শিশুদের জন্য বেশি অনিরাপদ হয়ে উঠেছে রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো

নতুন করে আরো ৫ শিশু নিখোঁজ

এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা গেলেও এখনো নিখোঁজ ২ হাজার ৩৮ শিশু। রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোয় শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি বলে জানান তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

মাত্র ২০ মিনিটের জন্য মেয়েকে বাসায় রেখে নিচে নেমেছিলেন বাবা। ফিরে এসে দেখলেন দরজা খোলা। ঘরের সবকিছু ঠিকঠাক। নেই শুধু ১০ বছরের জান্নাতুর ইসলাম মীম। গত বুধবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর রামপুরা থেকে নিখোঁজ হয় শিশুটি। গতকাল রাত পর্যন্ত তার সন্ধান মেলেনি।

মীমের নিখোঁজ হওয়ার সময়ের কাছাকাছি রাজধানীর কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া ও মিরপুরের রূপনগর থেকেও নিখোঁজ হয়েছে ১১ ও ১২ বছর বয়সী দুই শিশু। অর্থাৎ মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকার তিন এলাকা থেকে নিখোঁজ তিন শিশু। একই সময়ে রাজধানীর বাইরে মাদারীপুর ও রাজশাহী থেকেও শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

একের পর এক শিশু নিখোঁজ হওয়ার এ চিত্র বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই—এ সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা গেলেও এখনো নিখোঁজ ২ হাজার ৩৮ শিশু। রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোয় শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি বলে জানান তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

মীমের বাবা জুনাইদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা গত জানুয়ারিতে ঢাকায় এসেছি। দুই সন্তানের মধ্যে মীম বড়। ঘটনার সময় তার মা ও ছোট সন্তান বাসার বাইরে ছিল। কিছু কেনাকাটার জন্য মীমকে বাসায় রেখে নিচে যাই। ২০ মিনিট পর ফিরে দেখি দরজা খোলা, কিন্তু মেয়েটা নেই। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাইনি। পরে রামপুরা থানায় জিডি করেছি। এখনো আমার মেয়ের কোনো সন্ধান পাইনি।’

শিশু মীমকে উদ্ধারে পুলিশের তৎপরতা চলছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘শিশুটির বাবা রামপুরা থানায় জিডি করেছেন। আশপাশ এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। রেডিও বার্তার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে জানানো হয়েছে। শিশুটিকে উদ্ধারে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।’

শিশু নিখোঁজের ঘটনায় কাজ করা বেসরকারি সংস্থা মুন অ্যালার্টের তথ্য অনুযায়ী, কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া থেকে গত বুধবার বেলা ৩টার দিকে ১১ বছর বয়সী সাজিদুর রহমান এবং প্রায় একই সময়ে মিরপুরের রূপনগর থেকে ১২ বছর বয়সী মোহাম্মাদ আলী নিখোঁজ হয়। একই দিন বেলা ২টার পর মাদারীপুরের ডাসার থেকে তাসিন সরদার এবং এর প্রায় ১ ঘণ্টা আগে রাজশাহীর গোদাগাড়ী থেকে সোহেল রানা নামে আরেক শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোয় শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এসব এলাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় অপরিচিত মানুষের চলাচলও বেশি এবং অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের ওপর পরিবারের সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে বাসাবাড়ি থেকে একা বের হওয়া, স্কুলে যাতায়াত কিংবা খেলাধুলার সময় শিশুরা সহজেই নজরদারির বাইরে চলে যেতে পারে। ফলে শিশু নিখোঁজের ঘটনা ঠেকাতে পরিবারকে আরো সতর্ক থাকার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি, সিসিটিভি ব্যবস্থা এবং দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর ওপর গুরুত্ব দেয়ার কথা বলছেন তারা।

পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, নিখোঁজ শিশুদের বড় অংশই কিশোর-কিশোরী। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১৫ হাজার ২৪৩ শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ ১ হাজার ৯৭০ জন। একই সময়ে নয় বছর বয়সী ৪৭৪ শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪০৬ জন উদ্ধার হলেও ৬৮ জন এখনো নিখোঁজ।

বয়সভেদে নিখোঁজ হওয়ার কারণেও পার্থক্য রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশুরা অপরিচিত স্থানে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, নাম-ঠিকানা বলতে না পারা কিংবা একা বাড়ি ফেরার সময় অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হয়। আর ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে অভিমান, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক কলহ, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণ কাজ করে।

তবে সব নিখোঁজের ঘটনায় একই কারণ প্রযোজ্য নয়। বিশেষ করে মীমের মতো শিশুর ক্ষেত্রে কীভাবে সে বাসা থেকে বের হলো বা তাকে কেউ নিয়ে গেছে কি না তা এখনো তদন্তাধীন। ফলে সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণই হয়ে উঠছে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নিখোঁজের পাশাপাশি শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জানুয়ারি-আগস্টের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে ৭০৯টি শিশু সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছে ২৫৪ শিশু।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজের জিডি হয় ১৭ হাজার ৮০৮টি, ২০২৪ সালে ১৬ হাজার ৪১৪ ও ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০টি।

মীমের পরিবার অবশ্য এখন পরিসংখ্যান নয়, অপেক্ষা করছে একটি ফোনকলের। দরজা খোলার ২০ মিনিট পর যে শিশুটিকে আর পাওয়া যায়নি, সে কোথায়—এখন সেই উত্তরই খুঁজছে পরিবার। আর পুলিশের হিসাব বলছে, এমন অপেক্ষায় থাকা পরিবারের সংখ্যা এখনো দুই হাজারের বেশি।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিশু নিখোঁজের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ব্যবস্থা নেয়। প্রতিটি ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হয়। প্রযুক্তিগত সহযোগিতার পাশাপাশি পুলিশের অন্যান্য সক্ষমতা ও বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য কাজে লাগিয়েও শিশু উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়।’ পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত পুলিশকে জানানো হলে উদ্ধার কার্যক্রম আরো কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় বলেও জানান ঊর্ধ্বতন এ কর্মকর্তা।

আরও