নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কুমড়ী গ্রামের জিরু শেখ মাছ চাষ করছেন দেড় দশকের বেশি সময় ধরে। মাছের কোনো অসুখ দেখা গেলে বাজারের সাধারণ দোকান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক এনে নিজেই প্রয়োগ করেন পানিতে। এজন্য কোনো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়ার প্রয়োজন মনে করেন না তিনি। এভাবে ভুল অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগে মাছের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠার বিষয়টি এরই মধ্যে প্রত্যক্ষ করলেও এর অন্যান্য প্রাণবিধ্বংসী প্রভাবের ব্যাপারটি অজানা তার।
জিরু শেখের মতো দেশের অধিকাংশ মৎস্যচাষীই অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। মাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য বেশির ভাগ চাষীই অজ্ঞতা ও বড় ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি ও স্থানীয় ফিড ব্যবসায়ীদের প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক পুকুর বা ঘেরে প্রয়োগ করেন, যা মাছ হয়ে মানবদেহে এবং দেশের নদ-নদী ও কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। ফলে জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে দেশের জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য।
চাষের মাছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ নিয়ে ২০২২ সালে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। গবেষণা দলের সদস্য ছিলেন ১৫ জন। বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মৎস্য গবেষকরা এতে কাজ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান হলো আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি), মালয়েশিয়া ও ঢাকার ওয়ার্ল্ড ফিশ, অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের মেডিসিন অ্যান্ড হেলথ ফ্যাকাল্টি এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োসিকিউরিটি প্রোগ্রামের গবেষকরাও এতে অংশ নেন।
গবেষকরা দেশের ছয়টি জেলার ৬৭২টি মাছের খামার থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। জেলাগুলো হলো ময়মনসিংহ, যশোর, কুমিল্লা, সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৭ শতাংশ মাছচাষীই পুকুর বা ঘেরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, রোগ সারাতে ও রোগ যাতে না হয়—এ দুই কারণেই তারা মাছে এটি প্রয়োগ করেন। দ্রুত বৃদ্ধি ও অধিক মুনাফা লাভের আশায় মাছে মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করেন বদ্ধ জলাশয়ের এসব চাষী। এতে মানবদেহের পাশাপাশি ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশ ও প্রতিবেশের। জানা গেছে, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বেশি প্রবণতা দেখা গেছে অনভিজ্ঞ মাছচাষীদের মধ্যে। ওষুধ কোম্পানির বিভিন্ন প্রতিনিধি ও স্থানীয় ফিড ব্যবসায়ীরাই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে উৎসাহিত করেন তাদের।
নাটোর জেলা মৎস্য বিভাগ জানায়, জেলায় মোট মাছের চাহিদা ৪০ হাজার ৪৯১ টন। সেখানে উৎপাদন হয় ৭৮ হাজার ১৮০ টন। উদ্বৃত্ত থাকছে প্রায় ৩৫ হাজার টন মাছ। জেলায় রুই, কাতলা, মৃগেল, কারফু, গ্রাস কার্প, ব্লাড কার্প মাছ উৎপাদন হয়। সঙ্গে পাবদা ও টেংরা বা গুলশা মাছ চাষ করেন চাষীরা। এসব মাছ চাষ করতে গিয়ে দ্রুত বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক। এসিআই, এসকেএফ, স্কয়ার, সেঞ্চুরি, বায়ারসহ বিভিন্ন কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছেন চাষীরা। এর মধ্যে সিপরো-১০, এসিলোভা, রেনামাইসিন, লিভোফ্লক্সাসিন অন্যতম। একসময় এসব অ্যান্টিবায়োটিক ১০ মাত্রায় ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এখন মাছের প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবহার হচ্ছে ২০ মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রেতা বলেন, ‘ওষুধ কোম্পানির লোকজন আমাদের কাছে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে যায়। চাষীরা চাইলে আমরা তাদের কাছে বিক্রি করি। মূলত কোম্পানির লোকজন যেভাবে প্রয়োগ করতে বলে, আমরা তাদের সেভাবেই দিতে বলি।’
নাটোর জেলা মৎস্যচাষী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, ‘নতুন ও অনভিজ্ঞ চাষীরা না বুঝে কোম্পানির লোকদের প্রলোভনে পড়ে মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছেন। এটি পুকুর বা ঘেরে একবার দেয়া হলে নির্দিষ্ট সময় পর যদি সরানো না হয়, তাহলে মাছ ও পরিবেশের ক্ষতি হয়।’
সম্প্রতি বদলি হওয়া নাটোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মাছে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কোনো দরকারই নেই। পুকুর, মাটি ও পানি ভালো রাখলে সেখানে এর কোনো প্রয়োজন পড়ে না। তাছাড়া বারবার মৎস্য বিভাগ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে চাষীদের নিরুৎসাহিত করে আসছে। কিন্তু কিছু কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি ও দোকানদার তাদের বিক্রি বাড়ানোর জন্য চাষীদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে উৎসাহিত করছেন। এতে মাছের স্বাস্থ্যগত সমস্যার পাশাপাশি পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতি হচ্ছে।’
মাছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের বড় অংশই অপ্রয়োজনীয় ও অবৈজ্ঞানিক পন্থায় হয়ে থাকে; যা মাছের জন্য তো বটেই, ক্ষতি বয়ে আনে মানবস্বাস্থ্যের জন্যও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নিয়ামুল নাসের বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাছে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার শুরু হয়েছে পোলট্রিতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের দেখাদেখি। কিন্তু মাছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। মুরগিকে অ্যান্টিবায়োটিক দেয়ার পর সেটা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে না। মুরগি খেয়ে ফেলে। কিন্তু মাছে প্রয়োগ করলে সেটা পানিতে থেকে যায়। আবার যেহেতু বেশি পরিমাণে দেয়া হয়, তাই মাছের শরীরে থাকা অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক মানবদেহে প্রবেশ করে।’
এ অ্যান্টিবায়োটিক মাছের জন্যও বেশ ক্ষতিকর উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মাছের মধ্যে অনেক উপকারী ব্যাকটেরিয়া আছে। আবার পানিতেও অনেক উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে। অপ্রয়োজনে ও অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের ফলে ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলো মরে যায়। অন্যদিকে খারাপ ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রতিরোধী হয়ে পড়ে। এ মাছ যখন মানুষ খায় তখন মানবদেহেও অ্যান্টিবায়োটিক ঢুকে যায়। যে কারণে এখন আমাদের দেশে উচ্চমাত্রার দামি অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে হয় মানবদেহে। কম মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করছে না।’
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব চাষের মাছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ হচ্ছে সেগুলো হলো পাঙাশ, তেলাপিয়া, গলদা চিংড়ি, বাগদা চিংড়ি, কার্প, টেংরা, গ্রাস কার্প, সিলভার কার্প, রুই, কাতলা, মৃগাল, পাবদা, শিং, মাগুর ও কই মাছ। এ মাছগুলোর মধ্যে প্রয়োগ করা অ্যান্টিবায়োটিকগুলো হলো অক্সিটেট্রাসাইক্লিন, এনরোফ্লক্সাসিন, ফ্লরফেনিকল, টেট্রাসাইক্লিন, ফ্লুরোকুইনোলোনস, ম্যাক্রোলাইডস, অ্যামিনোগ্লাইকোসাইডস, সিপ্রোফ্লক্সাসিন, অ্যামোক্সিসিলিন। এসব অ্যান্টিবায়োটিক পরিমিত মাত্রার বেশি ব্যবহার করা মাছের জন্য খুবই ক্ষতিকারক। এসব মাছ খেলে মানুষের শরীর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠে।
অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের ফলে মাছ মরে যাওয়ার ঘটনার কথাও জানিয়েছেন চাষীরা। নড়াইলের ঘের মালিক সমিতির সভাপতি আকরাম শহীদ চুন্নু বলেন, ‘এ জেলার হাজার হাজার কৃষক মৎস্য চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এ এলাকায় রুই, কাতল, মিনার কার্প, গ্রাস কার্প, সিলভার কার্প, পাবদা, কৈসহ অন্তত ১৫ প্রজাতির মাছের চাষ করে এখানকার চাষীরা। বিভিন্ন সময়ে মাছ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। বেশির ভাগ মৎস্যচাষী অজ্ঞতার কারণে বাজারে যেসব অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়াই সেগুলো ব্যবহার করছেন। ফলে অনেক সময় মৎস্যচাষী অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তাদের সরকারি-বেসরকারিভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হলে তারা এভাবে আর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করবেন না। বাজারে যেসব কোম্পানির ওষুধ পাওয়া যায়, তাদের প্রতিনিধিরা মাছচাষীদের ভুল বুঝিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক দিতে বাধ্য করছে। এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।’
নড়াইল জেলা মৎস্য অফিসার এইচএম বদিউজ্জামান বলেন, ‘ঘেরগুলোয় আমরা কেবল চুন ও লবণ দিতে পরামর্শ দিই। জেলার অনেক চাষী বিভিন্ন সময়ে মাছের রোগ-বালাই থেকে মুক্তির জন্য বিভিন্ন প্রকার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন। আমরা জেলা মৎস্য অফিসের পক্ষ থেকে চাষীদের এসব অ্যান্টিবায়োটিক দিতে নিরুৎসাহিত করি।’
মাছে ব্যবহার করা অ্যান্টিবায়োটিক মানবদেহ থেকে বিভিন্ন উপায়ে নদী ও কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে কৃষি উৎপাদন, মুক্ত জলাশয়ের মাছ, সাপ, ব্যাঙসহ জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মন্তব্য করেছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক এএসএম সাইফুল্লাহ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পুকুর বা ঘেরে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দিলে সে পানি নানাভাবে দেশের নদ-নদী ও পার্শ্ববর্তী জেলা-উপজেলার কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ে। মানবদেহেও সেটা প্রবেশ করে প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে নদীতে চলে যায়। আমাদের নদী-খাল-কৃষিজমি একটার সঙ্গে আরেকটা সম্পর্কিত। যে কারণে এক জায়গায় ভুল হলে সব জায়গায় তার প্রভাব পড়ে। কৃষিজমি ও নদীর মাছ-প্রাণিকুলের জন্যও এ ধরনের উচ্চ মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ক্ষতিকর, এতে কোনো সন্দেহ নেই।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন বণিক বার্তার নাটোর প্রতিনিধি মাহবুব হোসেন ও নড়াইল প্রতিনিধি মো. ইমরান হোসেন