জুলাই অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে দেশের ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ তরুণই একেবারে সচেতন নন। মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ তরুণ খুবই ভালোভাবে সচেতন রয়েছেন। আর ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ সামান্য এবং ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ কিছুটা খোঁজখবর রাখেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও একশনএইড বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে গতকাল এক আলোচনা সভায় জরিপের এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। একশনএইড বাংলাদেশ ও সানেম আলোচনা সভাটির আয়োজন করে। সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের সঞ্চালনায় এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সানেমের গবেষণা সহযোগী শাফা তাসনিম।
দেশের আটটি বিভাগের ১৫-৩৫ বছর বয়সী দুই হাজার তরুণ-তরুণীকে নিয়ে জরিপটি করা হয়েছে। জরিপে অংশ নেয়াদের ৫০ শতাংশ শহরে এবং ৫০ শতাংশ গ্রামে বাস করেন। চলতি বছরের ২০-৩১ মে পর্যন্ত এ জরিপ পরিচালনা করা হয়। দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটি থেকে দুটি জেলা এবং প্রতি জেলার দুটি করে উপজেলা থেকে তরুণদের বাছাই করা হয়।
জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়, সংস্কার কমিশনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের বিষয়ে তরুণরা সচেতন। এর হার ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এরপর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিশন (৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ) ও পুলিশ সংস্কার কমিশনের বিষয়ে সচেতন তারা।
জরিপে দেশের বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের বিষয়টিও উঠে আসে। ৩০ দশমিক ৭৮ শতাংশ তরুণ মনে করেন, দেশের বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের একেবারেই চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুত করতে পারে না। ২৩ দশমিক ১২ শতাংশ মত দিয়েছেন, এ শিক্ষা চাকরির বাজারের জন্য সামান্য প্রস্তুত করতে পেরেছে। একাধিক সিভি দেয়ার পরও ৪৫ দশমিক ১২ শতাংশ তরুণ গত এক বছরে কোনো চাকরির ইন্টারভিউয়ের আমন্ত্রণ পাননি। ২৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ একটি এবং ১৭ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ দুটি চাকরির ইন্টারভিউয়ের জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছেন। ২৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ দুই বছরের বেশি সময় ধরে চাকরির সন্ধান করছেন। আর এক-দুই বছর ধরে চাকরির চেষ্টা করছেন ২৫ শতাংশ।
গবেষণা প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, তরুণদের ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশই বিদেশে চাকরি করতে আগ্রহী। তাদের ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশই মনে করেন, কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে চাকরিই দীর্ঘস্থায়ী সমাধান। বিদেশে কাজের বিষয়ে ৭১ দশমিক ৫ শতাংশই মনে করেন, বিদেশে উত্তম বেতন ও সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। ৬৮ দশমিক ৪ শতাংশ মনে করেন, সেখানকার জীবনমান উচ্চমানের।
বাংলাদেশে চাকরি পাওয়ার বাধা হিসেবে ৫৪ দশমিক ৭২ শতাংশ তরুণ মনে করে করেন, এখানে স্বজনপ্রীতি রয়েছে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে বলে মত দিয়েছেন ৫২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এছাড়া ৫০ দশমিক শূন্য ২ শতাংশই মনে করেন, দেশে পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ নেই।
জরিপে বর্তমান রাজনীতি ও আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়টিও উঠে এসেছে। এ নির্বাচনে বিএনপি ৩৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট পাবে বলে মনে করেন তরুণরা। এর পরের অবস্থানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তাদের মত, ২১ দশমিক ৪৫ শতাংশ ভোট পাবে দলটি। আর জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়াদের নিয়ে গঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ ভোট পাবে। জামায়াত ব্যতীত অন্যান্য ধর্মীয় দল ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ ও জাতীয় পার্টি পাবে ৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ ভোট। আর আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ দিলে তারা ১৫ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ ভোট পাবে বলে মত দিয়েছেন জরিপে অংশগ্রহণকারীরা।
এ সময় জানানো হয়, ৮২ দশমিক ৭ শতাংশ তরুণ রাজনীতিতে অংশ নিতে একেবারেই আগ্রহী নন। কারণ হিসেবে বলা হয়, রাজনৈতিক সহিংসতাকে ভয় পান ৫৮ দশমিক ৭ শতাংশ। আর দুর্নীতি ও রাজনৈতিক নীতির ঘাটতিকে দায়ী করেছেন ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে একেবারেই খোঁজখবর রাখেন না ২০ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। আর ৩৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ তরুণ মাঝে মধ্যে খোঁজখবর নেন।
গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন হয়েছে। তাদের হাত ধরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশা করছেন অনেকে। জরিপে অংশ নেয়াদের মধ্যে ৪২ দশমিক ১৪ শতাংশ আশা প্রকাশ করেন ট্র্যাডিশনাল (প্রচলিত) দলগুলোর চেয়ে তরুণদের রাজনীতির মাধ্যমে দেশে ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে।
তথ্যের অবাধ প্রবাহের এ সময়ে তরুণরা গণমাধ্যমের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বেশি তথ্যপ্রাপ্তির জায়গা বলে মনে করেন। তাদের কাছে ৮৭ দশমিক ৪ শতাংশ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির তথ্যের উৎস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। তারা টেলিভিশন থেকে ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ, সমবয়সীদের সঙ্গে আলোচনা থেকে ৩৬ দশমিক ৮ ও সংবাদপত্র থেকে ১৩ শতাংশ তথ্য পান বলে জানিয়েছেন।
জরিপের এই ফলাফল বিষয়ে সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘কেবল ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার জন্য এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। এখানে যে মতামত এসেছে, তা শুধু বাছাই করা ওই তরুণদের। এটাকে দেশের পুরো জনগোষ্ঠীর বা অন্যান্য বয়সের মানুষের মতামত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত হবে না। বিশেষ করে রাজনীতির মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে তা কখনোই করা সংগত হবে না।’