মাঠপর্যায়ে সারের যে চাহিদা তার চেয়ে কম পরিমাণ প্রস্তাব করে থাকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। আবার সে প্রস্তাবের তুলনায়ও চূড়ান্ত বরাদ্দ কমিয়ে দিচ্ছে সরকার। গত পাঁচ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি ও টিএসপির চাহিদা নিরূপণ থেকে শুরু করে বরাদ্দ অনুমোদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই উঠে এসেছে বড় ধরনের ব্যবধানের চিত্র। কোনো কোনো অর্থবছরে মাঠপর্যায়ের চাহিদা ও অনুমোদিত বরাদ্দের ব্যবধান প্রায় ৮০ লাখ টনেও গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে সারের প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ পদ্ধতি নিয়ে। মাঠের চাহিদা নির্ধারণে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে কিনা, কিংবা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও সরকারের ‘সার বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় ও পরামর্শক কমিটি’ এ বিষয়ে যথাযথ মূল্যায়ন করছে কিনা—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। যদিও মাঠপর্যায়ের পাঠানো হিসাবকে চূড়ান্ত চাহিদা মানতে নারাজ ডিএই।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মাঠপর্যায় থেকে ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি মিলিয়ে সারের চাহিদা দেখানো হয়েছে ৬৮ লাখ ৭৯ হাজার টন। এর বিপরীতে ডিএইর চাহিদা প্রস্তাব করা হয় ৫৮ লাখ ৪৯ হাজার ২০০ টন। শেষ পর্যন্ত অনুমোদিত বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ৫৮ লাখ ৫ হাজার টনে। অর্থাৎ মাঠপর্যায়ের চাহিদার তুলনায় অনুমোদিত বরাদ্দ কমেছে ১০ লাখ ৭৪ হাজার টন। তবে ডিএইর প্রস্তাবিত চাহিদার সঙ্গে চূড়ান্ত বরাদ্দের ব্যবধান তুলনামূলকভাবে কম, ৪৪ হাজার ২০০ টন।
চলতি অর্থবছরে ইউরিয়ার মাঠপর্যায়ের চাহিদা ধরা হয়েছে ৩০ লাখ ২২ হাজার টন। ডিএই প্রস্তাব করে ২৬ লাখ ২২ হাজার টন। শেষ পর্যন্ত ২৬ লাখ ২০ হাজার টন বরাদ্দ অনুমোদন হয়েছে। অর্থাৎ মাঠের চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কমেছে ৪ লাখ ২ হাজার টন। টিএসপির ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের চাহিদা ছিল ৯ লাখ ৬৩ হাজার টন। ডিএই ৯ লাখ ১ হাজার ৫০০ টনের প্রস্তাব দিলেও অনুমোদন হয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার টন। ফলে মাঠের চাহিদার সঙ্গে অনুমোদিত বরাদ্দের ব্যবধান ২ লাখ ১৩ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে।
ডিএপির মাঠপর্যায়ের চাহিদা ছিল ১৬ লাখ ৯২ হাজার টন। ডিএই ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০ টন প্রস্তাব করলেও অনুমোদিত বরাদ্দ হয়েছে ১৪ লাখ ৮৫ হাজার টন। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ডিএইর প্রস্তাবের চেয়ে ১ লাখ ২৯ হাজার ৩০০ টন বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের চাহিদার তুলনায় অনুমোদিত বরাদ্দ কম ২ লাখ ৭ হাজার টন। অন্যদিকে এমওপির মাঠপর্যায়ের চাহিদা ছিল ১২ লাখ ২ হাজার টন। ডিএই ৯ লাখ ৭০ হাজার টনের প্রস্তাব করে। অনুমোদন দেয়া হয়েছে ৯ লাখ ৫০ হাজার টন। ফলে মাঠের চাহিদা ও অনুমোদিত বরাদ্দের মধ্যে ২ লাখ ৫২ হাজার টনের ব্যবধান।
চলতি অর্থবছরে মাঠপর্যায়ের চাহিদা ও অনুমোদিত বরাদ্দের ব্যবধান ১০ লাখ টনের কিছু বেশি হলেও আগের চার অর্থবছরে এ ফারাক ছিল বিস্তর। বিশেষ করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাঠপর্যায়ে সারের চাহিদা দেখানো হয়েছিল ১ কোটি ৩৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৮৫ টন। বিপরীতে ডিএই প্রস্তাব করে ৫৮ লাখ ৮৯ হাজার ৫০০ টন এবং সরকার শেষ পর্যন্ত ৫৭ লাখ ৮৫ হাজার টন বরাদ্দ অনুমোদন করে। অর্থাৎ মাঠের চাহিদার তুলনায় অনুমোদিত বরাদ্দ কমে ৭৯ লাখ ৯৮ হাজার ১৮৫ টন। একইভাবে মাঠের চাহিদা ও ডিএইর প্রস্তাবের মধ্যে ব্যবধান ছিল ৭৮ লাখ ৯৩ হাজার ৬৮৫ টন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। ওই বছর মাঠপর্যায় থেকে সারের চাহিদা দেয়া হয়েছিল ১ কোটি ৩৩ লাখ ৩১ হাজার ৫৭৪ টন। ডিএই চাহিদা প্রস্তাব করে ৮৮ লাখ ৪০ হাজার টনের। বিপরীতে সরকার বরাদ্দ অনুমোদন করে ৫৯ লাখ টন সার। ফলে মাঠপর্যায়ের চাহিদার তুলনায় ৭৪ লাখ ৩১ হাজার ৫৭৪ টন কম ছিল অনুমোদিত বরাদ্দ। এছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাঠের চাহিদা ও অনুমোদিত বরাদ্দের মধ্যে ব্যবধান ছিল ৬৬ লাখ ২৫ হাজার ৬১৪ এবং তার আগের অর্থবছরে ২৭ লাখ ১০ হাজার ৮৭৫ টন।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সার সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চাহিদা কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, এ পরিসংখ্যানের মাধ্যমে সে প্রশ্ন সামনে এসেছে। কৃষকের চাহিদা, আবাদি জমির পরিমাণ, ফসলের ধরন, মৌসুমি প্রয়োজন এবং অঞ্চলভেদে ব্যবহার—এসব সূচকের ভিত্তিতে চাহিদা নিরূপণ কতটা বাস্তবসম্মতভাবে হচ্ছে, তা নিয়েও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
সার ডিলারদের সংগঠন বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মোশারফ হোসেন দাবি করেন, কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী তারা সার বরাদ্দ পাচ্ছেন না। ফলে সার সংকটের দায় তাদেরকে নিতে হচ্ছে। এছাড়া প্রথাগত কৃষির বাইরের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, তামাক, চা বাগান কিংবা অন্যান্য খাতকে বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না চাহিদার হিসাবে। সরকার প্রথাগত কৃষির জন্য সার বরাদ্দ দিলেও এসব খাতে সার ব্যবহার দিন দিনই বাড়ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বার্ষিক সারের বরাদ্দ অনুমোদন বা চাহিদা চূড়ান্ত হয় মূলত চারটি ধাপের মাধ্যমে। প্রথমে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি সেখানকার ফসল, মৌসুম, আবহাওয়ার ঝুঁকিসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জেলা কমিটিতে চাহিদা পাঠায়। তারা সব উপজেলার তথ্য একসঙ্গে করে পাঠায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে। এরপর সেগুলো বিশ্লেষণ ও যাচাই করে একটি চাহিদা প্রস্তাব করে সংস্থাটি। পরবর্তী সময়ে ‘সার বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় ও পরামর্শক কমিটি’ তা যাচাই করে চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ অনুমোদন করে।
‘সার বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় ও পরামর্শক কমিটি’ সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি। এতে কৃষিমন্ত্রী থাকেন সভাপতির দায়িত্বে। এছাড়া সদস্য হিসেবে থাকেন শিল্পমন্ত্রী; কৃষি সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি; কৃষি, অর্থ, শিল্প এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব; বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান; কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক; বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (বৈদেশিক মুদ্রানীতি) এবং বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান। এর বাইরেও কমিটিতে তিন সংসদ সদস্য রয়েছেন।
তবে মাঠপর্যায়ের তথ্যকে সারের প্রকৃত চাহিদা নয় বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ব্লক পর্যায় থেকে যেসব চাহিদা ডিএইর প্রধান কার্যালয়ে আসে সেটিকে আমরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করি। বিগত কয়েক বছর সার ব্যবহারের যে ট্রেন্ড সেটাকে অ্যানালাইসিস করা হয়। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণের পর আমরা চূড়ান্ত চাহিদা প্রস্তাব করি। এটিই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চূড়ান্ত চাহিদা। একেবারে মাঠপর্যায় থেকে যারা দেয়, তারা হয়তো ওইভাবে বিশ্লেষণ করে দেয় না। অথবা সারের তিনটা ডোজ আছে। একটা হচ্ছে “লো ডোজ”, একটা “মিডিয়াম ডোজ” এবং আরেকটা “হাই ডোজ”। আমরা সবসময় মধ্যম বা মিডিয়াম ডোজটাকে বিবেচনা করি। ব্লক পর্যায়ে ওরা হয়তো হাই ডোজ ধরে চাহিদা তৈরি করে। সেজন্যই মূলত পার্থক্যটা তৈরি হয়।’
কৃষি অর্থনীতিবিদরা জানান, সার, বীজ ও কীটনাশক কৃষির উৎপাদনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। সেজন্য কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি ও আগামীতে এর জন্য পরিকল্পনা প্রণয়নে সঠিক তথ্য থাকা জরুরি।
এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাঠপর্যায় থেকে যে চাহিদা দেয়া হয় সেটি অতিমূল্যায়িত। আবার ডিএই কাটছাঁট করে যেটি দেয়, সেটিও আবার কম মূল্যায়ন। এরপর সেটি আবার মন্ত্রণালয়ে গিয়ে আরো কমে যায়। মূলত সারের চাহিদাটা নির্ভর করে ফসলের নিবিড়তার ওপর। নিবিড়তা বাড়লে তো সারের চাহিদাও বাড়বে। সেজন্য বরাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রে সবশেষ বছরে কী পরিমাণ ব্যবহৃত হয়েছে, সেটিকে বিবেচনায় নিয়ে পরেরবার ৫-১০ শতাংশ বরাদ্দ বেশি রাখতে হবে। যদি অব্যবহৃত থাকে, সেটি তো পরে ব্যবহার করাই যাবে।’
সঠিক তথ্য না থাকলে সেটি কৃষিতে প্রভাব ফেলতে পারে জানিয়ে এ কৃষি অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, ‘বাস্তব চাহিদা কত এবং কৃষক কতটুকু ব্যবহার করেন, এসবের সঠিক তথ্য থাকা জরুরি। তাহলে পরিকল্পনা করতে সুবিধা হয়। চলতি মৌসুমে সারের যে সংকট সেটির পেছনে সঠিক চাহিদার মূল্যায়ন না থাকাও দায়ী।’
বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনেও মাঠপর্যায়ের সারের চাহিদা ও সরকারি বরাদ্দের মধ্যে ফারাকের বিষয়টি উঠে এসেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৮ সেপ্টেম্বর পাঠানো প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, সারা দেশে সারের প্রকৃত চাহিদা মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে নিরূপণ করা হয়নি। ফলে প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে দেশের সব এলাকায় বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রভাবে অনেক জেলায় সংকট দেখা দিচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সারের বাস্তবসম্মত চাহিদা নিরূপণ করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, মৎস্যসহ অন্যান্য খাতের চাহিদাগুলো ঠিকমতো উঠে আসছে কিনা। আমরা এটিও মূল্যায়ন করব। সঠিক চাহিদা নিরূপণ করে সে অনুযায়ী সার বরাদ্দ দেয়া হবে।’