মাথার ওপর খোলা আকাশ, পাশে গুছিয়ে রাখা কয়েকটি টিন। চার বছর আগে তিস্তার ভাঙনে হারিয়েছিলেন নিজের ভিটেমাটি। এবার ব্রহ্মপুত্র কেড়ে নিয়েছে শেষ আশ্রয়টুকুও। কথা বলতে বলতে চোখ ভিজে আসে মিনারার। নীরবতা ভেঙে দীর্ঘশ্বাসের পর তিনি বলেন, ‘গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তার চরে ছিলাম। তিস্তার ভাঙনে সব হারিয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার কড়াইবরিশাল চরের একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে বোনের ঘরে আশ্রয় নিয়েছি। কিন্তু তিনদিন আগে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে সেই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরটিও নদীতে বিলীন হয়েছে। এর পর থেকে খোলা আকাশের নিচেই দিন কাটছে।’
কৃষি শ্রমিক বুলবুল আর শেফালী দম্পতির কোনো জমিজমা বা ঘরবাড়ি নেই। সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া গ্রামে অন্যের ভাড়া জায়গায় বসত গড়েছিলেন। কিন্তু তিন বছর ধরে দুধকুমারের অব্যাহত ভাঙনে নদ চলে আসে বসতভিটার কাছে। অবশেষে নদের গ্রাসে চলে যায় বসতভিটা। নতুন করে জায়গা ভাড়া বা কিনে বসত গড়ার সামর্থ্য নেই। তাই কোনো ভবিষ্যৎই খুঁজে পাচ্ছেন না তারা।
শুধু মিনারা কিংবা শেফালী নন, কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও গঙ্গাধরের ভাঙনে গত কয়েকদিনে শতাধিক বসতভিটা বিলীন হয়েছে। এরই মধ্যে চিলমারী ইউনিয়নের কড়াইবরিশাল ও শাখাহাতি চরে নদী ভাঙতে ভাঙতে পৌঁছে গেছে বিশারপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প পর্যন্ত। এরই মধ্যে প্রকল্পসংলগ্ন সাতটি বিদ্যুতের খুঁটি নদীতে বিলীন হয়েছে। গত সাতদিনে কড়াইবরিশাল ও শাখাহাতি চরের অন্তত ৭০টি পরিবার বসতভিটা হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া গত এক সপ্তাহে দুধকুমার নদের ভাঙনে নদীতে চলে গেছে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া গ্রামের ১২টি বসতভিটা। বসতভিটা হারানো পরিবারের বেশির ভাগই ঘর ও আসবাব নৌকায় তুলে পাড়ি জমিয়েছে ব্রহ্মপুত্র অথবা দুধকুমারের বুকে জেগে ওঠা নতুন কোনো চরে। ভাঙনরোধে সরকারের পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা এলেই ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও গঙ্গাধরের দুই পাড়জুড়ে চলে অসহায়ত্বের হাহাকার।
সরজমিনে দেখা যায়, দুধকুমারের ভাঙনের কবলে পড়ে ঘর ও আসবাব একটি নৌকায় করে ব্রহ্মপুত্রের চর পার্বতীপুরে নিয়ে যান বানিয়াপাড়ার আবর আলীর পরিবার। তিনি জানান, ভাঙনের কবলে পড়ে চার বছর আগে বানিয়াপাড়ার ভাড়া করা জমিতে পরিবার-পরিজনসহ আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু এবার কোথাও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে না পেরে আপাতত শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করছেন।
সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের বানিয়াপাড়ার বুলবুল জানান, তিন বছর ধরে দুধকুমারের অব্যাহত ভাঙনে চলে গেছে বসতভিটা। দিনমজুরের কাজ করা অভাবের সংসারে নতুন করে জায়গা ভাড়া বা কিনে বসত গড়ার সামর্থ্য নেই তার। তাই কোনো ভবিষ্যৎই খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি।
বুলবুলের স্ত্রী শেফালী বেগম জানান, ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে টেনে আনা ঘরের চালের ভেতর বসে রাত-দিন পার করলেও খাবারের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। সন্তানদের ক্ষুধা নিবারণে প্রতিবেশীর দেয়া এক কেজি চালের ভাত পেটে জুটেছে তাদের। কিন্তু পরের বেলা কী হবে, সেটা জানা নেই তার। এভাবেই দিন-রাত কাটছে নদীতে বিলীন হওয়া বসতভিটার পরিবারটির।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বানিয়াপাড়া এলাকায় তিন বছর ধরে ভাঙন চললেও তা প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এ কারণে গত তিন বছরে বানিয়াপাড়া গ্রামের প্রায় ২০০ পরিবারকে বসতভিটা হারাতে হয়েছে। তাদের দাবি, বারবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করলে দেয়া হয়েছে মাত্র সামান্য কিছু জিও ব্যাগ, যা নদীর কিনারে ফেলার পর পরই পানির স্রোতে ভেসে গেছে এবং ভাঙন আরো তীব্র হয়েছে।
কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান জানান, নদ-নদীর উজানে ভারতের অংশে ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে গত ১৫ দিনে দুই দফায় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পায় এবং নেমে যায়। পানির এ ওঠা-নামায় ভাঙন শুরু হয়। তবে ৪০টি পয়েন্টের মধ্যে ৩০টিতে অস্থায়ী ভিত্তিতে ভাঙনরোধে চেষ্টা চলছে। বরাদ্দ পেলে পর্যায়ক্রমে বাকি পয়েন্টগুলোতেও কাজ করা হবে।