শস্য উৎপাদনের অন্যতম উপাদান বীজ। কৃষিনির্ভর রংপুর অঞ্চলে ব্যাপক হারে চাষ হয় গ্রীষ্মকালীন সবজি। এজন্য প্রতি বছরই বীজ সরবরাহ করে আসছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বায়ত্তশসিত প্রতিষ্ঠানটির তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলার জন্য গ্রীষ্মকালীন সবজিবীজের চাহিদা দেয়া হয়েছিল ৩ হাজার ৫০০ কেজি। তবে প্রধান অফিস থেকে তা সরবরাহ করা হয়নি।
চাষীরা বলছেন, রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় আলু, ভুট্টা ও ধান প্রধান ফসল হলেও প্রতি বছর বাড়ছে সবজি আবাদ। মূলত শীতকালে (রবি মৌসুম) ব্যাপক সবজি আবাদ হলেও বর্তমানে গ্রীষ্মকালীন সবজির আবাদও বাড়ছে। প্রতিযোগিতামূলক বীজের বাজার সম্প্রসারণ, এমনকি কৃষকের হাত পর্যন্ত পৌঁছতে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানে রংপুর অঞ্চলে গ্রীষ্মকালীন সবজিবীজ বাজারজাতই করেনি বিএডিসি।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও রংপুরে গত বছরের ১৬ মার্চ থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত গ্রীষ্মকালীন সবজি আবাদ হয়েছিল ২৯ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে। চলতি বছর খরিপ-১ মৌসুমে গ্রীষ্মকালীন সবজির আবাদের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ২১৮ হেক্টর। এখন পর্যন্ত অর্জন হয়েছে ২০ হাজার হেক্টরের মতো।
এ প্রসঙ্গে বিএডিসি (বীজ বিপণন) রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মো. মাসুদ সুলতান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবার রংপুর অঞ্চলে গ্রীষ্মকালীন সবজিবীজ ঢাকা অফিস থেকেই অন্যত্রে দেয়া হয়েছে। তবে কৃষকের প্রণোদনার বীজ সময়মতো এসেছে এবং তা বিতরণ করা হয়েছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে নতুন বীজ আসবে।’
রংপুর জেলার সব জায়গায় কমবেশি সবজি আবাদ হলেও পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর ও সদর উপজেলায় ব্যাপকভাবে আবাদ হয়। সদর উপজেলার জানকি ধাপেরহাট এলাকার কৃষক মো. আরিফুল ইসলাম ৩০ শতক জমিতে ঝিঙা ও ১২ শতকে বরবটি আবাদ করেছেন। মূলত তিনি সবজি আবাদ করেন। এবার বিএডিসির গ্রীষ্মকালীন সবজিবীজ না পাওয়ায় অন্য কোম্পানির বীজ বপন করেছেন। তিনি দাবি করেন, যতবার বিএডিসির বীজ বপন করেছেন ফলন ভালো পেয়েছেন।
নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ি ইউনিয়নের বালাপাড়া এলাকায় ব্যাপক হারে সবজি আবাদ হয়। অন্য ফসল আবাদ করলেও মূলত ৩০ বছর ধরে সবজি আবাদ করছেন ওই এলাকার কৃষক ওসমান গনি। তিনি আগে সবজি আবাদের জন্য কমবেশি বিএডিসির বীজ ব্যবহার করতেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় বীজ হাতের কাছে না পাওয়ায় এখন অন্য কোম্পানির বীজ বেশি ব্যবহার করছেন। তার সবজির জমির পরিমাণ প্রায় ২০ দোন (৩০ শতকে এক দোন)। বর্তমান তিনি জমিতে মরিচ, পটোল ও বাঁধাকপি আবাদ করেছেন।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে ওসমান গনি বলেন, ‘কৃষক সহজে কোনো ফসল নিয়ে ঝুঁকি নিতে চান না। বেসরকারি বীজ কোম্পানির লোকজন কৃষককে সবসময় প্ররোচিত করেন। সেখানে বিএডিসির বীজের প্রচারণা তো নেই-ই, বাজারেও বীজ পাওয়া যাচ্ছে না। এটা দুঃখজনক।’
গত দুই বছরে বিএডিসির বীজ বিক্রির পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত বছর রংপুর অঞ্চলে বিএডিসির গ্রীষ্মকালীন বীজ বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ১৫৯ কেজি। আগের বছর বিক্রি হয় ৩ হাজার ৮২৪ কেজি।
বিএডিসি বীজ ও সার ডিলার অ্যাসোসিয়েশন রংপুর জেলার সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘রংপুর সিটি বাজার এলাকায় অবস্থিত আমার দোকানে সবজিবীজ ভালোই বিক্রি হয়। কিন্তু এখনো বিএডিসির গ্রীষ্মকালীন সবজিবীজের বরাদ্দ পাইনি। গত বছর বরবটি, পুঁইশাক ও মটরশুঁটির বীজ চেয়েছিলাম। কিন্তু বিএডিসি কর্তৃপক্ষ তা দিতে পারেনি। গত দুই বছর দেশী পাটবীজ চাহিদা মতো সরবরাহ করেছিল বিএডিসি। কিন্তু এবার পাটবীজ চেয়েও পাওয়া যায়নি। এজন্য গ্রীষ্মকালীন বীজের জন্য এখনো প্রতিষ্ঠানটিতে যোগাযোগ করিনি।’
মূলত ডিমা কলমি, লালশাক, পুঁইশাক, ঢেঁড়স, বরবটি, চিচিঙ্গা, করলা, চালকুমড়া, ধুন্দল, শসা ও ডাঁটাবীজ সরবরাহ করে বিএডিসি। জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, বিএডিসির বীজ কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় করতে হলে সরকারের উচিত সারের মতো বীজেও ভর্তুকি দেয়া। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, সরকার যে প্রণোদনার শস্য বিএডিসি অফিসের মাধ্যমে কৃষকদের দেয়, তা না করে ডিলারদের মাধ্যমে দেয়ার ব্যবস্থা করা হলে কৃষকদের সঙ্গে ডিলারদের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হতো।
রংপুর অঞ্চলে প্রধান ফসলের পাশাপাশি সবজি আবাদ বাড়ছে উল্লেখ করে হর্টিকালচার সেন্টার বুড়িহাট রংপুরের উপপরিচালক মো. আবু সায়েম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হচ্ছে সুলভ মূল্যে মানসম্মত বীজ কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেয়া। পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানির মনোপলি ব্যবসার লাগাম টেনে ধরা। এজন্য আগে থেকে উল্লিখিত এলাকাগুলোর চাহিদা নিরূপণ করে সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’ তবে বিএডিসি কর্তৃপক্ষ কী কারণে এবার গ্রীষ্মকালীন বীজ সরবরাহ করেনি এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।