ছোট ঘর। দেয়ালে দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। ফুটবলের আয় দিয়ে সংসার চলে না। দোদিনহোকেও হিমশিম খেতে হয়। স্ত্রী সেলেস্তে সংসারী বলেই কোনোভাবে সামলিয়ে নেন। দোদিনহো সেনাবাহিনীতে থাকার সময় বিয়ে হয়েছিল তাদের। এখন সব ব্যস্ততা ফুটবলকে ঘিরে। তাদের ঘরেই যেন স্বপ্ন হয়ে জন্মগ্রহণ করল এক দেবশিশু। শিশুর ছোট ছোট পায়ে ভবিষ্যৎ ফুটবলারকে খুঁজে পান দোদিনহো। তার পরও ফুটবলের ভূত ঝেড়ে ফেলে শিশুর নাম রাখেন এডসন আরানতেস দো নাসিমেন্তো। বিদ্যুতের আবিষ্কারক টমাস আলভা এডিসনের সঙ্গে মিলিয়ে। কিন্তু তখনো জানেন না, এডসন নয়, ছেলেটি একদিন গোটা বিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠবে পেলে নামে। হবে পাঠ্যবইয়ের অধ্যায়। মানুষের কাছে তার পরিচিতি হবে ‘ফুটবল সম্রাট’ হিসেবে। বিশ শতকে ফুটবলের মহাকাব্যকে নতুন করে রচনা করবেন তিনি।
১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করে এডসন। মা আদর করে ‘ডিকো’ বলে ডাকেন। পেলে নামের রহস্য উদঘাটনে অবশ্য অন্য একটা গল্পকে সামনে আনতে হবে। দোদিনহোর দলেই গোলকিপার ছিলেন হোসে লিনো, যার আরেক নাম ‘বিলে’। গোলকিপার হিসেবে নিয়মিত অনুশীলন করতেন বিলে। সুযোগ পেলেই পিতা দোদিনহোর সঙ্গে সেখানে যেতেন চার বছর বয়সী ডিকো। চাইতেন বিলের মতো গোলকিপার হতে। খেলার সময় কোনো গোল ফেরাতে পারলে নিজেই চিত্কার দিয়ে উঠতেন, ‘গ্রেট সেভ, বিলে’। ডিকোর উচ্চারণ খুব একটা স্পষ্ট ছিল না। ফলে বিলে শব্দটা পিলের মতো উচ্চারিত হতো প্রায়ই। পরবর্তী সময়ে জনৈক বন্ধু তাকে ক্ষেপানোর জন্য ‘পেলে’ বলে ডাকতে শুরু করে। কে জানত তখন! একজন গোলকিপারের শৈশব ও এক বন্ধুর মজায় নির্ধারিত হয়ে গেল একজন কিংবদন্তির নাম।
কয়েক বছরের ব্যবধানে দ্বিতীয় পুত্র জাইর ও কন্যা মারিয়ার জন্ম হয়। ভাগ্যান্বেষণে দোদিনহো ১৯৪৫ সালের দিকে বাউরুর একটি ফুটবল দলের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। নতুন জায়গায় নতুন রূপে ঘিরে ধরে দারিদ্র্য। তবে ছোট পেলে পছন্দ করলেন হাওয়া বদলকে। এখানেই মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পড়লেন ফুটবলের প্রেমে। সে প্রেম বড় ভয়ানক। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাউরুর রাস্তায় বন্ধুদের নিয়ে ফুটবলের সঙ্গে পড়ে থাকতেন। তাও সত্যিকার ফুটবল হলেও হতো। সত্যিকার বল কেনার সামর্থ্য নেই বলে তো আর খেলা বাদ যেতে পারে না। পেলের ফুটবলপ্রেম বাবার চোখে ধরা পড়ে দ্রুতই। সাগ্রহে শিখিয়ে দিতে থাকেন নিয়মকানুন। পিতা-পুত্রের অহেতুক কানাকানি ছিল মা সেলেস্তের অপছন্দ। চাননি ছেলেটাও বাবার মতো এক উদ্ভট জীবন বেছে নিক, যে জীবন দারিদ্র্য আর সংগ্রামে ঘেরা। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় গুরুত্ব দিতেন সেলেস্তে। ১৯৪৮ সালের দিকে কিছুটা ঘোরে ভাগ্যের চাকা। ছোট হলেও একটি চাকরি জোটে দোদিনহোর। ব্যস্ততার ফাঁকে আট বছর বয়সী পেলেকে শোনান ফুটবলার জীবনের স্মৃতি। বাবার গল্পে অতীত সফর করে আসেন বালক পেলে। ফুটবল খেলার বেতার সম্প্রচারগুলো আগ্রহ নিয়ে শোনেন। স্বপ্ন দেখেন, একদিন তার নামও রেডিওতে উচ্চারিত হবে।
সমবয়সীদের সঙ্গে পোষাত না। ফলে প্রায়ই বড়দের দলে খেলতেন পেলে। ব্রাজিলের স্বাধীনতা দিবসের কথা মাথায় রেখে ‘৭ সেপ্টেম্বর’ নামে প্রতিষ্ঠা করেন একটা ফুটবল দল। অদ্ভুত ফুটবল দল এটি। সত্যিকার বল নেই, জুতা কিংবা ইউনিফর্ম নেই, তার পরও ফুটবল দল। চাঁদা তুলে কোনোমতে বাকিগুলোর ব্যবস্থা করা গেলেও জুতা কেনা আর হয়ে উঠল না। ফলে দলের নামই বদলে ফেলা হলো। নতুন নাম ‘দ্য সু-লেস ওয়ানস’। দশ বছর বয়সে উপহার হিসেবে জুতা পেলেন পেলে। তাও ফুটবল খেলার জন্য না, চার্চে যাওয়ার জন্য। সেই জুতা পরে ফুটবলে লাথি দেয়ার লোভ সামলাতে পারেননি। সে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, যা পরবর্তী সময়ে বহুবার স্মরণ করেছেন তিনি। দলের ক্যাপ্টেন হওয়ার কারণে বলটি নিজের বাড়িতে রাখার সুযোগ পেতেন পেলে। ফলে সবার খেলা শেষ হলেও তার খেলার যেন শেষ নেই। এরই মধ্যে কোনো এক বন্ধুর বাবা ‘সু-লেস ওয়ানস’ দলটার কোচের দায়িত্ব নিলেন। হয়ে গেল জুতার ব্যবস্থাও। দলের নামটাও বদলে ফেলা হলো। নতুন নাম আমেরিকুইনহা বা ?‘ছোট আমেরিকা’। শহরের রাস্তায় রাস্তায় হতো তাদের ম্যাচ। স্থানীয় মেয়র একটা টুর্নামেন্টের আয়োজন করলেন বাউরুতে। পেলের বয়স তখন বারো। দলের হয়ে জয়সূচক গোলটা আসে তার পা থেকেই। সে কী উন্মাদনা তাকে ঘিরে! দর্শকরা ‘পেলে, পেলে’ বলে চিত্কার করছে। আগে পেলে নামটা খারাপ লাগলেও এখন নেহাত মন্দ লাগে না শুনতে।
এদিকে সারা খেলা মনোযোগ দিয়ে দেখেছেন দোদিনহো। শেষের বাঁশি বাজতে না বাজতেই জড়িয়ে ধরলেন পেলেকে, ?‘দুর্দান্ত খেলেছ তুমি, আমি নিজেও অমন খেলতে পারতাম না।’ তবে তার চেয়ে বড় চমক অপেক্ষা করছিল বাড়িতে। মা সেলেস্তে ছেলের তারকা খ্যাতিতে হাসি ফুটিয়ে তুললেন মুখে। আজীবন চোখের বালি হিসেবে দেখা ফুটবলকে প্রথমবারের মতো গ্রহণ করে নিলেন সহাস্যে। গর্ব আর উৎসাহে কয়েক গুণ বেড়ে গেল ফুটবলের প্রতি দরদ। তবে এই সফলতার পরও বেশিদিন টেকেনি ‘ছোট আমেরিকা’। ফুটবলপাগল পেলে যোগ দিলেন নবগঠিত বাউরু অ্যাথলেটিক ক্লাব বা বিএসিতে। কোচ ডি ব্রিতোর তত্ত্বাবধানে রপ্ত করেন নানা কৌশল। ডি ব্রিতো ১৯৩৪ সালে ব্রাজিলের জাতীয় দলে খেলেছেন। তাকে পেয়ে বারুদের মতো জ্বলে উঠলেন পেলে। ডি ব্রিতোও মানিক চিনতে ভুল করলেন না। তবে এ সম্পর্ক দীর্ঘ হতে পারেনি। অন্য চাকরির জন্য বাউরু ছেড়ে চলে গেলেন ডি ব্রিতো। পেলে যোগ দিলেন আরেক ক্লাব রেডিয়ামে। বয়স তখন সবেমাত্র ১৪ বছর। অথচ বড়দের দলে খেলছেন পেলে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ১৯৫৫ সালে বাউরুতে ফিরে আসেন ডি ব্রিতো। গুরু ভুলে যাননি শিষ্য পেলেকে। সান্তোস ফুটবল ক্লাবের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পরিচিতি রয়েছে তার। পেলেকে সেখানে নিতে চান। এখান থেকেই শুরু হলো পেলের জীবনের নতুন অধ্যায়। এতদিন যাদের নাম কেবল রেডিওতে শুনে এসেছেন, সান্তোসে তাদের পাশেই খেলার সুযোগ পেলেন তিনি। সান্তোসে তখন তিনটি দল। প্রথমটি ষোলো বছরের কম বয়সীদের নিয়ে। দ্বিতীয়টি সতেরো থেকে বিশ বছর বয়সীদের নিয়ে ও শেষটি মূল দল। পেলের বয়স পনেরো অথচ কোচ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে তার সুনাম। কোচ তাকে অনুশীলনের জন্য সরাসরি পাঠালেন মূল দলে। কোচকে হতাশ করেননি পেলে। ক্রমে মেলে ধরলেন নিজের সবটুকু দক্ষতা।
১৯৫৮ সাল। বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ সুইডেন। জাতীয় দলে খেলার সুযোগ না হওয়াটাই স্বাভাবিক। দল ঘোষণা করা হলো। অবাক হয়ে যান পেলে নিজেই। তাকেও নেয়া হবে সুইডেন। সতেরো বছরেও পা পড়েনি এখনো। ব্রাজিলের হয়ে উড়োজাহাজে উঠলেন পেলে। সেটি ছিল তার প্রথম উড়োজাহাজ ভ্রমণ। ইনজুরির কারণে প্রথম দুই ম্যাচ বেঞ্চেই থাকতে হলো তাকে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে তৃতীয় ম্যাচে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে নামেন পেলে। প্রথম পর্বের ভাগ্য নির্ধারণী এ ম্যাচ শেষ হয় জয় দিয়েই। টুর্নামেন্টে পেলে প্রথম গোলের দেখা পান পরের ম্যাচে। ওয়েলসের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচের গোলকে পেলে সারা জীবন স্মরণ করেছেন। পরের ম্যাচ ২৪ জুন ১৯৫৮। ফ্রান্সের সঙ্গে সেমিফাইনাল। ছোট ‘কালো মানিক’ তার সমস্ত অস্বস্তি কাটিয়ে উঠেছেন। দ্বিতীয়ার্ধ ছিল শুধুই তার। ৫-২ গোলের ব্যবধানে শেষ হওয়া ব্রাজিলের জয়ের তিনটি গোলই উপহার দেন তিনি। বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল দর্শক ও খেলোয়াড়রা। একজন টিনএজার জাদুকর কীভাবে ফুটবলকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, তা দেখে সবার চোখ ছানাবড়া। কিন্তু জাদুকর পেলে সবেমাত্র ঝাঁপি খুলেছেন। পরবর্তী ম্যাচ সুইডেনের সঙ্গে। ফাইনালে ৫-২ ব্যবধানে জয়ের দুর্দান্ত দুটি গোল আসে তার কাছ থেকে। ব্রাজিল প্রথমবারের মতো অর্জন করে বহুল প্রতীক্ষিত বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের তকমা। ফুটবলের প্রেমে বুঁদ ব্রাজিলিয়ানরা পেলেতে মুখর হলেন। উত্থান ঘটল এক জাতীয় নায়কের।
পেলে পরিণত হলেন ব্যস্ততম তারকায়। কেবল ১৯৫৯ সালেই দেশের পাঁচটি দলের হয়ে মোট ১০৩টি খেলায় অংশগ্রহণ করেন। ক্রমে হয়ে ওঠেন আরো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ক্রমে হয়ে ওঠেন আরো পরিণত। প্রতিটি ম্যাচেই তরতর করে উপরে তুলতে থাকেন তার গোলসূচক। শুধু ১৯৬১ সালের সেপ্টেম্বরের ছয়টি ম্যাচেই ২৩ গোল করেছিলেন তিনি।
এরপর এল ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপ। ইনজুরির কারণে তীব্র ভালোবাসা সত্ত্বেও মাঠে নামতে না পেরে ছটফট করেছেন একদিকে, অন্যদিকে উল্লসিত হয়েছেন দলের জয়ে। আসর শেষ হয় ব্রাজিলের চ্যাম্পিয়ন তকমা অক্ষুণ্ন রেখে। বিশ্বকাপে আশানুরূপ জাদু না দেখালেও ক্লাবে রেখেছেন দাপটের স্বাক্ষর। ১৯৬৬ সালে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ে ব্রাজিল। তবে ১৯৭০ সালে আবারো ফিরিয়ে আনে চ্যাম্পিয়ন শিরোপা। পুরো আসরে সবাই নতুন করে জ্বলে উঠতে দেখে পুরনো পেলেকে। সঙ্গে জেয়ারজিনহো ও রিভেলিনোর মতো নক্ষত্র। পরের বছর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেও জড়িয়ে থাকেন ফুটবলের সঙ্গে। ব্রাজিলের বাইরে খেলেছেন যুক্তরাষ্ট্রেও। দায়িত্ব নিয়েছেন ব্রাজিলের ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের। ফুটবল ইতিহাসের প্রথম সুপারস্টার পেলে। ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন শিরোপা স্পর্শ করেছেন। টিনএজার হিসেবে গড়েছেন বিশ্বকাপ ফাইনালে জোড়া গোলের বিশ্বরেকর্ড, যা এখনো কেউ ভাঙতে পারেনি। এখনো বিশ্বকাপে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড পেলের দখলে। নিজ শহরের ক্লাব সান্তোসের হয়ে তিনি জিতেছেন ছয়টি ক্যামপিওনাতো ব্রাসিলিরো সিরিয়ে আ, ১০টি ক্যামপিওনাতো পলিস্তা, দুটি কোপা লিবারতাদোরেস, দুটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ ও একটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল সুপারকাপ। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে জিতেছেন এনএএসএল আটলান্টিক কনফারেন্স ও নর্থ আমেরিকান সকার লিগ বোল। দুটোই ১৯৭৭ সালে। অংশ নিয়েছেন অসংখ্য প্রীতি ম্যাচে। ব্রাজিলের হয়ে ৯২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে তার গোল ৭৭টি। ফিফার অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, পেলে ১ হাজার ৩৬৩ ম্যাচে অংশগ্রহণ করে ১ হাজার ২৮১টি গোল করেছেন। ফুটবল ক্যারিয়ারে এমন বহু প্রাপ্তি ও রেকর্ড যুক্ত রয়েছে পেলে নামের সঙ্গে।