এক দশকের ক্যানভাস

আজ বণিক বার্তা পথচলার এক দশক পূর্ণ করছে। এ যাত্রাপথে আমরা অনেক কিছু দেখেছি, শিখেছি। পাশে পেয়েছি পাঠকদের। তাদের সঙ্গে আজ কিছু কথা ভাগ করে নিতে চাই। আমরা যখন যাত্রা করি, তার কাছাকাছি সময়ে বড় বিনিয়োগ নিয়ে বেশ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা যাত্রা করেছিল। কিন্তু সেগুলোর অনেকগুলোই আজ আর ছাপা হয় না। বন্ধ হয়ে যাওয়া এ

আজ বণিক বার্তা পথচলার এক দশক পূর্ণ করছে। এ যাত্রাপথে আমরা অনেক কিছু দেখেছি, শিখেছি। পাশে পেয়েছি পাঠকদের। তাদের সঙ্গে আজ কিছু কথা ভাগ করে নিতে চাই। আমরা যখন যাত্রা করি, তার কাছাকাছি সময়ে বড় বিনিয়োগ নিয়ে বেশ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা যাত্রা করেছিল। কিন্তু সেগুলোর অনেকগুলোই আজ আর ছাপা হয় না। বন্ধ হয়ে যাওয়া এ পত্রিকাগুলোর মধ্যে ছিল অর্থনীতিবিষয়ক দৈনিকও। অন্যদিকে বড় পরিসরে যাত্রা করে অনেক জাতীয় দৈনিক তাদের আয়োজন সংকুচিত করে এনেছে। আমাদের মনে হয়েছে, বড় বিনিয়োগ থাকলেই পাঠকের আস্থা অর্জন সম্ভব নয়, তড়িঘড়ি করেও তা পাওয়া যায় না।

আমরা যখন যাত্রা করি তখন থেকে আজকের দিনে দুনিয়ার অনেক কিছুই আকাশ-পাতাল বদলে গেছে। ১০ বছর আগে যে মানুষটি ছাপা পত্রিকার পাতা ওল্টাতেন, তিনি হয়তো এখন ডিজিটাল দুনিয়ায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সারা বিশ্বেই আজ ছাপা পত্রিকা এ নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। ডিজিটাল দুনিয়ায় নিজেদের মানিয়ে নেয়া, নতুন পাঠক তৈরি করা এ সময়ে আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে পত্রিকাকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী রাখাটাও অত্যন্ত জরুরি। ছাপা সংবাদপত্রের জন্য প্রতিকূল সময়ে দৃঢ়ভাবে এক দশকের মাইলফলক পার করতে পেরে আমরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি আত্মবিশ্বাসী। পাঠকরা পাশে ছিলেন বলেই এ অর্জন সম্ভব হয়েছে।

২০১১ সালে যখন বণিক বার্তা যাত্রা শুরু করে তার কয়েক বছর আগেই এ ধরণের কাগজের স্বপ্ন দেখি। তখন আমার বয়স ৩২ বছর। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে সেদিন কাজ শুরুর আগে ১০ বছর যুক্ত ছিলাম সাংবাদিকতায়, স্পষ্ট করে বললে রিপোর্টিংয়ে। যাত্রার শুরুতে আমাদের আশা ছিল রাজনীতি, অপরাধ, নিত্যদিনের নানা ঘটনার বাইরে ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, রাজনৈতিক অর্থনীতি, নীতি বিশ্লেষণের মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে একটি দৈনিক পত্রিকাকে সাজানো যেতে পারে। দেশের ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে আছে নতুন তথ্য ও বিশ্লেষণ জানার চাহিদা। আমরা স্বপ্ন দেখেছি নতুন পাঠক তৈরি করার। বিশ্বাস ছিল, একই সঙ্গে নিজের আয়ে চলতে পারার মতো সক্ষমতা অর্জনও সম্ভব। বণিক বার্তার যাত্রার সময় তিনটি রূপকল্প আমরা সামনে রেখেছিলাম—১. তরুণ, নতুন পেশাদার কর্মীদের চিন্তা ও উদ্দীপনাকে স্থান করে দেয়া; ২. সংবাদের নির্ভুলতা ও নির্ভরযোগ্য উৎস এবং ৩. বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক বিকাশের শক্তি ও সীমাবদ্ধতাকে বিকল্প দৃষ্টিতে তুলে আনা।

এক দশকে আমরা যতটা বিকশিত হতে চেয়েছি, সেটা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। তবে গর্ব ও আনন্দের সঙ্গে আমরা বলতে পারি যে বণিক বার্তা বিভিন্ন মহলে সুনাম ও আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। পেশাগত পরিসরে বণিক বার্তা তারুণ্যনির্ভর। তরুণদের ক্যারিয়ার শুরু করার একটি প্রাণবন্ত কর্মক্ষেত্র। বণিক বার্তা কর্মক্ষেত্রে সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখতে সবসময়ই সচেতন।

কভিড মহামারীর এ অভূতপূর্ব কালে আমরা ভীষণ প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করেও শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছি। সামনের দিনে প্রিন্ট ও ডিজিটাল মাধ্যমে আরো শক্তিশালী ও সৃষ্টিশীলভাবে হাজির হওয়ার জন্য বণিক বার্তা প্রস্তুত হচ্ছে। সমাজের মতো পত্রিকাও কোনো জড়বস্তু নয়। প্রতিদিনই দুনিয়া বদলে যাচ্ছে, আগের চেয়ে দ্রুততার সঙ্গে। আমরা এসব পরিবর্তন নিয়ে সচেতন। নতুন প্রবণতা ও বিকাশকে আমরা পর্যবেক্ষণ করি। দিনশেষে পাঠকের সামনে হাজির হতে চাই প্রয়োজনীয় ও নির্ভুল খবর নিয়ে; নানা সৃষ্টিশীল আয়োজনে ঋদ্ধ করতে চাই আমাদের পত্রিকা। আজ এক দশকের যাত্রা শেষে আমাদের আশা, পাঠকদের নিয়ে আমরা আগামী দিনগুলোতে আরো অনেক মাইলফলক অতিক্রম করব। আমাদের দৃঢ় সংকল্প রয়েছে যে বণিক বার্তা লেখক, গবেষক, ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক, শিক্ষার্থী, পাঠকদের জন্য জ্ঞানের আদান-প্রদান ও বিতর্কের একটি নির্ভরযোগ্য প্লাটফর্ম হিসেবে ভূমিকা রাখবে।

যাত্রার শুরুতে বণিক বার্তার ট্যাগ লাইন ছিল ‘সমৃদ্ধির সহযাত্রী’। এক দশকের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে আমরা আজ নতুন একটি ধারণাকে ট্যাগ লাইন হিসেবে গ্রহণ করেছি—‘তথ্যেই অগ্রগতি’। পাঠকের কাছে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখতে আমরা সতর্কভাবে বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি রেখেছি। এক দশকের ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত হলেও আমরা কখনো পুরনো হতে চাই না। প্রতিদিনই আমরা নতুন। এটা স্পষ্ট যে আজকের দুনিয়ায় তথ্যই পরিবর্তন ও উন্নতির হাতিয়ার। তথ্যই এ যুগের শক্তি। ব্যক্তি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রয়োজনীয় ও নির্ভুল তথ্য ছাড়া শিল্পায়িত ও প্রযুক্তিনির্ভর আজকের দুনিয়ায় নীতিনির্ধারণ, গবেষণা, অগ্রগতি আর সম্ভব নয়। এছাড়া ডিজিটাল যুগ আমাদের হাজির করেছে অফুরন্ত এক তথ্যভাণ্ডারের মধ্যে। দরকারি তথ্য যেন আলাদিনের প্রদীপের দৈত্যের মতো, নিমেষেই সম্পন্ন করে দিতে পারে বড় বড় কাজ, সহজ করে দেয় সিদ্ধান্ত নেয়ার চ্যালেঞ্জকে। তথ্যের প্রাচুর্য আবার শঙ্কাও জাগিয়েছে। কারণ ভুল তথ্য বিপর্যয় ডেকে আনতে দেরি করে না। তাই আমরাও সতর্ক। প্রতিদিনই পাঠকের প্রয়োজনীয় তথ্য নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে ছাপার অক্ষরে ও ডিজিটাল প্লাটফর্মে সরবরাহ করতে আমরা দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ।

এ বছর বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন এবং আজকের দিনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বিশ্ববাসীকে অবাক করেছে। একটি দৈনিক পত্রিকা হিসেবে আমরাও চেষ্টা করেছি পেশাগত সততা ও দক্ষতার মাধ্যমে দেশের দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের ভূমিকা পালন করতে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ব্যবসায়িক সাংবাদিকতার যে নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছিল, আমরা সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে সে চাহিদা পূরণে চেষ্টা করে যাচ্ছি।

বণিক বার্তার ১০ বছরের যাত্রাপথে আছে অনেকের অবদান। তাদের অনেকে আমাদের সঙ্গে আছেন, কেউ পেশাগত কারণে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়েছেন, আবার কেউ প্রয়াত হয়েছেন। তাদের সবার প্রতি বণিক বার্তার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। ১০ বছরের যাত্রা সম্পন্ন করার এই দিনে বণিক বার্তার সব পাঠক, লেখক, শুভানুধ্যায়ীকে ধন্যবাদ জানাই। আপনাদের ভালোবাসা, সহযোগিতা না থাকলে আমরা আজকের মাইলফলকটি অর্জন করতে পারতাম না।

আরও