সিপিডির উদ্বেগ

জ্বালানি মহাপরিকল্পনায় আমলাতন্ত্র ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত ‘এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান (ইপিএসএমপি)’ বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত ‘এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টারপ্ল্যান (ইপিএসএমপি)’ বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ জ্বালানি মহাপরিকল্পনায় আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। একই সঙ্গে পরিকল্পনাটি স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০২৬-২০৫০)’ নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মিডিয়া ব্রিফিংয়ে উদ্বেগের কথা জানায় সিপিডি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। ব্রিফিংয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তি।

জ্বালানির মহাপরিকল্পনায় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ‘যেকোনো সরকারি নীতি বা পরিকল্পনা শুধু একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক চুক্তি। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সরকারকে চাপের মুখে রাখছে। কিছু ক্ষেত্রে সরকার তাদের কাছে নতি স্বীকার করছে। বিশেষ করে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আসন্ন বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোতে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের ছাড় দেয়ার বা বিশেষ প্রতিশ্রুতি দেয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।’

দশককাল ধরে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নিয়ে কাজ করছে সিপিডি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনার খসড়া দাঁড়িয়ে গেছে, অথচ সিপিডি জানে না। এটা সিপিডির জন্য একধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি বলে উল্লেখ করেন ড. গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ‘তাড়াহুড়া করে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা ছাড়া, কোনো বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এ ধরনের একটা কাজ গোপনে শেষ করা আগের সরকারের মতোই আচরণ।’

এলএনজিতে আমদানিনির্ভর অবকাঠামোর ঝুঁকি রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের অবকাঠামো একবার তৈরি হয়ে গেলে তা পরবর্তী ৫০-৬০ বছর ধরে ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে, যা দেশকে একটি দুষ্ট চক্রে ফেলে দেয়। এর ফলে অভ্যন্তরীণ উৎসের বদলে বারবার গ্যাস আমদানির প্রয়োজন হয়। ২০১৭ সালের দিকে বিশেষ গোষ্ঠীর চাপে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ প্রায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, যা জাতীয় স্বার্থের চরম পরিপন্থী ছিল।’

বিদ্যুৎ খাত নিয়ে ড. মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন সক্ষমতার জন্য ব্যয় দিন দিন বাড়ছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রয়মূল্যের চেয়েও অনেক বেশি। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে ভূরাজনৈতিক বিষয়গুলো জড়িয়ে আছে। এমনকি নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আনতে হলেও প্রতিবেশী দেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। দেশের ভেতরে গ্যাস উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমছে। একই সঙ্গে গভীর সমুদ্রে গ্যাস পেতে প্রায় ১০-১২ বছর লাগবে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়।’

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘খসড়া পরিকল্পনায় প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রয়োজন দেখানো হয়েছে। এ বিপুল বিদ্যুৎ আসলে কে ব্যবহার করবে? সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৪০ সাল পর্যন্ত দেশের চাহিদা পূরণে এর অর্ধেক সক্ষমতাই যথেষ্ট হতে পারে।’ অতিরিক্ত সক্ষমতা ধরে পরিকল্পনা করলে বিদ্যুৎ খাতে উদ্বৃত্ত উৎপাদন আরো বাড়বে এবং আর্থিক চাপ গভীর হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাড়ির ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন ও শিল্প-কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের স্বার্থে অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।’

সিপিডি মনে করে, জাতীয় নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ইপিএসএমপি প্রণয়ন কার্যক্রম স্থগিত রাখা উচিত। নির্বাচিত সরকারের অধীনে একটি নতুন, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

মূল প্রবন্ধে হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তি বলেন, ‘জাতীয় গ্রিড উন্নয়নে পরিকল্পনাটি অত্যন্ত দুর্বল। স্মার্ট গ্রিড বাস্তবায়ন ২০৪০ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ বর্তমান গ্রিড ২০ শতাংশের বেশি পরিবর্তনশীল নবায়নযোগ্য জ্বালানি গ্রহণে সক্ষম নয়। খসড়ায় কয়লা ও এলএনজি-নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন করে ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। এতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৬ দশমিক ৮ থেকে বাড়িয়ে ১২ দশমিক ৯ গিগাওয়াট করার প্রস্তাব রয়েছে। নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিনিয়োগ, যা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তাকে দুর্বল করব।’

জ্বালানি মহাপরিকল্পনার প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অনুমোদন না দিতে সুপারিশ করেছে সিপিডি। সংস্থাটি বলেছে, বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র ধাপে ধাপে বন্ধের সময়সূচি নির্ধারণ করা উচিত। নতুন এলএনজি প্রকল্প বাতিল ও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সংজ্ঞা স্পষ্ট করে সৌর ও বায়ুশক্তিকে অগ্রাধিকার দেয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রামসহ সম্ভাবনাময় অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এছাড়া নেপাল ও ভুটান থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়টি পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে সিপিডি।

আরও