নড়াইল জেলার বৃহত্তম বিল ‘ইছামতি’তে জলাবদ্ধতার কারণে চার বছর ধরে অন্তত ১ হাজার ৬০০ একর জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষাবাদ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে আরো অন্তত ৫০০ একর জমি এক ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত ২৫ গ্রামের হাজারো কৃষক।
কৃষকদের কথা চিন্তা করে সরকার লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে খাল কাটলেও অসাধু একটি মহল বাঁধ দিয়ে দখলের কারণে বিলে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। খালে পানি নিষ্কাশনের মুখ বন্ধ করে দোকানপাট ও পাকা রাস্তা নির্মাণ করায় শুকনো মৌসুমেও বিলের পানি শুকোচ্ছে না। এছাড়া প্রভাবশালীরা অপরিকল্পিতভাবে ঘের কেটে মাছ চাষ করায় বিলে জলাবদ্ধতা বেড়েছে। ফলে হাজারো কৃষক তাদের জমিতে ফসল ফলাতে পারছে না।
জানা গেছে, একসময় অবিভক্ত রাজশাহী জেলা, পরবর্তী সময়ে নাটোর জেলার দীঘাপতিয়ার জমিদারের আওতাধীন ছিল ‘বিল ইছামতি’। এরপর আত্মীয়তা কিংবা প্রজাসূত্রে দীঘাপতিয়ার জমিদার ‘বিল ইছামতি’সহ আশপাশের এলাকাগুলো নড়াইলের জমিদার রতন রায় চৌধুরী ও ঝিনাইদহ জেলার নলডাঙ্গার জমিদারকে দিয়ে যান। বর্তমানে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় ‘বিল ইছামতির’
অবস্থান। পাশের মাগুরা জেলার মোহম্মদপুর উপজেলায়ও এ বিলের অংশবিশেষ রয়েছে। ‘বিল ইছামতি’
নিয়ে বই-পুস্তকও রচিত রয়েছে। সেই ‘বিল ইছামতি’র ঐতিহ্য নানা কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিসহ এ বিলে মাছেরও অভাব দেখা দিয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এ ‘ইছামতি’
বিলে চার বছর ধরে প্রায় ১ হাজার ৬০০ একর জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষাবাদ করতে পারছেন না অন্তত ২৫ গ্রামের কৃষক।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নড়াইল সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তরে এ বিলের অবস্থান। সদর ও লোহাগড়া উপজেলার অন্তত ২৫টি গ্রামের কৃষকদের জমি এ বিলে। বিলের চারপাশের অসংখ্য প্রান্তিক কৃষকের জমি এখানে। ভুক্তভোগী হাজারও কৃষকের আয়ের উৎস এ বিলের জমি। কৃষকরা জানান, দীর্ঘ চার বছর ধরে এ বিলের বেশির ভাগ স্থান থাকে পানির নিচে।
ভুক্তভোগী কৃষক তজিবর শেখ বলেন, নড়াইল জেলার বৃহত্তম বিল ‘ইছামতি’তে জলাবদ্ধতার কারণে চার বছর ধরে বোরো, আউশ ও আমন ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষাবাদ বন্ধ। এতে এ এলাকার হাজারো কৃষকের হাত মাথায় উঠেছে। অসহায় ও নিঃস্ব জীবনযাপন করছেন তারা। তাদের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ।
কৃষক সুভাস জানান, এ বিলে প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি অপরিকল্পিতভাবে ঘের কেটেছে, ফলে পানি নামতে পারছে না, এতে বিলের জলাবদ্ধতা আরো বেড়েছে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান চান সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা তার মতো আরো কয়েকজন কৃষক।
এদিকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৬ লাখ ৬৮ হাজার ২০০ টাকা ব্যয়ে ইছামতি বিলের সংযোগ বলাডাঙ্গা খালের দুই কিলোমিটার পুনর্খনন করলেও তা কোনো কাজে আসছে না। খালের মিঠাপুর অংশে নবগঙ্গা নদীর মুখ বন্ধ করে দোকানপাট ও পাকা রাস্তা নির্মাণসহ বিভিন্ন স্থানে বাঁধ এবং জলাশয় সৃষ্টি করায় ইছামতি বিলের পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। ফলে ইছামতি বিলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে আগামী বোরো মৌসুমেও কৃষকরা ধান চাষাবাদ করতে পারবেন না। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, খালের মুখে দোকানপাট উচ্ছেদ করে বিলের পানি নিরসনকল্পে দ্রুত চাষাবাদের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা হোক। এ ব্যাপারে নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজার হস্তক্ষেপ কামনা করেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা বলেন, কৃষকদের কথা চিন্তা করে বিলের জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ চলমান রয়েছে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছি।