দেয়ালে বড় বড় ফাটল। ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। যেকোনো মুহূর্তে আবারো বড় ধরনের দুর্ঘটনার আতঙ্ক চারপাশে। এমনই ঝুঁকি আর স্থান সংকট নিয়ে চলছে বাগেরহাট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচার কার্যক্রম।
গত মাসেই আদালত চলাকালে ঘটে এক দুর্ঘটনা। করিডোরের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে অন্তত পাঁচ বিচারপ্রার্থী আহত হন। পরে তাদের বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। এ ঘটনার পর আদালত ভবনের নাজুক অবস্থা আবারো সামনে আসে। এর পরও ছোট-বড় একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
বর্তমানে এ জরাজীর্ণ ভবনে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও বিচারক। দেয়ালে ফাটল, ছাদ খসে পড়া ও পর্যাপ্ত স্থানের অভাবে আদালতমুখী সবারই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কার পরও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে ভবনটিতেই চলছে দৈনন্দিন কাজ।
আদালত সূত্রে জানা যায়, নানা জটিলতায় নতুন জুডিশিয়াল ভবন নির্মিত হয়নি। ফলে বর্তমানে জজ ও জুডিশিয়াল আদালতের কাজ একই ভবনে চলছে। মাত্র এক ভবনে পরিচালনা করতে হচ্ছে মোট ৩২টি আদালত।
জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসেকিউটর (পিপি) এসএম মাহবুব মোর্শেদ লালন বণিক বার্তাকে জানান, জেলার নয়টি উপজেলা ও তিনটি পৌরসভার বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে আসে। বর্তমানে এ আদালতে ৫৪ হাজার মামলা বিচারাধীন। আরো কয়েকটি আদালত চালুর অপেক্ষায় আছে।
আইনজীবীদের অভিযোগ, ভবনের করুণ দশার কারণে পেশাগত দায়িত্ব পালন ব্যাহত হচ্ছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের ও বিচারকদের এজলাসে অবস্থান করতে হয়। যেকোনো সময় ছাদের পলেস্তারা বা অংশ বিশেষ খসে পড়ে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। একাধিকবার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। দুর্ঘটনা এড়াতে বাগেরহাটে দ্রুত একটি আধুনিক ও সুবিধাজনক চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট-জেলা জজ আদালত ভবন নির্মাণ করা জরুরি।
সিনিয়র আইনজীবী এবং নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের পিপি হাওলাদার আব্দুল মান্নান নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমার রুমের পলেস্তারা প্রতিনিয়ত খুলে পড়ছে। বিচারপ্রার্থীরা আসার সময় আতঙ্কে মাথার ওপরের ছাদের দিকে তাকিয়ে হাঁটেন—এই বুঝি পলেস্তারা খসে পড়ল। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর এ ভবনে বড় ফাটল দেখা দিয়েছিল। তখন মেহগনি কাঠ দিয়ে ঠেস দেয়া হয়। পরে পিলারগুলো চওড়া করা হয়েছিল। আমরা দ্রুত নতুন ভবন চাই।’
আরেক আইনজীবী আব্দুল ওয়াদুদ মুক্তা বলেন, ‘প্রতিদিন চার-পাঁচ হাজার লোক এখানে যাতায়াত করে। এতে ভবনের ওপর অতিরিক্ত লোড পড়ে। সম্প্রতি পলেস্তারা খসে পাঁচজন আহত হওয়ার পর সবাই এখন ভীতসন্ত্রস্ত। আমরা চাই এ ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ করা হোক।’
বাগেরহাট আইনজীবী সমিতির সদস্য সচিব শেখ মোশাররফ হোসেন মন্টু বলেন, ‘দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেতে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে। আইনজীবী সমিতির ৫৭০ জন সদস্য রয়েছেন। এছাড়া পাঁচ হাজার বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও বিচারক সবাই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।’
এদিকে ভবনের চাপ কমাতে ও সাময়িক সমাধান দিতে উদ্যোগের কথা জানিয়েছে গণপূর্ত বিভাগ। গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মধুসূদন দেবনাথ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পলেস্তারা খসে পড়া স্থানগুলো সংস্কার করা হচ্ছে। তাই আতঙ্কের কোনো কারণ নেই। ভবনের সামনে পাঁচটি এজলাস ও সাতটি চেম্বার নির্মাণের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই দ্রুত কাজ শুরু হবে।’
তবে সাময়িক সংস্কার নয়, বড় দুর্ঘটনা এড়াতে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের এক দাবি—দ্রুত স্থায়ী ও নিরাপদ নতুন ভবন নির্মাণ।
এ বিষয়ে বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মোহাম্মদ বাতেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অবকাঠামো সংকটের কারণে ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে সম্প্রতি জজ আদালতের বারান্দায় পলেস্তারা খসে মাথায় পড়ে কয়েকজন বিচারপ্রার্থী আহত হন। তাদের আমি আর্থিক সহায়তা দিয়েছি। গণপূর্ত বিভাগকে বলা হয়েছে প্রতিটা ইঞ্চি যাতে ঝুঁকিপূর্ণ না থাকে সেভাবে সংস্কার করতে হবে।’
পুরনো ভবনটির পরিবর্তে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।