অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘সবসময় স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করেছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সিপিডি সবসময়ই সচেষ্ট থেকেছে। সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই ভবিষ্যতে দেশের স্বার্থে ও সাধারণ মানুষের স্বার্থে কাজ করতে হবে তাদের।’ সিপিডির ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে গতকাল আয়োজিত দিনব্যাপী সেমিনারে দেয়া এক ভিডিওবার্তায় তিনি এ কথা বলেন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘দেশের সাধারণ মানুষের সামগ্রিক অবস্থার পরিবর্তন এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের যে চেষ্টা আমি সারা জীবন ধরে করেছি, সিপিডির কাজে সবসময় তার প্রতিফলন দেখেছি।’
তিনি জানান, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সিপিডি সর্বদাই সচেষ্ট থেকেছে। সংস্থাটি অতীতের মতো ভবিষ্যতেও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান রেখে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সেমিনারে গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় দেশের গবেষণা সংস্থাগুলোর ভূমিকা তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা। সাম্প্রতিক সময় ছাত্র আন্দোলনে তাদের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যে উঠে আসে, সাম্প্রতিক জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে সিপিডির তথ্যভিত্তিক গবেষণা কাজে লেগেছে।
তিনি বলেন, ‘যে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে, তার “মনন সৃষ্টিতে” সিপিডির গবেষণা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম অশেষ ভূমিকা রেখেছে।’
সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের একজন সদস্য হিসেবে সেমিনারে প্রধান উপদেষ্টার ভিডিওবার্তাটি দেখানো হয়।
তিনি বলেন, ‘সিপিডির ৩০ বছর পূর্তিতে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। প্রতিষ্ঠাকালীন ট্রাস্ট্রি হিসেবে আমি সিপিডির সঙ্গে যুক্ত সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। বিশেষভাবে অভিনন্দন জানাই আমার শিক্ষক সিপিডির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে। তিনি দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সময়ে তার ব্যতিক্রমী ভূমিকা রেখে চলেছেন।’
দিনব্যাপী আয়োজনে গতকাল চারটি সেশনে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। সিপিডির ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দুটি বই প্রকাশ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। প্রথম সেশনে বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর রওনক জাহান, এমসিসিআই বোর্ড অব ডিরেক্টর ব্যারিস্টার নিহাদ কবির ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম।
প্রথম সেশনে অংশ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতির বাইরে খোলামনে কথা বলার জন্য একটি স্পেস দরকার ছিল। সিপিডি তেমন একটি প্লাটফর্ম দিয়েছিল। তখন বাংলাদেশে এমন একটি থিংক ট্যাংকের কথা কেউ চিন্তা করেনি। নানা পক্ষের মতামতকে প্রভাবিত করার জন্য সিপিডি দারুণ কাজ করেছে।’
ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘গণমাধ্যমের গলা চেপে ধরা আওয়ামী সরকার পতনের অন্যতম বড় কারণ ছিল। তারা যদি মিডিয়ার স্বাধীনতা দিত, তাহলে তাদের কাছে অনেক পর্যালোচনার তথ্য পৌঁছত। কিন্তু মিডিয়ার কণ্ঠরোধের কারণে তাদের কাছে সত্য যেত না। গত ১৫ বছর মুক্তচিন্তাকে আঘাত করা হয়েছে। আমরা এখনো মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে আছি।’
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, ‘ভবিষ্যতে দেশের একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকবে, যেখানে সিপিডির মতো প্রতিষ্ঠান নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারবে। বহুমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে। বহুমত প্রকাশের জন্য নানা ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। সবই যে সরকারের পক্ষ থেকে আসে তা নয়, একটি পক্ষ আছে যারা অন্যের মত শুনতে চায় না। সবাইকে সহিষ্ণু হতে হবে।’
এমসিসিআই বোর্ড অব ডিরেক্টর নিহাদ কবীর বলেন, ‘প্রথমে সিপিডি নাগরিক সমাজের সংলাপ বেশি করলেও পরে অর্থনৈতিক আলোচনা বেড়েছে। দেশের অর্থনীতিতে যে ব্যক্তি খাতের বড় একটি ভূমিকা আছে তা উঠে এসেছে সিপিডির বিভিন্ন সংলাপে।’
প্রথম সেশনে আরো উপস্থিত ছিলেন গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি তসলিমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘পোশাক খাতের শ্রমিকের অধিকার আদায়ে বিভিন্ন তথ্যের সংকট আমরা দেখেছি। সে সময় সিপিডি যখন কোনো তথ্য দিত, তা আমরা আঁকড়ে ধরতাম। দেশে জনগণের স্বার্থে আরো গবেষণা হওয়া দরকার।’
অনুষ্ঠানের তৃতীয় সেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং তালেবান সরকার উত্থানের মতো সব সংবাদ অযৌক্তিক। ভারতীয় মিডিয়াগুলো বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানে খুশি নয়। তারা প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। বিশ্বে বাংলাদেশকে নেতিবাচকভাবে দেখানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এটি খুবই আনফেয়ার। ৫ আগস্টের পর দেশে অল্প কয়েক দিন পরিস্থিতি খারাপ থাকলেও এখন স্থিতিশীলতা এসেছে। ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে নিয়ে যে ধরনের আলোচনা হচ্ছে তা পরিকল্পিত। এটি দুই দেশের কারো জন্য সুখকর হবে না। গত ১৫ বছরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কোনো সংযোগ স্থাপন হয়নি। তবে এখন সময় এসেছে সংযোগ তৈরি করার।’
অনুষ্ঠানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘১৯৯০ সালের পর যখন গণতন্ত্র আসবে বলে আমরা ভাবতে শুরু করলাম, তখন রাজনীতিতে বিরোধী মত দমন করা হয়েছে এবং স্বজনপ্রীতি হয়েছে। রাজনীতিতে সন্ত্রাসীদের জায়গা দেয়া হয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ হয়েছে। এখন মানুষ বদলালেও মানসিকতা বদলায়নি।’
দ্য সাউথ এশিয়া সেন্টার ফর পলিসি স্টাডিজের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত নেপালের রাষ্ট্রদূত শ্রীধর খাতরি অনলাইনে যুক্ত হয়ে সিপিডিকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে সিপিডির নির্মোহ বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। আমি সিপিডির তিন দশকের যাত্রায় আন্তরিক শুভ কামানা জানাই। এ যাত্রা আরো দীর্ঘ হবে বলে আশা রাখি।’
নয়াদিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্স অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম ফর ডেভেলপিং কান্ট্রির (আরআইএস) পরিচালক প্রফেসর সচীন চৌতুর্বেদি অনলাইনে যুক্ত হয়ে বলেন, ‘প্রফেসর রেহমান সোবহানের নেতৃত্বে সিপিডির এগিয়ে যাওয়া সত্যিই প্রশংসনীয়। আমরা যদি দক্ষিণ এশিয়ায় দক্ষ কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনা করি তাহলে বাংলাদেশ থেকে সিপিডি অন্যতম। প্রফেসর রওনক জাহান এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানটির ক্রেডিবিলিটি আরো বৃদ্ধি করেছেন।’
এ সময় আরো বক্তব্য দেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট গ্রুপের পরিচালক ডার্ক উইলেম তে ভেলডি ও ইউনান একাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্সের সাবেক সভাপতি রেন জিয়া। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
অনুষ্ঠানের চতুর্থ বা সমাপনী সেশনে যোগ দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও রাজনীতিকরা।