সিঙ্গাপুর নয়, ঢাকার আদর্শ হোক আফ্রিকার শহর কিগালি

আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালি। শহরটি একসময় ছিল ভয়ংকর রক্তপাতের সাক্ষী। আশির দশকের শেষদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর জাতিগত বিভাজন দেশটিকে ঠেলে দিয়েছিল সংঘাতের মুখে।

আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালি। শহরটি একসময় ছিল ভয়ংকর রক্তপাতের সাক্ষী। আশির দশকের শেষদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর জাতিগত বিভাজন দেশটিকে ঠেলে দিয়েছিল সংঘাতের মুখে। ১৯৯০ সালে রুয়ান্ডার শাসক হুতু-নিয়ন্ত্রিত সরকারের সঙ্গে তুতসি-প্রধান রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্টের (আরপিএফ) মধ্যে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। ঔপনিবেশিক আমল থেকেই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর বিভাজন ছিল, যা রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সামাজিক আধিপত্যের প্রশ্নে ক্রমে তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৯৩ সালে স্বাক্ষরিত আরুশা শান্তি চুক্তি সাময়িক স্বস্তি আনলেও ১৯৯৪ সালের ৬ এপ্রিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুভেনাল হাবিয়ারিমানার বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নেয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সংঘটিত হয় পরিকল্পিত গণহত্যা—যেখানে হুতু চরমপন্থীরা রেডিও, রাজনৈতিক মঞ্চ ও মিলিশিয়া সংগঠন ব্যবহার করে তুতসিদের নির্মূলের ডাক দেয়। মাত্র ১০০ দিনে নিহত হয় প্রায় আট লাখ মানুষ। নিহতদের অধিকাংশই তুতসি, পাশাপাশি মধ্যপন্থী হুতু; যারা হত্যাযজ্ঞের বিরোধিতা করেছিল। রাস্তা, স্কুল, চার্চ—কোথাও ছিল না নিরাপত্তা। প্রতিবেশী হয়ে উঠেছিল খুনি, বন্ধুও হয়ে উঠেছিল শত্রু। গণহত্যা ও গৃহযুদ্ধের এ যৌথ অভিঘাত কিগালিকে পরিণত করেছিল এক ভুতুড়ে নগরে। লাশের গন্ধ, ভাঙা ঘর, পুড়ে যাওয়া বাজার এবং বেঁচে থাকা মানুষের চোখে আতঙ্কের ছাপ।

মাত্র তিন দশকের মাথায় সেই ভুতুড়ে নগরের চেহারা বদলে গেছে আমূল। আজ কিগালির পাহাড়ঘেরা রাস্তায় চকচকে পেভমেন্ট, ফুটপাতে টিউলিপ ও জাকারান্ডার সারি, ধুলো-প্লাস্টিকের ছোঁয়া নেই। শহরজুড়ে পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা আর সবুজায়নের এমন সমন্বয়, যা আফ্রিকার মধ্যেই নয়, বিশ্ব নগর-পরিকল্পনার উদাহরণ হিসেবে আলোচিত।

কিন্তু কীভাবে হলো এ রূপান্তর? কী কৌশল, কী নীতি, কোন সামাজিক অভ্যাসের বদল কিগালিকে বানাল আফ্রিকার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও বিনিয়োগবান্ধব শহরগুলোর একটি? উত্তর লুকিয়ে আছে রাষ্ট্র-সমাজের একসঙ্গে চলার দর্শন—‘উমুগান্ডা’য়। দারুণ কার্যকর একটি নীতি। যেখানে পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্য, আইন প্রয়োগ, পরিকল্পনা ও জবাবদিহির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে বেসরকারি খাতের দক্ষতা।

বলা হয়, কিগালির বদলে যাওয়ার সামাজিক-রাষ্ট্রীয় ম্যাকানিজমের হৃদয় হলো ‘উমুগান্ডা’। রুয়ান্ডার ভাষায় এর অর্থ ‘একসঙ্গে একটি কাজে দাঁড়ানো’। ১৯৯৫ সাল থেকেই এ চর্চার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। ২০০৭ সালের আইনে প্রতি মাসের শেষ শনিবার সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা ‘সর্বজনীন কমিউনিটি সার্ভিস’ নাগরিক দায়িত্বে পরিণত হয়। রাস্তা পরিষ্কার, ড্রেন কাটা, গাছ লাগানো, স্কুল-ভাঙা বাড়ি মেরামতে নামে সাধারণ মানুষ—এটি বাধ্যতামূলক। স্থানীয়দের মতে, ‘যে কাজ শহরকে সুন্দর ও বাসযোগ্য রাখে, সেটাই উমুগান্ডা।’ ধারাবাহিকতা এখানে আসল শক্তি। ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সীরা এতে অংশ না নিলে গুনতে হয় জরিমানা। তিন দশক ধরে ধারাবাহিক চলে আসা ‘উমুগান্ডা’ এখন আর কাগুজে আইন নয়, নাগরিকের স্বভাব বা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

কিগালির বদলে যাওয়ার গল্পের আরেক অধ্যায় শুরু হয় পলিথিন ব্যাগকে ‘না’ বলা। ২০০৮ সালে রুয়ান্ডা বিশ্বে অগ্রণী হয়ে প্রথমে ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যাগ, পরে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক পণ্যে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বিমানবন্দরেই লাগেজ থেকে প্লাস্টিক বাজেয়াপ্ত হয়—আইন এ বিষয়ে স্পষ্ট। এটি শুধু কাগুজে আইন নয়; নাগরিক আচরণ বদলাতে জরিমানা, বিকল্প সামগ্রী এবং সর্বোপরি নাগরিক অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র একযোগে কাজ করেছে। ফলাফল রাস্তার ধারে ছড়ানো ডাস্টবিনের বদলে বাড়িভিত্তিক বর্জ্য আলাদা করা, আর তা সংগ্রহে আসে বেসরকারি কোম্পানি। আয়ভেদে ভিন্ন ফি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় প্রতিযোগিতা, জন-স্থান পরিষ্কারে সরকারি কন্ট্রাক্ট। এ যেন এক নতুন নগর-অর্থনীতি, যা শৃঙ্খলা শেখায়, চাকরি তৈরি করে, শহরকে ঝকঝকে রাখে।

কিগালির বদল শুধু ময়লা কমানোয় আটকে নেই; পুরো নগর-পরিকল্পনাই এক আপগ্রেড। ‘কিগালি মাস্টার প্ল্যান ২০৫০’ নগরকে ‘সেন্টার অব আরবান এক্সিলেন্স’ বানানোর দিগদর্শন দিয়েছে। জোনিং, সবুজ খোলা স্থান, পথচারীবান্ধব রাস্তাঘাট, মিশ্র ব্যবহারযোগ্য এলাকা, শিল্পাঞ্চল—সবকিছুর স্পষ্ট আঁকিবুঁকি। পরিকল্পনা কাগজে আটকে থাকেনি; ‘ইমিহিগো’ নামে স্থানীয় সরকার ও মন্ত্রণালয়ের পারফরম্যান্স কন্ট্রাক্ট বছরে বছরে মূল্যায়ন হয়। যার ফলে মেয়র থেকে মন্ত্রী—সবার কাজের ফল মাপে দেশ। এ জবাবদিহি শহরের কাজে, রাস্তা-ড্রেন-সার্ভিস ডেলিভারিতে গতির বিস্ময় ঘটিয়েছে।

শহরকে মানুষকেন্দ্রিক করতে কিগালি আরো এক চমৎকার অভ্যাস গড়ে তুলেছে—দুই রোববারে একবার ‘কার-ফ্রি ডে’। নির্দিষ্ট সড়ক যানবাহনমুক্ত; মানুষ হাঁটে, দৌড়ায়, সাইকেল চালায়; সঙ্গে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জনসচেতনতা, নগর-ওয়েলনেস। এতে একদিকে বায়ুদূষণ কমে, অন্যদিকে নাগরিকদের সঙ্গে শহরের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়—‘আমার শহর’ অনুভব তৈরি হয়।

এ সামাজিক শৃঙ্খলা ও নীতিনির্ধারণের ফলে অর্থনীতিও পেয়েছে দৃশ্যমান গতি। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে রুয়ান্ডার প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। মহাদেশীয় প্রেক্ষাপটে যা আকাশসমান। আর বিনিয়োগ পরিবেশে স্থিতিশীলতা, আইন-শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতার কারণে বিদেশী পুঁজি আসছে নিয়মিত। দুর্নীতি ধারণা সূচকে ২০২৪ সালে রুয়ান্ডা ৫৭ স্কোর নিয়ে আফ্রিকায় শীর্ষ সারির দেশগুলোর একটি। স্থিতিশীলতা-স্বচ্ছতার এ ইমেজ বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কিগালি স্পেশাল ইকোনমিক জোন শিল্প জমি, অবকাঠামো, লজিস্টিক সুবিধা—রফতানিমুখী উৎপাদনে নতুন পণ্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।

কিগালির পরিচ্ছন্নতা কেবল দৃষ্টিসুখ এনে দেয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি ‘সফট পাওয়ার’। পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ সুশৃঙ্খল শহর, আন্তর্জাতিক কনফারেন্স, ক্রীড়া, পর্যটন ও ব্র্যান্ডিংয়ে কিগালিকে আলাদা করে। প্লাস্টিক ব্যাগ নিষেধাজ্ঞা, বাড়িভিত্তিক বর্জ্য-ছাঁকনি, বেসরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে ‘প্রাত্যহিক শুদ্ধতা’র অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, যা নতুন কাজ, নতুন পরিষেবা, নতুন স্টার্টআপেরও ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

মাত্র তিন দশক আগে ঢাকার চেয়ে বহু গুণে পিছিয়ে ছিল কিগালি—যুদ্ধ, দারিদ্র্য, ভাঙাচোরা অবকাঠামো ছিল তার পরিচয়। অথচ আজ পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা আর উন্নয়নে আফ্রিকার দৃষ্টান্ত। বিপরীতে ঢাকা রয়ে গেছে যানজট, দূষণ আর অগোছালো নগরায়ণের চাপে, যেন পথচলার গতি উল্টো দিকে। সময়, অর্থ, স্বাস্থ্য—তিনটিতেই এক বিশাল ‘খরচের শহর’ রাজধানী ঢাকা। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন কর্মঘণ্টা ঢাকার রাস্তায় হারিয়ে যায়; যানজটের এ অর্থনৈতিক ক্ষতি বছরে বিলিয়ন ডলার। গড় গতি, উৎপাদনশীলতা, মানসিক সুস্থতা—সবই এখানে আক্রান্ত।

বুড়িগঙ্গা নদী, যা একসময় ঢাকার প্রাণ হিসেবে পরিচিত ছিল, এখন দূষণের ভারে মৃতপ্রায়। চার দশক আগেও বুড়িগঙ্গায় দুর্গন্ধ ছিল না, ছিল না দূষিত ও কালো পানি। স্বচ্ছ পানিতে সাঁতার কাটার পাশাপাশি মাছ ধরতেন স্থানীয়রা। অথচ এখন বিপরীত চিত্র। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর একটি বুড়িগঙ্গা। প্রতিদিন শহরের ৬০ হাজার ঘনমিটারেরও বেশি বিষাক্ত বর্জ্য এ নদীর পানিতে ফেলা হয়। বিভিন্ন গবেষণায়ও উঠে এসেছে—প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনমিটার অশোধিত শিল্পবর্জ্য, রাসায়নিক, প্লাস্টিক, গৃহস্থালি স্যুয়ারেজ সরাসরি এ নদীতে ফেলা হয়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বুড়িগঙ্গার পানিতে উচ্চমাত্রার পিএফএএস (পার অ্যান্ড পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল সাবস্ট্যান্স) শনাক্ত করা হয়েছে, যাকে বলা হয় ‘ফরএভার কেমিক্যাল’। এগুলো দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার, হরমোনজনিত সমস্যা, লিভারের ক্ষতি ইত্যাদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। নদীর জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি, ফলে মাছসহ জলজ প্রাণী টিকে থাকতে পারছে না। নদীর তীর দখল, পলিমাটি জমা এবং নৌযান থেকে জ্বালানি তেল নির্গমন দূষণকে আরো তীব্র করেছে। একসময়ের নাব্য ও জীবনধারার প্রতীক বুড়িগঙ্গা এখন কালো, দুর্গন্ধময় ও রোগজীবাণুর আধার; যা ঢাকার পানির উৎস ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকায় সবুজায়ন ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নগরায়ণের চাপ, অনিয়ন্ত্রিত দখল ও অবকাঠামো বিস্তারে পার্ক, উন্মুক্ত মাঠ, গাছপালা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশনের তথ্য বলছে, ঢাকার মাথাপিছু খোলা জায়গা দুই বর্গমিটারেরও কম, যেখানে ডব্লিউএইচওর সুপারিশ নয় বর্গমিটার। নতুন সড়ক, ভবন, বাণিজ্যিক কমপ্লেক্সের জন্য গাছ কাটা ও জলাভূমি ভরাট সবুজ আচ্ছাদনকে আরো সংকুচিত করছে। ফলে তাপমাত্রা বেড়ে ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব তীব্র হচ্ছে। একটি আদর্শ শহরের মোট আয়তনের অন্তত ২০ শতাংশ সবুজ স্থান থাকতে হয়। এ সবুজ শহরের ব্যস্ত নাগরিকদের স্বাস্থ্য ও মানসিক প্রশান্তি রক্ষায় যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় থাকে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, রাজধানী ঢাকায় সেই সবুজ রয়েছে ১০ শতাংশেরও কম। আবার যেটুকু রয়েছে সেখানেও নেই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, যথাযথ তদারকি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৫ সালে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে সবুজ এলাকা ও ফাঁকা জায়গা ছিল ৫৩ দশমিক ১১ বর্গকিলোমিটার। ২০২৩ সালে তা কমে ২৯ দশমিক ৮৫ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকা বহু বছর ধরেই বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর শীর্ষে। আইকিউএয়ারের ২০২৪ সালের বিশ্ব বায়ুগুণমান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বার্ষিক গড় সূক্ষ্ম ধূলিকণার মাত্রা ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকার তুলনায় বহু গুণ বেশি। এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স হিসাব বলছে, স্থায়ী দূষণের কারণে বাংলাদেশী একজন নাগরিকের গড় আয়ুষ্কাল কমছে পাঁচ-ছয় বছরের বেশি। শহরের দূষণ অদৃশ্য করের মতো সময় কেটে নেয় জীবন থেকে।

ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সরকারি তথ্যমতে, গত বছর সারা দেশে প্রায় ৫ হাজার ৩৮০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। তবে যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব বলছে, এ সংখ্যা সরকারি হিসাবে অনেক বেশি। তাদের মতে, যথাক্রমে ৮ হাজার ৫৪৩ জন ও ৭ হাজার ২৯৪ জন মারা গেছেন। শুধু ঢাকার কথা বললে রাজধানীতে ২০২৪ সালে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪৬ জন নিহত এবং ৪৮২ জন আহত হয়েছেন। ঢাকার বিভাগীয় পর্যায়ে সংখ্যা আরো বেশি—প্রায় ১ হাজার ৮৪০ জনের মৃত্যু ঘটেছে। এ মৃত্যুর মূল কারণ ট্রাফিক আইন অমান্য, বেপরোয়া গতি, প্রতিযোগিতামূলক ওভারটেকিং, পথচারীর অনিরাপদ পারাপার, অবৈধ পার্কিং এবং সড়ক অবকাঠামোর ত্রুটি। ঢাকার সড়কগুলোয় সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যকর না থাকা, ফুটপাত দখল এবং গণপরিবহনের অনিয়মিত রুট ব্যবস্থাপনা দুর্ঘটনা রোধের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে। ফলে সড়কে প্রতিদিনের চলাচল এখনো প্রাণহানির ঝুঁকির সমার্থক, যা নাগরিক জীবনে স্থায়ী আতঙ্ক ও অনিরাপত্তা তৈরি করছে।

বাসযোগ্যতার আন্তর্জাতিক সূচকগুলোও আমাদের কানে কড়া নাড়ে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ‘গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স ২০২৫’-এ ১৭৩ শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১। স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো, পরিবেশ, স্থিতিশীলতা ও শিক্ষায় নিম্নমানের যৌথ প্রতিচ্ছবি। ২০২৪ সালেও চিত্র খুব ভালো ছিল না—ঢাকা ছিল ১৬৮তম।

এখানে কিগালি আমাদের জন্য ‘ধরা যায়, ছোঁয়া যায়’ ধরনের এক রেফারেন্স, সিঙ্গাপুর নয়। সিঙ্গাপুরের ইতিহাস, আকার, আঞ্চলিক অর্থনীতি, সামুদ্রিক বাণিজ্যভিত্তিক স্ট্র্যাটেজি আমাদের থেকে ভিন্ন। কিগালির সঙ্গে আমাদের মিল—উন্নয়নশীল দেশের নগর, সীমিত সম্পদ, দ্রুত নগরায়ণ, সিস্টেমকে নতুন করে গড়ার প্রয়োজন। তাহলে কিগালি কীভাবে পারল?

প্রথমত, আচরণ বদলের স্থায়ী কাঠামো। ‘উমুগান্ডা’ কেবল ক্লিন-আপ ডে নয়, এটি আচরণ শেখার স্কুল। প্রতি মাসের শেষ শনিবার সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টায় এতে অংশ নেয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা, স্থানীয় নেতৃত্ব, কমিউনিটি সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে অংশগ্রহণের একটি ‘রিদম’ তৈরি হয়েছে। এতে সরকার জনগণের সঙ্গে ‘সহ-উৎপাদক’, শুধু সেবা প্রদানকারী নয়। আইনি কাঠামো ছাড়া আচরণ বদলায় না—এ পাঠ রুয়ান্ডা দিয়েছে।

রুয়ান্ডা প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করেছে, আবার নাগরিকদের জন্য বিকল্প সরবরাহও করেছে। বিমানবন্দরে বাজেয়াপ্ত, বাজারে বিকল্প প্রসার, বাড়িতে বর্জ্য আলাদা—‘শুধু নিষেধ’ নয়, ‘কীভাবে চলবে’ তার ব্যবহারিক পথও দেখিয়েছে। ঢাকায় প্লাস্টিক ব্যাগ নিষেধাজ্ঞা বহুবার আলোচনায় এসেছে; কিন্তু আচরণগত ও বাজারভিত্তিক বিকল্পের রোডম্যাপ স্পষ্ট হয়নি। কিগালি দেখিয়েছে বাড়িভিত্তিক বর্জ্য ছাঁকনির ওপর বেসরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থাকে প্রতিযোগিতামূলক করা গেলে নাগরিক খরচ সহনীয় রেখে পরিষেবা মানও বাড়ানো যায়।

রুয়ান্ডায় আছে জবাবদিহির ‘ইমিহিগো’। মেয়র-সিভিল সার্ভিস—সবার বার্ষিক পারফরম্যান্স কন্ট্রাক্ট আছে। কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার সঙ্গে স্থানীয় লক্ষ্যমাত্রা মূল্যায়ন করে জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর। অর্থাৎ ‘নিজের কাজ নিজে নম্বর’ নয়। ‘ইমিহিগো’ নামে স্থানীয় সরকার ও মন্ত্রণালয়ের পারফরম্যান্স কন্ট্রাক্ট বছরে বছরে মূল্যায়ন হয়, যার ফলে মেয়র থেকে মন্ত্রী—সবার কাজের ফল জবাবদিহির আওতায় আসে।

‘কিগালি মাস্টার প্ল্যান ২০৫০’ জোনিং, হাঁটাপথ, মিক্সড ইউজ সবকিছুর সমন্বয় করেছে। কিগালির মডেল দেখায়—পরিকল্পনার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে ভূমি ব্যবস্থাপনা, পার্কিং নীতিমালা, ফুটপাত অধিকার, ট্রানজিট করিডোর—সব একসঙ্গে ‘এনফোর্স’ করতে হয়। এর সঙ্গে মাসে দুই রোববার ‘কার-ফ্রি ডে’ ঢাকায় চালু করা গেলে মানুষ হাঁটতে শেখে, শহর ‘ইউজার-এক্সপেরিয়েন্স’ বদলায়, আর সামান্য বিশুদ্ধ হয়।

বিনিয়োগে ‘ওয়ান-স্টপ’ ও প্রণোদনাও রুয়ান্ডার অর্থনীতি বদলের কারিগর। রুয়ান্ডা ডেভেলপমেন্ট বোর্ডে ব্যবসা নিবন্ধন, ভিসা, কর—সবই এক ছাদের নিচে। ভ্যাট রিফান্ডের সময়সীমা নির্দিষ্ট; নতুন সম্পদে প্রথম বছর ৫০% অ্যাকসিলারেটেড ডিপ্রিসিয়েশন—অর্থাৎ নীতিতে গতি ও পূর্বানুমানযোগ্যতা। শিল্পজমি, বিদ্যুৎ, লজিস্টিক—সবই থাকে প্রস্তুত। ফলে উৎপাদনকারী আসে, রফতানি বাড়ে।

অথচ ঢাকায় প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ আটকে থাকে সড়কে। কর্মঘণ্টা হারানোর সঙ্গে যোগ হয় জ্বালানি অপচয়, কার্বন-উৎস বেড়ে যাওয়া। বায়ুদূষণে দিতে হয় বার্ষিক গড় আয়ুষ্কাল কমে যাওয়ার মাশুল। নদীতে নানা টক্সিক; বর্ষায় জলাবদ্ধতা, শুষ্কে ধুলা—শহর যেন ঋতুভিত্তিক অসুস্থতায় ভোগে। আর বাসযোগ্যতার বৈশ্বিক সূচকে আমরা নিচের সারিতে। এখান থেকে উত্তরণ যে খুব কঠিন নয়—তা কিগালি করে দেখিয়েছে। তারা প্রমাণ করেছে বিধিনিষেধ যখন বিকল্পের সঙ্গে আসে, আইন যখন অভ্যাসকে ছোঁয়, পরিকল্পনা যখন জবাবদিহির সঙ্গে বাঁধা পড়ে—তখন সীমিত সম্পদেও শহর বদলে যায়। রুয়ান্ডার প্রবৃদ্ধি, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা—সব একসঙ্গে গেঁথে আছে বলেই এফডিআই আসে, কনফারেন্স ট্যুরিজম বাড়ে, ব্র্যান্ডিং কাজ করে। সড়কে শৃঙ্খলা, ফুটপাত ফিরিয়ে আনা, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য-নদী-ড্রেনের একীভূত ব্যবস্থাপনা—এসব ‘প্রজেক্ট’ নয়; এগুলো ‘সিস্টেম’। কিগালি দেখিয়েছে সিস্টেম ঠিক হলে প্রজেক্ট নিজে নিজে সফল হয়। ‘উমুগান্ডা’ একরকম সামাজিক চুক্তি—‘আমি শহরের জন্য সময় দেব, শহর আমাকে ভালো জীবন দেবে’। ঢাকায়ও এটা করা সম্ভব, প্রয়োজন শুধু সুসংগঠিত কাঠামো, সময়মতো সেবা, আর সৎ-স্বচ্ছ প্রয়োগ।

দেওয়ান হানিফ মাহমুদ: সম্পাদক, বণিক বার্তা

[অনুলিখন ও সহায়তায় মাহফুজ রাহমান]

আরও