, বিধি সংশোধন নিয়ে জটিলতা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতাই এ অবস্থার জন্য দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বন বিভাগে ফরেস্ট গার্ডের পদ রয়েছে ২ হাজার ৪৫১টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ১ হাজার ৮০০ জন। এছাড়া ফরেস্টার পদ রয়েছে ১ হাজার ৩৭৮টি। তবে কর্মরত রয়েছেন ৯৪৯ জন। ১৯৯৫ সালের বন বিভাগের প্রজ্ঞাপনে চাকরির বিধানে ফরেস্টার পদে ফরেস্ট গার্ডদের ৩৩ শতাংশ পদোন্নতি পদ রাখা হয়। সেজন্য বাকি ৪২৯টি পদে ফরেস্ট গার্ড থেকে পদোন্নতি না হওয়ায় পদগুলো খালি রয়েছে। ডেপুটি ফরেস্টার পদে ৪৫৪টি পদের সবকটিই শূন্য। প্রায় ১০ বছর ধরে পদটি খালি রয়েছে।
এদিকে ফরেস্ট রেঞ্জারের পদ রয়েছে ৪০৩টি। ১৯৯৫ সালের নিয়োগবিধি অনুযায়ী পদটি শতভাগ পদোন্নতিযোগ্য ছিল। তবে ২০১৯ সালের (সংশোধিত) নিয়োগ বিধি অনুযায়ী ১০ শতাংশ পদ পদোন্নতি থেকে এবং ৩০ শতাংশ পদ বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে নিয়োগ দেয়ার বিধান রাখা হয়। এ বিধানে ৭০ শতাংশ পদোন্নতিযোগ্য হলেও ফরেস্ট রেঞ্জারের পদ খালি রয়েছে প্রায় ২৮৩টি। ৩০ শতাংশ পদ পিএসপির মাধ্যমে পূরণের কথা থাকলেও ১২১টি পদের মধ্যে ৭৮ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
বন বিভাগের চাকরি বিধানে বলা হয়েছে, ফরেস্ট গার্ড পদে নিয়োগ দেয়া হলে আট বছর চাকরি পূরণ হলে ফরেস্টার পদে পদোন্নতি পাবে। এরপর ফরেস্টার থেকে ডেপুটি ফরেস্টার পদে পদোন্নতি পেতে হলে চাকরি করতে হবে চার বছর। ডেপুটি ফরেস্টার থেকে ফরেস্ট রেঞ্জার পদে পাঁচ বছর এবং ফরেস্ট রেঞ্জার পদে ১২ বছর চাকরি করলে সহকারী বন রক্ষক পদে পদোন্নতি মিলবে। তবে ফরেস্ট গার্ড বা ফরেস্টার পদে নিয়োগপ্রাপ্তরা অন্তত ২০-৩৫ বছর চাকরি করলেও পদোন্নতি ছাড়াই অবসরে চলে গেছেন এমন কর্মচারীও রয়েছেন।
বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, ১৯৮৫ সালের নিয়োগবিধিতে ১৯৯৫ সালের নিয়োগের ফরেস্টার পদে নিয়োগে ক্ষেত্রে যোগ্যতা ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি করা হয়। এটি মূলত বেতন স্কেলের দশম গ্রেডের পদ। কিন্তু আজও ফরেস্টারদের সেই বেতন স্কেলে উত্তীর্ণ করা হয়নি। এখন ফরেস্টাররা ২০০৯ সালের বেতন স্কেলে ১৫তম গ্রেডে চাকরি করলেও তারা দশম গ্রেডে বেতন-ভাতাসহ পদোন্নতি দাবি করছেন। অন্যদিকে ফরেস্ট রেঞ্জার পদে কর্মরতরা দশম গ্রেডে চাকরি করছেন। মূলত মামলা এবং অন্যান্য জটিলতায় পদোন্নতি আটকে রয়েছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ফরেস্ট গার্ড কল্যাণ সমিতি সাধারণ সম্পাদক মো. ওমর ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফরেস্ট গার্ড পদটি ১৯তম গ্রেডের হলেও ২০০৯ সালের আইনে ১৭তম গ্রেডে বেতনভুক্ত হন। চাকরিবিধি অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট মেয়াদকাল পার হলে পদোন্নতি দিতে হবে। সব চাকরির ক্ষেত্রেই একই নিয়ম। কিন্তু বন বিভাগ এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আলাদা। বছরের পরে বছর পদোন্নতি ছাড়াই চাকরি করছেন ফরেস্ট গার্ডরা। পদোন্নতি ছাড়াই অনেকে অবসরে চলে গেছেন।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সাল বা তার আগ থেকে বিভিন্ন সময়ে যাদের ফরেস্টার পদে সরাসরি (রাজস্ব খাতে নিয়োগ) এবং উন্নয়ন প্রকল্প থেকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, তাদের চাকরি নিয়মিত করা হলেও পদোন্নতি দেয়া হয়নি। ফরেস্টারদের পদোন্নতি না হওয়ায় ফরেস্ট গার্ডদেরও পদোন্নতি দেয়া যায়নি। নিয়োগবিধি সংশোধন করে পদোন্নতির জন্য ২০১৬ সালে মামলা করেছিলেন ১১ জন ফরেস্টার, যাদের পরবর্তীতে বদলি করা হয়। মামলা প্রত্যাহার করে নিতে ২০২৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক বন ও পরিবেশমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ চৌধুরী ফরেস্টারদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে মামলা প্রত্যাহার করে নিয়ে আগামী তিন মাসের মধ্যে সমস্যা সমাধান করে শতভাগ পদোন্নতির আশ্বাসও দিয়েছিলেন তিনি। পরে ফরেস্টাররা মামলা প্রত্যাহার করে নিলেও সে সমস্যার সমাধান হয়নি।
এদিকে বাংলাদেশ ফরেস্টার ও ফরেস্ট গার্ড পদোন্নতি বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ দাবি আদায়ে কর্মসূচি দিয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ১৫ এপ্রিল দেশব্যাপী বন বিভাগ ও বন অঞ্চলে মানববন্ধন, ২৮-৩০ এপ্রিল দেশের বন বিভাগের নিয়ন্ত্রিত বিট ও রেঞ্জ কার্যালয়ের আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ বিভাগীয় কার্যালয়ে জমা দেয়া, ৪-৮ মে ফরেস্টার ও ফরেস্ট গার্ড বিভাগীয় দপ্তর ও অঞ্চলে একটানা অবস্থান ধর্মঘট পালন করবেন। এছাড়া ১৫ মে ঢাকায় বন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে অবস্থান ও দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করা হবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফরেস্টার ও ফরেস্ট গার্ড পদোন্নতি বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. নাজমুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চাকরিবিধি অনুযায়ী চার বছর পরে ডেপুটি ফরেস্টার, তার পাঁচ বছর পর ফরেস্ট রেঞ্জার এবং সেই পদে ১২ বছর চাকরি করার পর সহকারী বন সংরক্ষক পদে পদোন্নতি পাওয়ার নিয়ম রয়েছে। যারা ২৫-৩০ বছর আগে নিয়োগ পেয়েছিলেন ফরেস্টার হিসেবে, তারা এখনো একই পদে চাকরি করে আসছেন। এটা বৈষম্য। এভাবে চলতে পারে না।’