ভালুকায় শিল্পবর্জ্যে দূষিত বিলের পানি, অনাবাদি ৩৩৬ একর কৃষিজমি

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার ভরাডোবা ইউনিয়নে বেশ কয়েকটি বিল রয়েছে।

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার ভরাডোবা ইউনিয়নে বেশ কয়েকটি বিল রয়েছে। এসব বিলে এক হাজার একরের বেশি আবাদি জমি রয়েছে। এক ফসলি এসব জমিতে এক সময় শুধু বোরো ধান আবাদ হতো। তবে কারখানার বর্জ্যে দূষিত হয়ে পড়েছে বিলের পানি। ফলে দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বিলগুলোর ৩৩৬ একর জমিতে বোরো আবাদ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া এসব বিলের জলজ প্রাণীও অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। রাসায়নিক মিশ্রিত কালো পানিতে আবাদ করতে গিয়ে চর্ম রোগেও আক্রান্ত হচ্ছেন চাষীরা।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা বলছেন, এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটি ৯ জুলাই থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মিল কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে চার দফা গণশুনানি করে। তদন্ত প্রতিবেদনে ভরাডোবা, পুরুড়া, রাংচাপড়া ও ভাটগাঁও গ্রামের কৃষি ব্লকে ৩৩৫ দশমিক ৭৪ একর জমি অনাবাদি হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। এতে উৎপাদন ব্যয় ছাড়াই প্রতি একর জমির জন্য বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় ৬৬ হাজার টাকা। গত ১৫ বছরে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ কোটি ২৮ লাখ ১০ হাজার টাকা। তদন্ত কমিটির দেয়া সুপারিশে কৃষকের ক্ষতিপূরণের ২৫ শতাংশ মুলতাজিম মিল ও ৭৫ শতাংশ টাকা এক্সপেরিয়েন্স মিল কর্তৃপক্ষ পরিশোধ করবে। যদিও কারখানা কর্তৃপক্ষ সে টাকা পরিশোধ করেনি।

স্থানীয় কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এতগুলো বছর ধরে বিলে আমরা ধান উৎপাদন করতে পারছি না। পানিতে মাছের বংশবিস্তারও হচ্ছে না। আমি কয়েকবার ধান রোপণ করেছি। কিন্তু গাছ পচে মরে যায়। বিলের পানির মধ্য দিয়ে হাঁটলে পা কালো হয়ে যায়। শরীরে বিভিন্ন ধরনের চর্ম রোগ দেখা দেয়। এ বিলের ধান থেকেই আমার সংসার চলত। এখন নিজের জমি রেখে অন্য গ্রামে গিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাকাচড়া, সাধুয়া, খুরোলিয়া, তালতলা, কেচুরগোনা, মেলেন্দা, দক্ষিণ ভরাডোবার হায়রা বিল, তেইরা, পুরুড়া ও ভাটগাঁও বিল দিয়ে পানি খিরু নদে যায়। বোরো আবাদের জন্য কৃষক এসব বিলের পানির ওপর নির্ভরশীল। উপজেলার ভরাডোবা গ্রামে ২০০৭ সালে এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইল মিল নামে একটি ডাইং কারখানা স্থাপন করা হয়। পরের বছর কারখানাটি উৎপাদনে যায়। একই বছর হেরি ফ্যাশন নামে আরো কারখানা চালু করে এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইল। এর আগে ২০০৪ সালে সেখানে স্থাপন করা হয় মুলতাজিম মিল নামে আরো একটি ডাইং কারখানা। তবে ২০০৫ সাল থেকে উৎপাদনে যায় কারখানাটি। এসব কারখানার বর্জ্য মিশেছে বিলের পানিতে। ফলে বিলের পানি দূষিত হয়ে ধীরে ধীরে কমতে থাকে আবাদি জমি।

তবে এ বিষয়ে মুলতাজিম মিল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা বক্তব্য দিতে রাজি হননি। এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইল মিলে যোগাযোগ করা হলে প্রশাসনিক বিভাগ থেকে জানানো হয় জিএম ঢাকায় রয়েছেন। এজন্য তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, বর্জ্যমিশ্রিত পানি নলকূপের পানির সঙ্গেও মিশে যাচ্ছে। এতে খাবার পানিও অনিরাপদ হচ্ছে। বিলের পানিতে নামলে শরীর চুলকাতে থাকে। ধান রোপণ করলে গাছ মরে যায়। কচুরিপানায় ছেয়ে গেছে বিল। তারা বিভিন্ন সময় প্রতিকার চেয়ে আন্দোলন করেছেন। স্থানীয় প্রশাসনে অভিযোগও করেছেন। কিন্তু স্থায়ী সমাধান পাননি।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মিল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে। সমাধান না হলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’

উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে একটি কমিটি গঠন করা হয়। উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) প্রধান করে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক, মৎস্য কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, মিলের প্রতিনিধি ও কৃষক প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত কমিটি ৯ জুলাই থেকে চার দফা গণশুনানি করে। এতে ৩৩৫ দশমিক ৭৪ একর জমি অনাবাদি থাকার বিষয়টি উঠে আসে।

স্থানীয় কৃষক আশরাফুল আলম বলেন, ‘আমরা বারবার স্থানীয় সরকারি দপ্তরে গিয়েছি। কোনো সমাধান হয়নি। আমরা জমিতে ধান চাষ করতে চাই। আমরা কোম্পানিগুলোর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছি। পানিতে নামলে রোগবালাই দেখা দিচ্ছে। বিল কচুরিপানায় ভরে গেছে। কালো পানি ও কচুরিপানার কারণে বিলে আবাদ করার মতো অবস্থা নেই।’

ভরাডোবা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার শাহাদাৎ হোসেন মানিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে আমরা এসব বিলে আবাদ করতে পারছি না। ধান ও মাছের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। আমরা বেশ কয়েকবার কারখানা কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেছি। তবে কোনো সমাধান হয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন এসে জরিমানা করে। কিছুদিন পানি ছাড়া বন্ধ করে রাখে। পরে আবার ছাড়ে। এখন সার্ভেয়ার দিয়ে কৃষকদের জমির সীমানা নির্ধারণ করা হচ্ছে। আমাদের কৃষিজমি বাঁচাতে হবে।’

পরিবেশ অধিদপ্তর ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ের পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন মাহাবুবুল ইসলাম। যদিও তিনি অন্যত্র বদলি হয়ে গেছেন। তবে তদন্ত কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন এখনো। মাহাবুবুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইল মিলে উৎপাদন অনুযায়ী এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্টের (ইটিপি) ধারণক্ষমতা কম। এছাড়া কারখানা থেকে যত্রতত্র পানি নিষ্কাশন হয়ে থাকে। কারখানাটির বর্জ্য পাশের বিভিন্ন বিলে গিয়ে কৃষিজমির ক্ষতি করছে বলে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। কয়েকবার তাদের চিঠি ও জরিমানা করা হয়েছে। মুলতাজিম মিলে একটি গরুর খামার রয়েছে। খামারের বর্জ্য দিয়ে বায়োগ্যাস করার জন্য বলা হয়েছে। তারা সেটি করছে।’

আরও