ড্রেনেজ দুর্দশা

খালে আটকে থাকছে বর্জ্য, হাজার কোটি টাকার প্রকল্পেও কমছে না জলাবদ্ধতা

চট্টগ্রাম নগরীতে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার টন বর্জ্য উৎপাদন হচ্ছে।

এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই সংগ্রহের বাইরে থেকে নালা, ড্রেন ও খাল হয়ে কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ছে। এতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নদীর তলদেশে পলিথিন ও কঠিন বর্জ্য জমে পানিধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এছাড়া নগরীর প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার নালা, ড্রেন ও খাল সচল রাখতে প্রয়োজনীয় বর্জ্য অপসারণেও হিমশিম খাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। ফলে জলাবদ্ধতা নিরসনে তিন সংস্থার প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ হলেও টানা বৃষ্টিতে এখনো চট্টগ্রাম নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।

সরজমিনে নগরীর বেশ কয়েকটি এলাকায় দেখা যায়, টানা বৃষ্টির কারণে ড্রেন, নালা ও খাল ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। কয়েক দিনের বৃষ্টিতে নগরীতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা সড়কের পাশে পড়ে আছে। ভারি বৃষ্টির সময় এসব ময়লা সড়কের পাশের ড্রেন বা খালে গিয়ে জমছে। এতে ড্রেনের তলদেশে ময়লা জমাট বেঁধে আটকে থাকছে। ফলে ড্রেন ও খালের পানিধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সামান্য বৃষ্টি বা জোয়ার এলেই ড্রেনের পানি লোকালয়ে ও সড়কে উঠে আসছে।

আগ্রাবাদের সিডিএ এলাকার বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত কয়েক দিনের বৃষ্টির কারণে সিডিএসহ আগ্রাবাদের নিম্নাঞ্চল দুই-তিনদিন কয়েক ফুট পানির নিচে ছিল। বর্ষা মৌসুম ছাড়াও অন্য সময় খাল ও ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার না করায় নদীতে জোয়ার এলেই সড়ক পানিতে ডুবে যায়। কয়েক বছর আগে পরিস্থিতি আরো খারাপ ছিল। এখন কিছুটা কমেছে। তবে খালের ওপর পলিথিন ও ঘরের বিভিন্ন ময়লা জমাট বেঁধে থাকে। সিটি করপোরেশন মাঝেমধ্যে পরিষ্কার করে। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায় নগরবাসীরই বলে মনে করেন তিনি।’

২০১৬ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বাসাবাড়ি থেকে ডোর টু ডোর বর্জ্য সংগ্রহের জন্য প্রায় ২ হাজার ৬৫ জনকে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়। সব মিলিয়ে চসিকের মোট পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ২৫০। এদিকে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর দুটি, চসিকের একটি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি—মোট চারটি প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এসব প্রকল্পে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এদিকে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ২১টি খাল সংস্কারের জন্য নতুন দুটি প্রকল্পে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা। নতুন দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের।

চট্টগ্রাম নগরীতে গড়ে প্রতিদিন তিন হাজার টনের মতো বর্জ্য তৈরি হলেও দুই হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টন বর্জ্য অপসারণের সক্ষমতা রয়েছে চসিকের। বাকি ৮০০ থেকে এক হাজার টন বর্জ্য প্রতিনিয়ত নগরীর বিভিন্ন খাল ও ড্রেন হয়ে কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে গিয়ে মিশছে। সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে নগরীর অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য ও শিল্পবর্জ্যের কারণে পানির মান নষ্ট হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণাগারে কর্ণফুলী নদীর পানির মান পরীক্ষায় দেখা গেছে, নদীর বিভিন্ন স্থানে পয়োবর্জ্যজনিত অ্যামোনিয়াম ও ফসফেটের মাত্রা স্বাভাবিকের প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। বিশেষ করে টিএসপি ও সিইউএফএল-সংলগ্ন এলাকায় পানির মান সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এসব এলাকায় পানিতে দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের (টিডিএস) মাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এসব পয়োবর্জ্য নগরীর বিভিন্ন খাল, ড্রেন ও নালা দিয়েই নদীতে প্রবেশ করছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন আগে থেকেই বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে ডোর টু ডোর ময়লা সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। তবে নতুন চসিক মেয়র দায়িত্ব নেয়ার পর আবাসিক বর্জ্য সংগ্রহের জন্য আলাদা ফি দিতে রাজি না হওয়ায় আপাতত বর্জ্য সংগ্রহ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে বিকল্প উপায়ে ময়লা সংগ্রহ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন খাল পরিষ্কার করতে গিয়ে ঘরের বিভিন্ন ব্যবহার্য জিনিসপত্র পাওয়া গেছে। এর অর্থ নগরবাসীর একটি বড় অংশ ময়লা-আবর্জনা বাড়ির আশপাশের নালা-ড্রেন বা খালে ফেলছেন। ড্রেন ও খালে এত পরিমাণ ময়লা-আবর্জনা জমছে যে টানা বৃষ্টির সময় পানি ড্রেন দিয়ে নামতে পারছে না। ফলে বিভিন্ন আবাসিক এলাকার গলি ও বাসাবাড়ি তলিয়ে যাচ্ছে। এতে নগরবাসীও দুর্ভোগে পড়ছেন।’

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম নগরীতে যে পরিমাণ বর্জ্য ড্রেন ও খাল হয়ে নদীতে মিশছে, তাতে নদী ও প্রতিবেশ ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার টন বর্জ্য ড্রেন, খাল ও নালায় জমা হচ্ছে। কিছু বর্জ্য হয়তো সরিয়ে ফেলা হচ্ছে, কিন্তু বেশির ভাগ বর্জ্য নালা ও ড্রেনেই পড়ে থাকছে। ফলে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে এবং বৃষ্টি হলেই নগরী পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে চসিকের পাশাপাশি নগরবাসীকেও দায়িত্বশীল হতে হবে।’

আরও