খুলনার মানুষ ভোজন প্রিয় হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে গরু ও খাসির মাংস রয়েছে তাদের পছন্দের তালিকায়। চুইঝাল আর আস্ত রসুন দিয়ে এই দুটি মাংসের ঐতিহ্যবাহী রান্না নিয়েও সুনাম রয়েছে তাদের। সময়-সুযোগ মিললেই রকমারি নানা উপকরণে গরু ও খাসির মাংসের ভোজের আয়োজন চলেই।
কিন্তু খুলনার পাইকগাছায় এক ভোজ আয়োজনে রান্নার সময় দেখা গেল অদ্ভূত ঘটনা। গরুর মাংসের রঙ বদলে সবুজ হওয়ার অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে রান্না করা মাংসের কড়াই নিয়ে থানায় হাজির হন সংশ্লিষ্টরা।
সাধারণত কাঁচা গরুর মাংসের রং লালচে বা গাঢ় লাল হয়ে থাকে। রান্নার সময় তাপের প্রভাবে মাংসের রং পরিবর্তিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সবুজ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক কোনো পরিবর্তনের সঙ্গে মেলে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় ঘটনাটি নিয়ে দেশব্যাপী শুরু হয় আলোচনা।
কেউ বলছেন, মাংসে ভেজাল থাকতে পারে, কেউ আবার মনে করছেন, রান্নার সময় কোনো রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণে এমন হতে পারে। এমনকি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারাও এ ঘটনা দেখে রীতিমতো বিস্মিত।
এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের খুলনা জেলা কর্মকর্তা ওয়ালিদ বিন হাবিব বলেন, মাংস এভাবে সবুজ হওয়ার কোনো উদাহরণ নেই। নষ্ট মাংস রান্না করলেও সবুজ হবে না। এরকম কোনো দৃষ্টান্ত আগে দেখাও যায়নি। আমার মনে হয় বেকারির কোনো রং বা কেমিক্যাল রান্নার সময়ে মাংসের মধ্যে পড়তে পারে।
তিনি আরো বলেন, মাংসের রং পরিবর্তন মানেই তাতে ভেজাল বা বিষাক্ত কোনো পদার্থ মেশানো হয়েছে-এমন সিদ্ধান্তেও সরাসরি পৌঁছানো যায় না। মাংসের অবস্থা, সংরক্ষণ, রান্নার পাত্র, রাসায়নিকের সংস্পর্শ এবং জীবাণুর কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কারণে খাদ্যের চেহারায় পরিবর্তন আসতে পারে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ খুলনা জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তা মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, এ ঘটনা নিয়ে কোনো কুলকিনারা খুঁজে পাচ্ছি না। এআই, গুগল কোথাও কোনো সমাধান খুঁজে পাইনি। নষ্ট মাংস রান্না করলেও তো সবুজ হয় না। রান্নার প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো গণ্ডগোল থাকতে পারে।
তিনি বলেন, বেকারিতে রান্নার সময় যে কড়াই ব্যবহার হয়েছে, সেখানে কোনো কেমিক্যাল ছিল কিনা, তা জানা যাচ্ছে না। বেকারিতে যে ধরনের কেমিক্যাল তারা ব্যবহার করেন, সেগুলোর সংস্পর্শে কোনো বিক্রিয়া ঘটেছে কিনা, সেটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জানা যাবে।
মোখলেছুর বলেন, ২১ জুলাই গরু জবাই হয়েছিল। পরদিন বেকারির কর্মচারীরা ৪ কেজি মাংস কিনেছেন। বেকারির কর্মচারীরা ছাড়া আরও স্থানীয় কয়েকজন ওই গরুর মাংস কিনেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে অন্যরকম কিছু হয়নি।
তিনি জানান, বিক্রেতার কাছ থেকে অবশিষ্ট মাংস সংগ্রহ করা হয়েছে। সেটি আগামী রোববার ঢাকার ল্যাবে পাঠানো হবে। প্রতিবেদন এলে বিস্তারিত জানা যাবে।
পাইকগাছা থানা সূত্রে জানা যায়, পাইকগাছা পৌরসভার মর্ডান বেকারির কর্মচারীরা রান্নার সময় মাংসের রং সবুজ হয়ে যেতে দেখেন। এরপর তারা রান্না করা মাংসের কড়াই নিয়ে প্রথমে ইউএনও কার্যালয়ে ও পরে তার পরামর্শ অনুযায়ী থানায় হাজির হন।
পাইকগাছা থানার ওসি জুলফিকার আলী বলেন, গত বুধবার বিকেলে বেকারির কর্মচারীরা রান্না করা মাংসের কড়াই নিয়ে থানায় এসেছিলেন। তাদের লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়। কিন্তু তারা অভিযোগ দেননি। সবুজ হয়ে যাওয়া মাংস দেখিয়ে কড়াই নিয়ে চলে যান।
ভুক্তভোগী বেকারির কর্মচারীদের ভাষ্য, তেল-মসলা দিয়ে স্বাভাবিক নিয়মে রান্না শুরুর কিছুক্ষণ পরই মাংসের স্বাভাবিক লালচে রং বদলে নীলচে-সবুজ হতে থাকে। যতই নাড়াচাড়া করা হচ্ছিল, পরিবর্তিত রং ততই গাঢ় হচ্ছিল। বিষয়টি দেখে তারা চুলা থেকে কড়াই নামিয়ে অন্যদের ডাকেন।
পরে রান্না করা মাংসসহ কড়াই নিয়ে প্রথমে যান তারা মাংস বিক্রেতার দোকানে। তিনিও এ ঘটনা দেখে বিস্মিত হন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান। সেখান তাদের থানায় যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হলে কড়াইসহ তারা থানায় যান।
বেকারির কর্মচারী বিল্লাল হোসেন বলেন, বেকারির ২৫ জন কর্মচারী বুধবার কর্মস্থলে একসঙ্গে ভোজের আয়োজন করেন। সকালে বেকারির কর্মচারী লিটন হোসেনসহ তিনজন পাইকগাছা বাজারের মাংস ব্যবসায়ী ইসমাইলের দোকানে যান।
তখন ইসমাইল তাদের জানান, আজ জবাই করা গরুর সব মাংস বিক্রি হয়ে গেছে। তবে আগের দিনের কিছু মাংস ফ্রিজে সংরক্ষিত রয়েছে। সেখান থেকে ৪ কেজি মাংস কিনে তারা রান্না শুরু করেন। মাংস রান্নার পর সবুজ রং হওয়ায় আমরা তা ফেলে দিই।