তীব্র গ্যাস সংকট

দিনে বন্ধ রেখে রাতে শিফট চালু করছে অনেক শিল্প-কারখানা

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলের একটি কারখানায় গ্যাসের চাপ এখন নেমে এসেছে শূন্যের সামান্য ওপরে। স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য যেখানে ৭-৮ পিএসআই চাপ প্রয়োজন, সেখানে মিলছে শূন্যের কাছাকাছি।

ফলে দিনের বেলায় কার্যত উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ডায়িং, ওয়াশিং, ফিনিশিংসহ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো আটকে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে দিনের শিফট সীমিত বা বন্ধ রেখে রাতের দিকে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করছে কারখানাটি।

শুধু এ কারখানাই নয়, নারায়ণগঞ্জ, আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন একই সংকটে পড়েছে। গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় অনেক কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক উদ্যোক্তা দিনের শিফট সীমিত বা পুরোপুরি বন্ধ রেখে রাতের বেলায় উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করছেন, কারণ ওই সময়ে কিছু এলাকায় তুলনামূলক বেশি গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে রাতের শিফটেও অনেক ক্ষেত্রে গ্যাসের চাপ মিলছে না। ফলে উৎপাদন কমে যাচ্ছে, রফতানি আদেশের শিপমেন্ট বিলম্ব হচ্ছে এবং প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে বড় অংকের আর্থিক ক্ষতি।

কোথাও কোথাও ডিজেল ও এলপিজির মতো ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা চলছে। আবার অনেক কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। শিল্পোদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বিভিন্ন শিল্প খাতের উৎপাদন ও রফতানি আরো বড় সংকটে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে। চলমান এ সংকট কবে নাগাদ কাটবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষও।

আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় একটি বড় শিল্প গ্রুপের তিনটি পোশাক কারখানায় রাতের শিফটে উৎপাদন চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত সপ্তাহ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এ ব্যবস্থা চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিল্প গ্রুপটির কর্ণধার বণিক বার্তাকে জানান, দিনে উৎপাদন চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় রাতের দিকে কাজ করার চেষ্টা করছেন তারা। আশুলিয়া এলাকায় আরো অনেক কারখানা একইভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘দিনে তো চলছে না, সুতরাং অনেকেই রাতে চেষ্টা করছেন। কেউ ১২টা পর্যন্ত চালাচ্ছে, কেউ আবার ফুল নাইট চালাচ্ছে। যে যার মতো করে করছে।’ তার ভাষ্য, কোনো এলাকায় রাতে গ্যাসের চাপ তুলনামূলক ভালো থাকছে, আবার কোথাও অন্য কারণে দিনের চেয়ে রাতে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাই কারখানাভেদে উদ্যোক্তারা নিজেদের মতো করে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

সরজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, সাভারের বিভিন্ন শিল্প-কারখানায়ও গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় অনেক কারখানার বয়লার সচল রাখা যাচ্ছে না। এতে কাপড় ধোয়া, শুকানো, প্রেসিং ও ফিনিশিংয়ের মতো উৎপাদনের শেষ ধাপগুলো সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। সাভারের নামা গেন্ডা এলাকায় অবস্থিত এনডিএল ইকো ফ্যাশনের উৎপাদন কার্যক্রম কার্যত বন্ধের পথে। আগে যেখানে ২৪ ঘণ্টা কাজ চলত, সেখানে এখন দিনে ৮ ঘণ্টা চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

কারখানাটির জেনারেল ম্যানেজার আলম মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাস সংকট দেখা দেয়ার পর সিএনজি স্টেশন থেকেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কনটেইনার পাঠালেও গ্যাস না দিয়ে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে অবস্থা এমন হয়েছে, গ্যাসের সব কাজ বন্ধ। আমাদের এখানে ওয়াশের কাজ হয়। এটার জন্য গ্যাসের বিকল্প নেই। এখন ৮ ঘণ্টাও কারখানা চালাতে পারছি না। এতে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ টাকা লস গুনতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘দুই দিন ধরে কারখানায় যাই না। কাজ বন্ধ, শ্রমিকরাও আসে না খুব একটা। এভাবে আর কিছুদিন চললে আমাদের পথে বসতে হবে।’

আশুলিয়ার প্রজন সোয়েটার কারখানার পরিচালক আহমেদ মোর্তুজা বলেন, ‘বিদ্যুৎ থাকায় কিছুটা স্বস্তি থাকলেও উৎপাদনের শেষ পর্যায়ে এসে কাজ আটকে যাচ্ছে। বয়লার চালাতে না পারলে ফিনিশিং ও আয়রন করা সম্ভব নয়। ফলে পণ্য প্যাকিং করে বন্দরে পাঠানো যাচ্ছে না। বর্তমানে গ্যাসের যে পরিস্থিতি, তা উন্নতি না হলে রফতানিতে বড় ধস নামবে। বছরের শেষ দিকে বায়ার আসা শুরু হয়, তারাও মুখ ফিরিয়ে নেবে বাংলাদেশ থেকে।’

গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্প এলাকায়ও গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে বণিক বার্তার সরজমিন পরিদর্শনে উঠে এসেছে। গাজীপুর সদর উপজেলার ভবানীপুরে অবস্থিত সালেক টেক্সটাইল লিমিটেডের জিএম আরিফ জানান, স্বাভাবিকভাবে কারখানা চালানোর জন্য ৫ পিএসআই গ্যাস থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে তা ২ বা ১ পিএসআইয়ে নেমে যাচ্ছে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, কারখানাটিতে ১৪০টি উইভিং মেশিন রয়েছে এবং ৫৬০ জন শ্রমিক কাজ করছে। গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। এতে বায়ারের শিপমেন্ট ডিলে হচ্ছে।

গাজীপুর মহানগরীর সিপিএম ওয়াশিং কারখানার কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন জানান, বর্তমানে তারা ১ পিএসআই চাপের গ্যাস পাচ্ছেন। এতে উৎপাদন ৫০ শতাংশ কমে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কারখানা বন্ধ করে দিতে হতে পারে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অবস্থিত মাহমুদ ডেনিমস কারখানার কয়েকটি ইউনিট গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে উপজেলার উলুসারা এলাকায় অবস্থিত মাহমুদ ফ্যাব্রিক্স অ্যান্ড ফিনিশিং কারখানাটি চলছে। বুধবার কারখানাটি বন্ধ ছিল, গতকাল আংশিক চালু করা হয়েছে। কারখানাটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবু তালেব জানান, বর্তমানে সর্বোচ্চ ১ পিএসআই বা মাঝে মাঝে ০.৫ পিএসআই চাপ পাওয়া যায়। এতে সপ্তাহে তিন-চারদিন কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

গাজীপুরের বানিয়াচং এলাকায় অবস্থিত মোশাররফ কম্পোজিট কারখানার হেড অব কমপ্লায়েন্স মো. হাফিজ উদ্দিন জানান, তাদের টেক্সটাইলসহ মোট আটটি কারখানা রয়েছে, যেখানে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতি মাসে ২০ মেগাওয়াট গ্যাসের অনুমোদন রয়েছে, কিন্তু আমরা এখন পাচ্ছি মাত্র ১৪ মেগাওয়াট। মোট উৎপাদনের ৪০ ভাগ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।’

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গ্যাস সংকট মোকাবেলায় কারখানাগুলো নিজেদের মতো করে বিকল্প ব্যবস্থা নিচ্ছে। সংগঠনটির নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সহস্রাধিক কারখানার মধ্যে কিছু শুধু রাতে চালানো হচ্ছে, আবার কিছু পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে কতটি কারখানা রাতে বা বিকল্প ব্যবস্থায় চলছে, সে বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।’ তিনি বলেন, ‘কোনো এলাকায় রাতে গ্যাসের চাপ তুলনামূলক ভালো থাকলে উদ্যোক্তারা ওই সময় উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করছেন। আবার অনেক কারখানাকে ডিজেল ও এলপিজি ব্যবহার করে উৎপাদন সচল রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি কারখানায় শুধু এলপিজি ও ডিজেলের পেছনেই প্রতিদিন অতিরিক্ত ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে।

বণিক বার্তার চট্টগ্রাম প্রতিনিধিদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার জুলধা ইউনিয়নে অবস্থিত এইচএম স্টিল অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডেও গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কারখানাটির পরিচালক মোহাম্মদ সারোয়ার আলম জানান, গ্যাসের চাপ কম থাকায় আগে থেকেই রাতের শিফটে রোলিং মিল চালিয়ে আসছিলেন তারা। তবে পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে রাতের শিফটেও উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আগে যতটুকু উৎপাদন হতো, এখন তার চেয়ে ৩০ শতাংশ কম হচ্ছে। ইস্পাত শিল্পে পূর্ণ গ্যাসের চাপ না থাকলে বিলেট সঠিকভাবে তৈরি করা সম্ভব হয় না। উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হলেও গ্যাসের বিল ঠিকই আসছে।’

টিকে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক তারিক আহমেদ বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রাম ও ঢাকার একাধিক কারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চট্টগ্রামের কালুরঘাটে তাদের ব্যাগ কারখানায় উৎপাদন ১৫ শতাংশ কমে গেছে। ঢাকার সুপার অয়েল রিফাইনারিতে উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে। সামুদা কেমিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিটেডে কস্টিক সোডা উৎপাদন ৪০ শতাংশ কমেছে।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে কেউ কেউ রাতে অতিরিক্ত শিফট চালানোর চেষ্টা করছেন। এটি বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলার একটি চেষ্টা। তবে দীর্ঘদিন এভাবে চালানো কঠিন, কারণ শ্রমিকরা সাধারণত রাতের শিফটে কাজ করতে আগ্রহী নন।’

দেশে সরবরাহ করা মোট গ্যাসের প্রায় ৩৬ শতাংশ ব্যবহার হয় শিল্প খাতে। এর মধ্যে সরাসরি শিল্পে ব্যবহৃত হয় ১৯ শতাংশ এবং শিল্প-কারখানার ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় ১৭ শতাংশ। এ গ্যাসের ওপর নির্ভর করেই দেশের বড় অংশের শিল্প উৎপাদন পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু কয়েকদিন আগে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়ায় সারা দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এলএনজি সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক না হওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে শিল্প খাতে গ্যাস সংকট প্রকট হওয়ায় তীব্র উৎপাদন সমস্যায় পড়েছেন উদ্যোক্তারা।

দেশের শিল্প-কারখানার বড় একটি অংশ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির আওতাধীন। শিল্প খাতে তীব্র গ্যাস সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন কোম্পানিটির শীর্ষ কর্মকর্তারাও। তারা জানান, পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হতে পারে, তা জানতে বিভিন্ন মাধ্যমে তিতাসের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।

এ বিষয়ে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে মোট সরবরাহ করা গ্যাসের প্রায় ৬০ শতাংশ তিতাসের আওতাধীন এলাকায় ব্যবহৃত হয়। আমাদের প্রায় সাড়ে সাত হাজার শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে এসব গ্রাহক টিকে থাকতে পারছেন না, তাদের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে তিতাসের দৈনিক ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়। বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাসের এ ঘাটতির প্রভাব সরাসরি শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ খাতের ওপর পড়ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে উৎপাদন পর্যায় থেকে গ্যাস সরবরাহ না বাড়লে বিতরণ কোম্পানি হিসেবে তিতাসের একার পক্ষে তেমন কিছু করার সুযোগ নেই।’

আরও