রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল

প্রশিক্ষণহীন বেসরকারি কর্মীদের হাতে পিএ সিস্টেম ঝুঁকিতে যাত্রীসেবা

চলন্ত ট্রেনে যাত্রীদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও নিরাপত্তা নির্দেশনা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ‘যাত্রী ঘোষণা ব্যবস্থা’ বা পিএ সিস্টেম।

বিশেষ করে আন্তঃনগর ট্রেনে নির্ধারিত স্টেশনে পৌঁছানো, ট্রেনের সার্বিক অবস্থা কিংবা দুর্ঘটনা ও অন্যান্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে এ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ঘোষণা দেয়া হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষায়িত এ সেবার বড় অংশ বেসরকারি অনবোর্ড সার্ভিস পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকায় যাত্রীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। বিভিন্ন সময়ে পিএ সিস্টেম অকার্যকর থাকা ও পরিচালনায় অনিয়মের কারণে যাত্রী নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়ছে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে আপ ও ডাউন মিলিয়ে প্রতিদিন ২৭ জোড়া ট্রেন যাত্রী পরিবহন করে। এর মধ্যে ১৬ জোড়া ট্রেনে পিএ সেবা পরিচালনা করে বেসরকারি অনবোর্ড সার্ভিস প্রতিষ্ঠান। জনবল সংকটের কারণে এ দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেয়া হলেও পিএ সিস্টেমের তদারকির দায়িত্ব সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগকে (সিএসটিই) দেয়া হয়নি। অথচ সিস্টেমে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিলে দায় নিতে হয় সিএসটিই বিভাগকেই। এ দ্বৈত ব্যবস্থাপনার কারণে অভ্যন্তরীণ জটিলতার পাশাপাশি যাত্রীরাও কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে মনে করছে বিভাগটি।

এ পরিস্থিতিতে আন্তঃনগর ট্রেনের পিএ সিস্টেম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বাণিজ্য বিভাগের পরিবর্তে সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের কাছে হস্তান্তরের সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী (পূর্ব) দপ্তর। পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তার কাছে পাঠানো একাধিক দাপ্তরিক চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিভিন্ন বেসরকারি অনবোর্ড সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা পিএ সিস্টেম পরিচালনা করলেও তাদের অধিকাংশেরই প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ নেই। ফলে সিস্টেমে ত্রুটি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক সমাধান করা সম্ভব হয় না এবং অনেক ক্ষেত্রে জরুরি ঘোষণাও ব্যাহত হয়। এতে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় তথ্য সময়মতো যাত্রীদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয় না, যা যাত্রীসেবায় বড় ধরনের গাফিলতি বলে মনে করছে সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ।

রেলওয়েসহ বিশেষায়িত গণপরিবহনে পিএ সিস্টেমের মাধ্যমে যাত্রা-সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, ট্রেন বা ইঞ্জিন বিকলসহ জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নির্দেশনা দেয়া হয়। ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়া, দুর্যোগে পথে আটকে পড়া, পাথর নিক্ষেপ, ঝুঁকিপূর্ণ সেকশন ও স্টেশন অতিক্রম এবং অসুস্থ যাত্রীর জন্য চিকিৎসক বা চিকিৎসা সরঞ্জাম খুঁজতেও এ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় অনেক সময় বিশেষায়িত অপারেটরের বদলে সাধারণ স্টুয়ার্ড দিয়ে পিএ সেবা দেয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ঘোষণা না দেয়ার অভিযোগও রয়েছে।

রেলের নথিপত্র অনুযায়ী, বর্তমানে অনবোর্ড ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ১৬ জোড়া আন্তঃনগর ট্রেনের মধ্যে রয়েছে সুবর্ণ, মহানগর, মহানগর গোধূলী, তূর্ণা, সোনার বাংলা, মহানগর প্রভাতী, হাওর, মোহনগঞ্জ, কালনী, তিস্তা, পারাবত, এগারসিন্দুর প্রভাতী ও গোধূলী, উপকূল, কক্সবাজার, পর্যটক ও ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস।

সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অভিযোগ, অনবোর্ড সার্ভিস পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিতে পিএ সিস্টেম পরিচালনার বিষয়টি থাকলেও প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ, ত্রুটি নিরসন ও দায়দায়িত্ব স্পষ্ট নয়। ফলে সমস্যা দেখা দিলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের মধ্যে দায় এড়ানোর প্রবণতা তৈরি হয়। বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে আন্তঃনগর ট্রেনের পিএ সিস্টেম বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটছে। ২০২৪ সালের জুনে চট্টগ্রাম অভিমুখী উদয়ন এক্সপ্রেসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও দীর্ঘ সময় পিএ অপারেটর না থাকায় প্রয়োজনীয় ঘোষণা দেয়া যায়নি। কোথাও কোথাও ক্যাটারিং কর্মীদের দিয়েও পিএ সিস্টেম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে, যা যাত্রী নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিভাগের কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা।

সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের দাবি, বাংলাদেশ রেলওয়ের আন্তঃনগর ট্রেন পরিচালনা ম্যানুয়াল অনুযায়ী ট্রেনের সংকেত ও টেলিযোগাযোগ-সংক্রান্ত সব প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তাদের। তাই অনবোর্ড সার্ভিস চুক্তি থেকে পিএ সিস্টেম পরিচালনার বিষয়টি বাদ দিয়ে পুরো ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধীনে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল সহকারী ও খালাসি নিয়োগেরও প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী তারেক মোহাম্মদ শামস তুষার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলওয়ে নির্ধারিত জনবলের মাত্র ৪০ শতাংশ দিয়ে অপারেশন পরিচালনা করছে। ফলে বিভিন্ন ট্রেনে যে পরিমাণ জনবল প্রয়োজন সেটি নেই। রানিং ট্রেনে পিএ সিস্টেমের বড় অংশই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। টেলিযোগাযোগ বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ এ পদে দক্ষ কর্মী দিয়ে পিএ সিস্টেম পরিচালনা জরুরি হলেও বিদ্যমান যন্ত্রপাতিগুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন। এর পরও আমরা অনবোর্ড সার্ভিসের নির্ধারিত অপারেটরদের দক্ষতা উন্নয়নসহ সার্বিক সেবা সম্পর্কে নিয়মিত তদারক করে সর্বোচ্চ যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা প্রাপ্তিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

বর্তমানে সিএসটিই বিভাগে শুধু পিএ সিস্টেম পরিচালনার জন্য মঞ্জুরীকৃত পদ রয়েছে ১৪টি—টেলিকম সহকারী তিনটি ও খালাসি ১১টি। অথচ ২৭ জোড়া আন্তঃনগর ট্রেনের জন্য প্রয়োজন ৬৯ জন টেলিকম সহকারী ও ৬৯ জন খালাসিসহ মোট ১৩৮ জন। বর্তমানে কর্মরত আছেন শুধু ১১ জন খালাসি; টেলিকম সহকারী পদে কেউ নেই। এ জনবল ঘাটতির মধ্যেই রেলের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় থাকা ট্রেনগুলোর পিএ সিস্টেম পরিচালিত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এ সেবায় পর্যাপ্ত জনবল না থাকাকে রেলের উদাসীনতা হিসেবে দেখছেন যাত্রী ও সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, জনবল ও লোকোমোটিভ সংকটে নির্ধারিত সময়ে ট্রেন ছাড়া ও গন্তব্যে পৌঁছানো ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যে পিএ সিস্টেমের অব্যবস্থাপনা যাত্রীদের ঝুঁকি আরো বাড়াচ্ছে। দ্রুত জনবল নিয়োগের পাশাপাশি বিশেষায়িত এ সেবাটি সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীনে আনা জরুরি বলে মনে করেন তারা।

পরিবহন বিভাগের কর্মীরা বলছেন, আন্তঃনগর ট্রেনগুলো বিভিন্ন স্টেশনে মাত্র ২-৫ মিনিট যাত্রাবিরতি দেয়। পিএ সিস্টেমে ঘোষণা না হলে যাত্রীরা সময়মতো নামতে পারেন না; তাড়াহুড়ায় বয়োবৃদ্ধ, শিশু ও নারীদের দুর্ঘটনায় পড়ার ঘটনাও ঘটে। অন্যদিকে পিএ সেবা বাবদ বেসরকারি অনবোর্ড প্রতিষ্ঠানকে অর্থ দেয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় রেলের অর্থ অপচয় হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।

রেলওয়েসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক পিএ সিস্টেমে মাইক্রোফোন, অ্যাম্প্লিফায়ার, স্পিকার, কন্ট্রোলার, ডিজিটাল মেসেজ ইউনিট ও সফটওয়্যারসহ বিভিন্ন কারিগরি যন্ত্রপাতি থাকে। কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অধিকাংশেরই এসব বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। কাজ করতে করতে কেউ দক্ষ হয়ে উঠলেও চাকরি ছেড়ে দিলে নতুন কর্মীকে প্রশিক্ষিত করতে সময় লাগে। তাই অনবোর্ড সার্ভিসে পিএ সিস্টেম পরিচালনায় রেলের নিবিড় তদারকি প্রয়োজন।

আরও