বিশেষ করে ভূমি গঠনের চেয়ে ভাঙনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় চরম ঝুঁকিতে পড়েছে এখানকার ৪০ হাজারের বেশি বাসিন্দা ও স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি।
১৯৭০-৭১ সালের দিকে সন্দ্বীপের উত্তর-পশ্চিমে মেঘনা নদীর মোহনায় প্রথম চরটি জাগতে শুরু করে। কালক্রমে পলি জমে এটি বিশাল চরে পরিণত হয় এবং মাটি শক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্দ্বীপ, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার চরাঞ্চলের নদীভাঙা মানুষ দ্বীপটিতে বসতি স্থাপন শুরু করে। বর্তমানে এটি সন্দ্বীপের একটি পূর্ণাঙ্গ ইউনিয়ন হিসেবে প্রশাসনিক মর্যাদা লাভ করেছে।
তবে কয়েক বছর ধরে উড়িরচরের দক্ষিণ অংশের ভাঙন পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। চরবাসী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সরকারের কাছে বারবার দাবি জানালেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান মেলেনি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ভাঙনকবলিত এলাকার মাত্র ২০০ মিটার অংশে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা কাজ করেছিল, যা এরই মধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
প্রশাসনের উদাসীনতা ও মেগা প্রকল্পে অর্থায়নে অনীহার কারণে অবশেষে চরের বাসিন্দারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় "ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে।
পাউবোর নথি অনুযায়ী, সন্দ্বীপ-উড়িরচর-স্বর্ণদ্বীপ-ভাসানচর-মিরসরাই অঞ্চলটি মেঘনা নদীর মোহনার অত্যন্ত গতিশীল চরাঞ্চল। এখানে নদী ও সাগরের প্রবল স্রোত, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে পুরনো বসতি ও কৃষিজমি বারবার বিলীন হয়। ২০১২ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত উড়িরচরের দক্ষিণ তীরে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৫০ মিটার করে ভাঙছে। গত ১২ বছরে প্রায় দুই কিলোমিটার অংশ ভেঙে গেছে এবং ১৩ বছরে প্রায় ১৪ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা বিলীন হয়ে গেছে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৯ বছরে দ্বীপটি ভাঙনশূন্য ছিল। সে সময় কেবল ভূমি গঠনই হয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ২০১০-২২ সালের মধ্যে বড় আকারে ভাঙনের শিকার হয়। ২০২২-২৩ সালেই ভূমি গঠনের তুলনায় ভাঙনের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ধারা অব্যাহত থাকলে দ্বীপের দক্ষিণাঞ্চল খুব দ্রুতই বিলীন হয়ে যাবে।
উড়িরচরের ভাঙন ও প্রতিরোধ বিষয়ে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজির সাইফ আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দ্বীপটির গঠন এখনো পরিপূর্ণতার দিকে যায়নি। দীর্ঘদিন গঠন ও ভাঙনের মধ্যে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়গুলোতে এ দ্বীপে ভাঙনের হারই বেশি।’
উড়িরচরের ভাঙন রোধ ও উপকূলীয় জনপদের সুরক্ষায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৭৯৩ কোটি ৮০ লাখ টাকার একটি বড় প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। ‘উত্তর সন্দ্বীপে নবসৃষ্ট ভূমি উন্নয়ন ও দক্ষিণ উড়িরচরে ভাঙনের ফলে ভূমি হ্রাস রোধকরণ প্রকল্প’ শীর্ষক এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে পাউবো। প্রকল্পের সম্ভাব্য বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় উত্তর সন্দ্বীপে ১০ দশমিক ২২ কিলোমিটার নতুন বেড়িবাঁধ নির্মাণ, উড়িরচরের দক্ষিণ উপকূলে ৭ দশমিক ৩০ কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষাকাজ, তিনটি পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণ এবং ১৩ দশমিক ১১ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে সন্দ্বীপের উত্তরে পোল্ডার-৭২-এর বাইরে জেগে ওঠা দীর্ঘাপাড় ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার ৫০০ হেক্টর ভূমি মূল ভূখণ্ডের সুরক্ষিত ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
পাউবোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দক্ষিণ উড়িরচরের ১ হাজার ৭৩৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা মূল্যমানের কৃষিজমি ও অবকাঠামো রক্ষা পাবে। লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ঠেকানো গেলে কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়বে। এতে বছরে ৭ হাজার ৬৭৫ টন ধান ও ১৮ হাজার ৯৯ টন অন্যান্য শস্য উৎপাদন বাড়বে, যার বার্ষিক অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ১৭৫ কোটি ২ লাখ টাকা।