২০২৪ সালে প্রবাসে ৪,৮১৩ অভিবাসীর মৃত্যু

২০২২ সালে রামরু পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৮ শতাংশ পরিবার মনে করে তাদের প্রিয়জনদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ডেথ সার্টিফিকেটে যা উল্লেখ করা হয়েছে তা সঠিক নয়। এর পেছনে শরীরে ক্ষতচিহ্ন, মৃত্যুর আগে পরিবারের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ বা শারীরিক নির্যাতনের তথ্যের মতো প্রমাণ রয়েছে।

২০২৪ সালে প্রবাসে কর্মরত ৪ হাজার ৮১৩ জন বাংলাদেশী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। অনেক ক্ষেত্রেই মৃত্যুর সঠিক কারণ নিরূপণ না করে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ বলে উল্লেখ করা হয়, যা প্রবাসী পরিবারের মধ্যে গভীর সন্দেহ ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। ২০২২ সালের রামরুর এক গবেষণায় দেখা গেছে, মৃতদের গড় বয়স ৩৮ বছর এবং অনেকের মরদেহে আঘাতের চিহ্ন থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করা হয়।

বৃহস্পতিবার (২৯ মে) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত ‘লাশ হয়ে ফিরে আসা অভিবাসী কর্মীর সম্মান ও মর্যাদা’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরেন রামরুর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী ও মৃত অভিবাসীদের পরিবারের সদস্যরা। এ সংলাপটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়।

বলরামের মা লেবানন থেকে এবং নূর মোহাম্মদের বোন জর্ডান থেকে মরদেহ হয়ে ফিরেছেন। আজও এই দুই পরিবার জানে না তাদের সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় থাকা প্রিয়জনদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ। গন্তব্য দেশের মেডিকেল সার্টিফিকেটে ‘আত্মহত্যা’ উল্লেখ থাকলেও, পরিবারের সদস্যরা এর সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

২০২২ সালে রামরু পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৮ শতাংশ পরিবার মনে করে তাদের প্রিয়জনদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ডেথ সার্টিফিকেটে যা উল্লেখ করা হয়েছে তা সঠিক নয়। এর পেছনে শরীরে ক্ষতচিহ্ন, মৃত্যুর আগে পরিবারের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ বা শারীরিক নির্যাতনের তথ্যের মতো প্রমাণ রয়েছে।

উক্ত গবেষণা অনুযায়ী, কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে গিয়ে মৃত্যুবরণকারী অভিবাসীদের মধ্যে ৩১ শতাংশ দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা কিংবা হত্যার শিকার হয়েছেন। ২০২৪ সালে ৪ হাজার ৮১৩ জন অভিবাসী কর্মীর মৃতদেহ দেশে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে, যাদের মধ্যে ৯৪ দশমিক ৪ শতাংশ পুরুষ ও ৩ দশমিক ৬ শতাংশ নারী।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সচিব সেবাষ্টিন রেমা বলেন, ‘অভিবাসীদের মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এ ইস্যুটি আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরে মৃত্যুর হার কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব। আন্তর্জাতিক মৃত্যুসংক্রান্ত প্রোটোকলগুলোকে দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক সমঝোতা স্মারকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, ‘মরদেহ ব্যবস্থাপনায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্মানজনক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা সম্ভব। এ ধরনের ছোট ছোট পদক্ষেপ একদিন বড় পরিবর্তনের সূচনা ঘটাবে।’

মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব সেলিম রেজা বলেন, ‘মরদেহ প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়ায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও আরো স্ট্রিমলাইন করার সুযোগ রয়েছে। অনেক দুর্ঘটনার পেছনে কর্মীদের সচেতনতার অভাবও দায়ী।’

বিএমইটির পরিচালক মাসুদ রানা বলেন, ‘রিইন্ট্রিগ্রেশন প্রকল্পে মৃত অভিবাসীদের পরিবারদের অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক এটিএম আব্দুর রউফ মন্ডল জানান, ‘ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তহবিলের মাধ্যমে মরদেহ প্রত্যাবর্তন সম্ভব না হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব বাজেট থেকে তা দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘রামরুর গবেষণা, এনএইচআরচি এবং মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী, মৃতদেহ রাখার জন্য নির্ধারিত স্থান এবং পরিবারের সদস্যদের বসার জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

এ সময় একটি পরিবারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলা হয়, মৃতদেহ দাফনের প্রস্তুতির সময় পেটে বড় কাটা দাগ দেখে ময়নাতদন্ত করালে জানা যায়, মৃত ব্যক্তির কিডনি অপসারণ করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান বলেন, ‘মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ থাকলে দেশে পুনরায় ময়নাতদন্ত করা যেতে পারে।’

সংলাপে প্রবাসী কর্মীদের মর্যাদাপূর্ণ মরদেহ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে যে প্রস্তাবগুলো গৃহীত হয় তা হলো-সন্দেহজনক মৃত্যুর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা, ঢাকাসহ প্রধান বিমানবন্দরে মরদেহ সংরক্ষণের জন্য পৃথক সুবিধা ও পরিবারদের জন্য অপেক্ষাকক্ষ, আগমনের পরপরই সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতের জন্য চিকিৎসক নিয়োগ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর আন্তঃসমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে যৌথ কার্যক্রম গ্রহণ।

আরও