এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও অধিবেশন ডাকতে পারেন না বলে তা করেননি।’
জাতীয় সংসদে গতকাল অনির্ধারিত আলোচনায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে এ বিতর্ক হয়। মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয় বেলা ১১টায়। শুরুতেই অনির্ধারিত আলোচনার জন্য দাঁড়ান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তখন স্পিকার বলেন, প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলে বিরোধীদলীয় নেতাকে সুযোগ দেয়া হবে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায়ের আলোকে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন এবং নির্বাচনের ৩০ দিনের মধ্যে এ পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের কথা রয়েছে। তবে এ নিয়ে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের দিন থেকেই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে টানাপড়েন চলছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোটের সদস্যরা। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারি দল ও স্বতন্ত্র সদস্যরা সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি।
গণ-অভ্যুত্থানের অভিপ্রায়ের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে ১৮০ কার্যদিবস মেয়াদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। এ পরিষদ অনুযায়ী, সনদে বর্ণিত উপায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার; নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য কমিশন এবং চলতি সংসদেই উচ্চকক্ষ গঠনের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করবে। যে ৩০ সংস্কার প্রস্তাবে সব দলের ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে পরিষদকে।
আদেশের ১০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ৩০ দিনের সংসদ অধিবেশন আহ্বানের অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করবেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হলেও অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি এখনো। এ নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিরোধী দল।
সংসদ অধিবেশনে গতকাল প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানকে মাইক দেন স্পিকার। শফিকুর রহমান বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত এ সংসদ স্বাভাবিকভাবে তার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আসেনি। এটি রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে এসেছে। এটি জারি করা হয়েছে ১৩ নভেম্বর ২০২৫।’
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হয়, অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের প্রথম অধিবেশনও আহ্বান করতে হবে। আজ (গতকাল) সেই ৩০তম দিন, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ অধিবেশন আহ্বান করেন। আমরা ধরে নিচ্ছি, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই হয়তো রাষ্ট্রপতি এ অধিবেশন আহ্বান করবেন, কিন্তু সময় পার হয়ে যাচ্ছে।’
জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, ‘দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছে। আইন অনুযায়ী, নবনির্বাচিত প্রতিনিধিরা একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। বিধি অনুযায়ী, শপথ গ্রহণের পর আমরা বিরোধীদলীয় ৭৭ জন সদস্য নির্ধারিত তফসিলে স্বাক্ষরও করেছি।’
তিনি বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদ ও গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী সংস্কারকাজ সম্পন্ন করতে হবে। এর পরই পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে। কিন্তু আগে তো শুরু হতে হবে, তারপর সমাপ্তির প্রশ্ন। আমরা পৃথক ব্যালটে সংস্কারের জন্য ভোট নিয়েছি। ফলে পরিষদ গঠন ও অধিবেশন আহ্বানের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে সংসদে কথা বলেন সরকারি দলের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। মূলত তিনিই ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ অধিবেশন আহ্বান করেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের না। পরিষদের বিষয়টি এখনো বিচারাধীন। সংবিধানে “সংস্কার পরিষদ” বলতে কিছু নেই। জুলাই সনদে যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের আগে সংবিধানে সংশোধনী আনতে হবে। এটি যদি আইনে পরিণত হয়, তখন দেখা যাবে। আর বিষয়টি এখনো উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘যদি গণভোটের রায় অনুসারে সেটা ধারণ করতে হয় কনস্টিটিউশনে সেটা সংবিধানের আগে সংশোধনী হতে হবে। সেটা সংসদে আলাপ-আলোচনা হবে। সংবিধান সংশোধন হলে সেটা সংবিধানে ধারণ হবে। তারপর যদি পরিষদ হয়, তারপর যদি ফর্ম হয়, যদি শপথ গ্রহণ করতে হয়, সেটা পরের ব্যাপার।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গণভোটের ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ অপশন থাকলেও মাঝপথে একটি আদেশের মাধ্যমে চারটি জটিল প্রশ্ন যুক্ত করা হয়েছিল। ব্যালটের প্রশ্নগুলো পড়ার জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন ছিল এবং চারটি প্রশ্নের জন্য আলাদা ‘হ্যাঁ/না’ অপশন ছিল না। এ সংবিধান সংস্কারের বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোটের সার্টেন পোরশন কেন আনকনস্টিটিউশনাল ডিক্লেয়ার করা হবে না, সেই মর্মে রুলও জারি করা হয়েছে। এখানে হয়তো জুডিশিয়ারি মতামত দেবে, বাট জুডিশিয়ারির মতামত এ সভরেন পার্লামেন্টের ওপরে কখনো বাইন্ডিং না। কিন্তু সংসদ এমন কোনো আইন করতে পারে না, যা বিচার বিভাগে চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল বা অসাংবিধানিক হয়ে যায়। সুতরাং উভয়দিকে লক্ষ্য রেখে বৃহত্তর স্বার্থে আইনানুগভাবে এবং সাংবিধানিকভাবে যেতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘গণভোটের জন্য আরেকটা আইন হয়েছে। বিএনপিও এটা প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু মাঝখানে আদেশটা জারি করে গণভোট দেয়া হলো চারটা প্রশ্ন। যে প্রশ্নের মধ্যে একটা বিশাল প্রশ্ন জুলাই জাতীয় সনদের সমঝোতা হয়নি। এটা একটা জবরদস্তিমূলক আরোপিত আদেশ করে সে আদেশের একটা প্রশ্ন গণভোটের মধ্যে দেয়া হয়। চারটা প্রশ্ন হলেও মানুষ কোন কোন প্রশ্নে হ্যাঁ, কোন কোন প্রশ্নে না বলবে সে বিকল্প ছিল না। তারপরও গণভোটের রায় যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, সংবিধানে আগে সংস্কার আসতে হবে।’
চলতি অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল আনা যাবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘১৩৩টা অধ্যাদেশ এখানে উত্থাপিত হয়েছে প্রথম দিনে। কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে যদি সিদ্ধান্ত হয়, সংসদ যদি সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে বাজেট অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন হতে পারে।’
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্ষদ স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, ‘আমি কোনো কিছু অস্বীকার করছি না। জনরায়কে সম্মান দিতে হবে, কিন্তু সেটা সাংবিধানিকভাবে দিতে হবে, আইনগতভাবে দিতে হবে। এখানে ইমোশনের কোনো জায়গা নেই। রাষ্ট্র ইমোশন দিয়ে চলে না। রাষ্ট্র চলে সংবিধান দিয়ে, আইন দিয়ে, কানুন দিয়ে।’ বিষয়টি নিয়ে তিনি জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনা করার প্রস্তাব দেন বিরোধীদলীয় নেতাকে।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরো বলেন, তারা জাতির কাছে অঙ্গীকার করেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে তার প্রতিটি শব্দকে তারা সম্মান করেন। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে আরোপিত কোনো আদেশ দিয়ে, কোনো অবৈধ আদেশ দিয়ে সংবিধান সংশোধন করা যায় কিনা, সেটা একটা বিশাল আইনি প্রশ্ন, সাংবিধানিক প্রশ্ন। তিনি সেটা নিয়েও বিতর্ক ও আলোচনার আহ্বান জানান।
পরে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের উদ্দেশে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আপনি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উপস্থাপন করেছেন। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন দ্য স্পট সলিউশন দেয়া যায় না। এটার জন্য আপনি নোটিস দেবেন। নোটিস পাওয়ার পর আমি সিদ্ধান্ত দেব।’
কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি আলোচনার যে প্রস্তাব দিয়েছেন, এ প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এটাকে কার্য উপদেষ্টা কমিটির বিষয় মনে করি না। এটি সরাসরি সংসদের বিষয়। আমরা চাই সংসদেই এর চূড়ান্ত সমাধান হোক।’
তিনি বলেন, ‘সংবিধানে ২০২৬ সালে কোনো ভোটের কথা ছিল না, কিন্তু রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে তা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশের একটি অংশ সংবিধানের বাইরে গেলেও মানবেন, আর অন্য অংশ মানবেন না, এটা হয় না। মানলে পুরোটাই মানতে হবে, না হলে কোনোটিই নয়।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘জনগণের ইচ্ছাই হলো সর্বোচ্চ সংবিধান। গণভোটে ওনারাও (সরকারি দল) সম্মত ছিলেন, আমরাও ছিলাম। আমাদের দাবি ছিল গণভোট আগে হওয়ার, ওনাদের দাবি ছিল নির্বাচনের দিনই হোক। শেষ পর্যন্ত ওনাদের দাবিই বাস্তবায়িত হয়েছে এবং গণভোটে সংস্কারের পক্ষের প্রস্তাব জয়ী হয়েছে। সুতরাং এখন পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।’