যৌথ ইশতাহার

‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ সহযোগিতা এগিয়ে নিতে সম্মত বাংলাদেশ-চীন

ইশতাহারে বলা হয়, ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুদেশ রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা, ঐতিহ্যগত বন্ধুত্ব এবং বাস্তবমুখী সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে জোরদার করেছে। চীন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছে এবং নতুন সরকারের শাসন কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছে।

নিজেদের মধ্যে বিদ্যমান সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করে ‘নতুন যুগে যৌথ ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি’ গড়ে তুলতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও চীন। একই সঙ্গে দুদেশ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ সহযোগিতা এগিয়ে নেয়াসহ আরো বেশ কয়েকটি বিষয়ে একমত হয়েছে। আজ শুক্রবার এক যৌথ ইশতাহারে দুদেশের পক্ষ থেকে এমনটাই জানানো হয়েছে।

বলা হয়, ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুদেশ রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা, ঐতিহ্যগত বন্ধুত্ব এবং বাস্তবমুখী সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে জোরদার করেছে। চীন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছে এবং নতুন সরকারের শাসন কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে ‘বাংলাদেশ সবার আগে’ নীতি বাস্তবায়নের বিষয়টিও স্বীকৃতি দিয়েছে বেইজিং। অন্যদিকে বাংলাদেশ মনে করে, চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সুযোগ সৃষ্টি করবে।

দুদেশ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, শাসনব্যবস্থাসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘২+২ সংলাপ’ ব্যবস্থার সম্ভাবনা অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ইশতাহারে উভয় দেশ নিজ নিজ মৌলিক স্বার্থ ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগসংশ্লিষ্ট বিষয়ে পারস্পরিক সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবের কর্তৃত্ব প্রশ্নাতীত বলে উল্লেখ করেছে দুই পক্ষ। বাংলাদেশ ‘এক চীন’ নীতির প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানিয়ে তাইওয়ানকে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ সম্পর্কিত যেকোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় উচ্চমানসম্পন্ন সহযোগিতা সম্প্রসারণে একমত হয়েছে দুদেশ। এ লক্ষ্যে উন্নয়ন পরিকল্পনার সমন্বয়, বৃহৎ অগ্রাধিকার প্রকল্পের পাশাপাশি জনকল্যাণমুখী ‘ছোট কিন্তু সুন্দর’ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও কৃষির আধুনিকায়নে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে চীন।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে সক্ষমতার সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে বেইজিং।

বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানোরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ১০০ শতাংশ ট্যারিফ লাইনে চীনের শূন্য-শুল্ক সুবিধার প্রশংসা করেছে। একই সঙ্গে মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে দুদেশ।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, ফটোভোলটাইক প্রযুক্তি, দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রশমন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সহযোগিতা জোরদারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে ইশতাহারে। পাশাপাশি চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের সম্ভাবনাসহ আঞ্চলিক কানেক্টিভিটির নতুন বিকল্প অনুসন্ধানে সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ।

পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পানি পরিকল্পনা, জলবিদ্যাগত পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা গভীর করার বিষয়ে একমত হয়েছে দুদেশ। একই সঙ্গে তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা দেয়ার কথা জানিয়েছে চীন। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করতে দুদেশের বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া সামুদ্রিক বিষয়ে সহযোগিতা জোরদারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বিনিময়, সফর ও প্রশিক্ষণসহ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরো গভীর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা ও বেইজিং। পাশাপাশি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্পৃক্ততা বজায় রাখার বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছে।

২০২৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি এবং ‘চীন-বাংলাদেশ জনগণে-জনগণে বিনিময় বর্ষ’ সফলভাবে উদযাপনের প্রশংসা করে দুদেশ গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক, শিক্ষা, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা, যুব, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে সম্মত হয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য চীনে অধ্যয়নের সুযোগ অব্যাহত রাখার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা খাতে সহযোগিতা গভীর করার পাশাপাশি ইউনান প্রদেশসহ স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সহযোগিতার প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ। এতে বলা হয়েছে, মানবজাতির জন্য যৌথ ভবিষ্যতের কমিউনিটি গঠনের ধারণা এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রস্তাবিত বিভিন্ন বৈশ্বিক উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের বৃহত্তর ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে চীন। ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) অংশীদার হওয়ার আবেদনের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে বেইজিং। পাশাপাশি আঞ্চলিক বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার এবং এ প্রক্রিয়ায় আরো দেশকে যুক্ত করার আগ্রহের কথাও জানিয়েছে দুদেশ।

দুদেশ জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক বৈশ্বিক শৃঙ্খলা এবং জাতিসংঘ সনদের উদ্দেশ্য ও নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতিগুলো সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে সমতা ও শৃঙ্খলাভিত্তিক বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা এবং সবার জন্য উপকারী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন এগিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া জনগোষ্ঠীর সংকট সমাধানে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ। চীন বাংলাদেশের মানবিক সহায়তার প্রশংসা করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করার প্রচেষ্টায় সমর্থন জানিয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়ক ভূমিকা অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে বেইজিং।

সফরকালে উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং গণমাধ্যম সহযোগিতাসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক সহযোগিতা দলিলে স্বাক্ষর করেছে দুদেশ।

যৌথ ইশতাহারে আরো বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার সফরসঙ্গীদের প্রতি উষ্ণ ও আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য চীনের সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি।

আরও