পারিবারিক ব্যবসাকে সুসংহত ও টেকসই করতে নীতি-নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। সতর্কতা থাকতে হয় নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে, অধিকার ও আবেগের চেয়ে বেছে নিতে হয় যোগ্যতাকে। এসবের বাইরে পেশাদার ব্যবস্থাপনার জন্য করপোরেট রীতিনীতি অনুসরণ এবং ডিজিটালাইজেশন ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে হয়। পারিবারিক ব্যবসাসংক্রান্ত এক সেমিনারে গতকাল এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।
‘পারিবারিক মূল্যবোধের সঙ্গে ভবিষ্যৎ দৃষ্টির মিলন: টেকসই উত্তরাধিকার কৌশল’ শীর্ষক সেমিনারটি রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। রাজা অ্যান্ড তান এশিয়া ও এএজেড অ্যান্ড পার্টনার্সের সহযোগিতায় এমসিসিআই এর আয়োজন করে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা সেমিনারে তাদের ব্যবসা পরিচালনার নানা দিক তুলে ধরেন, যারা বর্তমানে পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরেছেন। তারা জানান, পরিবারভিত্তিক ব্যবসা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি; যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুনত্ব আনয়ন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার ধরে রাখে। তবে যথাযথ প্রস্তুতি ও দূরদর্শী নেতৃত্বের অভাবে পারিবারিক ব্যবসা এখন আর টেকসই হচ্ছে না। টেকসই ব্যবসার জন্য শুধু পরিবার নয়, পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত উত্তরাধিকার অপরিহার্য।
এমসিসিআইয়ের জেনারেল সেক্রেটারি ফারুক আহমেদের সঞ্চালনায় সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজা অ্যান্ড তান এশিয়ার সিঙ্গাপুরের উপপ্রধান (করপোরেট ও বাণিজ্যিক বিভাগ) আলরয় চান এবং প্রতিষ্ঠানটির এক্সিকিউটিভ কমিটি পার্টনার আব্দুল জব্বার বিন কারাম ডিন রাজা।
সেমিনারের সম্মানিত অতিথি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী বলেন, ‘শুধু ছেলে বা মেয়ে বলে কাউকে সিইও বানানো যাবে না। যিনি সবচেয়ে যোগ্য তাকেই নেতৃত্ব দেয়া উচিত। এছাড়া প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেয়া ও টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। প্রফেশনালদের গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, আমাদের প্রতিষ্ঠান প্রফেশনালদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বিশ্বের সফল কোম্পানিগুলোর গল্পও একই রকম। কেউ বড় শেয়ারহোল্ডার এবং কোম্পানির সুবিধা ভোগ করেন—তার মানে এ নয় যে প্রতিষ্ঠান চালানোর অভিজ্ঞতা, শিক্ষা বা দক্ষতা রয়েছে তার। কেবল সঠিক ব্যক্তিকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ দিলেই কোম্পানির মঙ্গল হয়।’
নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তিনি বলেন, ‘আমি যখন ব্যবসায় যোগ দিই, তার কয়েক বছর আগে থেকে বাবার সঙ্গে কাজ করছিলাম। মূলত মার্কেটিং দেখভাল করছিলাম। ওয়ার্নার নামে বাবার খুব কাছের একজন বন্ধু ছিলেন। তিনি একদিন আমাদের বাড়িতে নৈশভোজের জন্য এসেছিলেন। হঠাৎ আমার বিষয়ে বাবাকে বললেন—আপনি তো ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং চেয়ারম্যানও। আপনার ছেলে এত কাজ করছে, কেন তাকে ম্যানেজিং ডিরেক্টর বানাচ্ছেন না? ওই সময় আমি একটু লজ্জিত হয়েছিলাম। আমাদের সংস্কৃতিতে, বিশেষ করে ২৫ বছর আগে বাবার সামনে এমন কথার মুখোমুখি হওয়া সহজ ছিল না। প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যবসায় এ ধরনের দ্বিধা স্বাভাবিক। সে জন্য প্রতিষ্ঠাতা বা চেয়ারম্যানকেই নির্ধারণ করতে হয়, তার অনুপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান কীভাবে চলবে। অতিথি চলে গেলে, বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করেন—তুমি কি তাকে কিছু বলেছ? আমি বললাম, না। সে মুহূর্তটা আমার জন্য আরো লজ্জার ছিল। বছর দুয়েক পর অবশ্য বাবা আমাকে সে পদেই বসান।’
এমএম ইস্পাহানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মির্জা সালমান ইস্পাহানিও সেমিনারে সম্মানিত অতিথি হিসেবে অংশ নেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে তুলে ধরেন তাদের পারিবারিক ব্যবসার ইতিহাস। তিনি বলেন, ‘আমি অনেক পুরনো একটি পারিবারিক ব্যবসার প্রজন্ম। আমাদের পরিবার ১৮২০ সালে পার্সিয়া থেকে ভারতে স্থানান্তর হয়েছিল। এরপর মুম্বাই, মাদ্রাজ হয়ে ১৮৬০ সালে আসে কলকাতায়। ঢাকায়ও আমাদের অফিস ছিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বাংলাদেশে চলে আসি। আমাদের পরিবারের প্রথম প্রজন্ম ব্যবসা শুরু করেছিল ট্রেডিং দিয়ে। তারপর তার ছেলে ব্যবসায় নামেন। শুরু হয় ব্রোকারি—দুটি পক্ষকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে কমিশন আয় করা। তারপর তারা ট্রেডিং বাড়ান, স্টক হোল্ড করেন এবং পরে কয়েকটি শিল্পও তৈরি করেন। এভাবেই ব্যবসা বড় হয়। পরিবার যত বড় হয়, ব্যবসার প্রয়োজনীয়তা তার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়।’
কেবল পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা চালানো সম্ভব নয় উল্লেখ করে সালমান ইস্পাহানি বলেন, ‘যদি ব্যবসা বাড়াতে হয়, তাহলে প্রফেশনালদের সঙ্গে নেয়া অত্যাবশ্যক। আমরা প্রফেশনাল ম্যানেজমেন্টে বিশ্বাস করি। নিজেকে রাখতে হবে ব্যাক সিটে। যদি মালিক বা শেয়ারহোল্ডার হিসেবে প্রতিদিন হস্তক্ষেপ করেন তাহলে সমস্যা হবে। আমাদের অবশ্যই বোর্ড মিটিং এবং ম্যানেজমেন্ট কমিটির মতো গভর্ন্যান্স ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হবে। দৈনন্দিন পরিচালনা, নিয়োগ, ছুটি, বেতন—সব ছেড়ে দিতে হবে প্রফেশনালদের হাতে। কারণ তারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ ও অভিজ্ঞ।’
ব্যবসায় পারিবারিক মূল্যবোধ থাকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে সালমান ইস্পাহানি আরো বলেন, ‘প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব মূল্যবোধ থাকা উচিত, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থানান্তরিত হয়। পরিবারের সদস্যকে অবশ্য সুযোগ দিতে হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। কেননা সবাই সমান নন। ভুল ব্যক্তির হাতে গেলে ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যায়। তাই উত্তরাধিকারের জন্য পরিকল্পনা করা, স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং পরবর্তী প্রজন্মকে তা জানানো খুব জরুরি। এখনো যারা প্রস্তুতি নিচ্ছে না তাদের বলব—যদি প্রস্তুতি না নাও, তাহলে ব্যর্থতার দিকে এগোচ্ছ।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে এসিআই লিমিটেডের চেয়ারম্যান আনিস উদ দৌলা বলেন, ‘গভর্ন্যান্স এবং মালিকানা—দুটি ভিন্ন জিনিস। আমি মনে করি, আমাদের ভালো গভর্ন্যান্সে মনোনিবেশ করা উচিত। প্রতিষ্ঠান অবশ্যই পেশাদারদের মাধ্যমে পরিচালিত হতে হবে। পরিবারকে এতে প্রবেশ করানো উচিত নয়। কোম্পানির সম্পদের ব্যবহার পেশাদারত্বের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ হওয়া জরুরি। আমরা দেখেছি ফোর্ডের কী হয়েছে। এটি ছিল পারিবারিক ব্যবসা, এখন কেউ জানে না তার মালিক কে। অবশ্যই আমাদের এ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে।’
রহিমআফরোজের গ্রুপ চেয়ারম্যান ফিরোজ রহিম বলেন, ‘আমরা এখন দ্বিতীয় প্রজন্মে আছি। আমি নিজেও দ্বিতীয় প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি। আমরা যখন শুরু করি ২০০৬ বা ২০০৭ সালে, তখন পর্যাপ্ত উপকরণ বা রিসোর্স পাইনি। তবে চেষ্টা করেছি এবং এর মধ্যে একটি পারিবারিক প্রটোকল তৈরি করে ২০০৯ সাল থেকে তা বাস্তবায়ন করছি। শীর্ষ পর্যায়ে যদি শৃঙ্খলা থাকে, বাকিগুলোও ঠিকঠাক চলে যায়। আমরা চেষ্টা করেছি ব্যবস্থাপনা আর মালিকানাকে আলাদা করতে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আবার চ্যালেঞ্জিংয়েরও বিষয়। একদিনে তা সম্ভব নয়। এখানে অহংবোধ আছে, আবেগ-অনুভূতিও আছে, যা মাঝেমধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।’
প্রতিটি সফল ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যবসার পেছনে বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও পরিবর্তনের সংমিশ্রণ থাকে বলে মনে করেন এএজেড অ্যান্ড পার্টনার্সের ম্যানেজিং পার্টনার আনিস এ খান। আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘উত্তরাধিকার শুধু আইন বা অর্থের লেনদেন নয়। এটি একটি ব্যক্তিগত ও আবেগও। এর মাধ্যমে একটি প্রজন্মের মধ্যে সংস্কৃতির হস্তান্তর হয়। আমরা দেখেছি, যেখানে পরিকল্পনা ঠিকভাবে করা হয়েছে ব্যবসা টিকে গেছে। কিন্তু যেখানে পরিকল্পনা হয়নি সেখানে সংঘাত ও সমস্যার কারণে ব্যবসা ধ্বংস হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় পারিবারিক ব্যবসা অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এগুলো উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান ও সমাজ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু ব্যবসা যখন বড় হয়, তখন একটি চ্যালেঞ্জ আসে—কীভাবে ধারাবাহিকতা রাখা যায়।’
উত্তরাধিকার পরিকল্পনা জরুরি কোনো মুহূর্তের জন্য নয়, প্রথম দিন থেকেই এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হওয়া উচিত বলে মনে করেন আনিস এ খান। তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তি, জনসংখ্যা ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। স্পষ্টতা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তর কেবল পরিবারের জন্য নয়, এটি ব্যবসায় টিকে থাকার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
স্বাগত বক্তব্যে এমসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট কামরান টি রহমান বলেন, ‘পরিবারভিত্তিক ব্যবসা আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুনত্ব আনয়ন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার ধরে রাখে এটি। তবে ভবিষ্যতের দিকে তাকালে একটি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়—উত্তরাধিকার শুধু দায়িত্ব হস্তান্তর নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত বিষয়। একটি স্থায়ী পরিবারভিত্তিক ব্যবসার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি, বাজারে অবস্থান, দূরদর্শী নেতৃত্ব, টেকসই মূল্যবোধ ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।’
ব্যবসায়ী এ নেতা আরো বলেন, ‘উত্তরাধিকার পরিকল্পনা প্রায়ই অনেক পরে নেয়া হয়। কখনো আবার এড়িয়েও যাওয়া হয় এবং অনেক সময় ভুলভাবে বোঝা হয়। অনেক ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট কৌশলের অভাব ব্যবসায় ব্যাঘাত, বিভাজন এমনকি দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা ব্যবসার বিলুপ্তি পর্যন্ত ঘটায়। এটি ভাগ্যের বিষয় নয়, প্রস্তুতির বিষয়। ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব শনাক্ত ও বিকশিত করা, শাসন ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এটি স্টেকহোল্ডারদের স্বচ্ছতা দেয়, বিনিয়োগকারীদের আস্থা দেয় এবং কর্মচারীদের স্থিতিশীলতা প্রদান করে।’
অন্যদের মধ্যে এমসিসিআইয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হাবিবুল্লাহ এন করীমসহ পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা সেমিনারে বক্তব্য দেন। সেমিনারে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরে ব্যবসার পরিবেশের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশে কোম্পানি নিবন্ধনে সময় লাগে প্রায় ৩০ দিন। প্রয়োজন হয় বহুমাত্রিক অনুমোদন এবং বিদেশী মালিকানায়ও রয়েছে কড়াকড়ি। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরে মাত্র ১৪ দিনে কোম্পানি নিবন্ধন সম্ভব। বিদেশী মালিকানায় কোনো বাধা নেই। এছাড়া বাংলাদেশে করপোরেট করের পরিমাণ ২২ শতাংশ, যেখানে সিঙ্গাপুরে ১৭ শতাংশ।