ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যেকোনো দুর্ঘটনায় কর্তব্যের ডাকে সবার আগে সাড়া দেন অগ্নিনির্বাপণ কর্মী বা ফায়া সার্ভিসের সদস্যরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জানমাল রক্ষায় কাজ করেন তারা। এমন ঝুঁকি নিয়ে অন্যের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে গত এক দশকে প্রাণ হারিয়েছেন ২৫ অগ্নিনির্বাপণ কর্মী। গুরুতর আহত হয়েছেন প্রায় ৩৮৪ জন। এর মধ্যে কেবল গত তিন বছরেই প্রাণ হারিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের ১৮ সদস্য। এসব প্রাণহানির অধিকাংশই ঘটেছে বহুতল ভবন ও রাসায়নিক বিস্ফোরণ থেকে। এ অবস্থায় দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধির তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত অগ্নিদুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় উদ্ধারকাজ পরিচালনার সময় প্রাণ হারিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের ২৫ সদস্য। এর মধ্যে ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ১৩ জন অগ্নিনির্বাপণ কর্মী প্রাণ হারান। ২০২৩ সালে প্রাণ হারান একজন। ২০২৪ সাল ও চলতি বছরের এখন পর্যন্ত দুজন করে অগ্নিনির্বাপণ কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। অর্থাৎ গত তিন বছরেই অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবেলা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের ১৮ সদস্য। প্রাণহানির এসব ঘটনা বেশি ঘটেছে রাসায়নিক বিস্ফোরণ ও বহুতল ভবনের আগুন থেকে। সবচেয়ে বেশি অগ্নিযোদ্ধা হতাহতের ঘটনা ঘটে ২০২৩ সালে। ওই বছর দুর্ঘটনা মোকাবেলা করতে গিয়ে গুরুতর আহত হন ৫৪ জন। এক্ষেত্রে রাসায়নিক বিস্ফোরণ ও বহুতল ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা বেশি ঘটে।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোয় লাগা আগুনে। ২০২২ সালের ৪ জুনের ওই ঘটনায় ১৩ জন অগ্নিনির্বাপণ কর্মী নিহত হন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার পর একসঙ্গে এত ফায়ার সার্ভিস কর্মীর নিহতের ঘটনা আর ঘটেনি। সেখানেও রাসায়নিক সংরক্ষণের তথ্য গোপন করা হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পানি ছোড়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটি কনটেইনার বিস্ফোরিত হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তেই পুড়ে অঙ্গার হয়ে যান ফায়ার সার্ভিসের ১৩ কর্মী। ২২ সেপ্টেম্বর টঙ্গীর সাহারা মার্কেট এলাকায় একটি রাসায়নিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুন নেভানোর সময় দুজন অগ্নিনির্বাপণ কর্মী মারাত্মক দগ্ধ হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে তাদের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত হন ফায়ার সার্ভিসের আরো ছয়জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগুন নেভাতে যাওয়ার আগে অনেক সময় মিথ্যা তথ্য দেয়ার কারণে প্রাণ হারান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। যেমনটি ঘটেছিল চট্টগ্রামে, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে টঙ্গীতে। টঙ্গীর ফেমাস কেমিক্যালের ফায়ার লাইসেন্স ও পরিবেশ ছাড়পত্র কোনোটিই ছিল না। চলছিল অবৈধভাবে। অগ্নিনির্বাপণের সময় মালিক পক্ষের কেউ ছিল না। এ কারণে ভেতরে কী ধরনের কেমিক্যাল ছিল, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। পরে দেখা গেছে, গুদমে সোডিয়াম-জাতীয় দ্রব্য ছিল। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন আগুন নেভাতে গিয়েছিলেন তখনই কেমিক্যালের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আহত হন।
এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের সাবেক উপপরিচালক (অপারেশন) দেবাশীষ বর্ধন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাসায়নিকের আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দরকার। পাশাপাশি এ ধরনের আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করার জন্য তিন স্তরের বিশেষ পোশাক পাওয়া যায়, সেগুলো নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া যারা রাসায়নিকের আগুন নিয়ন্ত্রণে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত তাদের এ ধরনের স্টেশনে পদায়ন করতে হবে। টঙ্গীর রাসায়নিক গুদামের আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস থেকে যারা গিয়েছিলেন তারা কিন্তু আগেই জেনে গিয়েছিলেন যে সেখানে রাসায়নিক রয়েছে, হয়তো জানতেন না নির্দিষ্ট কোন রাসায়নিক ছিল। এর পরও তারা সেখানে কার্যকর রাসায়নিক আগুন নিয়ন্ত্রণের পোশাক পরে গেলেন না কেন? সেখানে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ছিল। পানি দিতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে।’
দুর্ঘটনায় সাড়া দিতে গিয়ে অগ্নিনির্বাপণ কর্মীদের প্রাণহানি বা হতাহতের ঘটনা কমিয়ে আনতে এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের প্রাণহানির ঘটনা গত তিন বছরে অনেক বেড়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাসায়নিকের ব্যবহার বেড়েছে। বেড়েছে আইন না মানার প্রবণতাও। বিশেষ করে নিবন্ধন ছাড়াই অনেকে রাসায়নিক গুদাম করছেন। নিবন্ধন না থাকার ফলে এসব প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আমাদের কাছে বিস্তারিত তথ্য থাকে না। ফলে এসব দুর্ঘটনা অনেকাংশেই প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমরা কমিউনিটি পর্যায়ে সেফটি টিম গঠনের চেষ্টা করছি। তারা স্থানীয়ভাবে সব প্রতিষ্ঠানের তথ্য রাখবে এবং দুর্ঘটনার সময় প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করবে। এতে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে। কারণ আমরা যেসব প্রতিষ্ঠানের তথ্য জানি না, স্থানীয় কমিউনিটি কিন্তু সেগুলো জানে। ফলে কাজটা অনেকটাই সহজ হয়ে আসবে।’