দাম বাড়লেও বদলায় না ঢাবির হলগুলোর ক্যান্টিনের মেনু মান বাড়ে না খাবারের

শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ ডাকসু

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ঘুরেফিরে পরিবেশন করা হচ্ছে একই ধরনের পদ। পাঙাশ-তেলাপিয়া, আলু আর সীমিত কয়েকটি সবজিই যেন ক্যান্টিনের নিত্যদিনের খাবার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলগুলোর ক্যান্টিনে খাবারের দাম বাড়ছে, কিন্তু মেনুতে নেই বৈচিত্র্য। খাবারও নিম্নমানের। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ঘুরেফিরে পরিবেশন করা হচ্ছে একই ধরনের পদ। পাঙাশ-তেলাপিয়া, আলু আর সীমিত কয়েকটি সবজিই যেন ক্যান্টিনের নিত্যদিনের খাবার।

এছাড়া খাবারে জোঁক, ব্লেড, কেঁচো, তেলাপোকা ও অন্যান্য পোকামাকড় পাওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। ভোটের আগে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) বর্তমান কমটির নেতারা। ওই কমিটি দায়িত্ব নেয়ার প্রায় এক বছর পরও হলের ক্যান্টিনগুলোর খাবারের মানে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে জানান শিক্ষার্থীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি আবাসিক হলেই কমবেশি একই চিত্র। আবাসিক শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের প্রতিদিনের খাবারের প্রধান ভরসা এসব হলের ক্যান্টিন ও ডাইনিং। অথচ সময়ের সঙ্গে বাজারদর ও খাবারের দাম বাড়লেও মেনুতে বৈচিত্র্য বাড়েনি। বরং বাজারে তুলনামূলক কম দামি যে সবজি পাওয়া যায়, সেটিই দিনের পর দিন রান্না করা হয় বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। খাবারের প্রতিটি পদেই আলুর উপস্থিতি নিশ্চিত করার প্রবণতা রয়েছে। মাছ-মাংসের পদ থাকলেও পরিমাণ ও মান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।

মুরগির মাংসের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একই মাংস বিভিন্ন নামে পরিবেশন করা হয়। কোনো দিন লেগ পিস, কোনো দিন কালা ভুনা, আবার কোনো দিন ঝাল ফ্রাই। নামের পরিবর্তন হলেও খাবারের মানে পরিবর্তন আসে না। অনেক সময় মাংস পুরোপুরি সিদ্ধ হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। গরুর মাংস ও ফেফসার পদেও একই ধরনের অভিযোগ। নির্ধারিত দামের তুলনায় মাংসের পরিমাণ অতি নগণ্য; অনেক সময় মাংসের চেয়ে চর্বি কিংবা হাড্ডিই বেশি থাকে বলে দাবি শিক্ষার্থীদের।

মাছের মেনুতেও দীর্ঘদিন ধরে খুব একটা পরিবর্তন নেই। তেলাপিয়া মাছ বছরের পর বছর হলের ক্যান্টিনগুলোর নিয়মিত পদ হিসেবে থাকছে। পাঙাশও রয়েছে নিত্যদিনের মেনুতে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মাছের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পরিবর্তে কম দামি ও সহজলভ্য মাছের ওপরই বেশি নির্ভর করছেন ক্যান্টিন মালিকরা। এর বাইরে চন্দনা মাছকে ইলিশ হিসেবে পরিবেশন করে বেশি দাম নেয়ার অভিযোগও রয়েছে।

শাকসবজির ক্ষেত্রেও পুষ্টির চেয়ে খরচ ও রান্নার সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। লালশাক, লাউসহ কয়েকটি শাকসবজি ঘুরেফিরে মেনুতে থাকছে। ফলে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় বৈচিত্র্য ও পুষ্টি নিশ্চিত হচ্ছে না।

মলা মাছ নিয়েও শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা একই। ছোট মাছে পুষ্টি উপাদান তুলনামূলক বেশি থাকায় অনেকে মলা মাছের পদ বেছে নেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মলা মাছের নামে যে পদ পরিবেশন করা হয়, তাতে মাছের তুলনায় আলুর পরিমাণই বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় ৮০ শতাংশই আলু থাকে বলে অভিযোগ তাদের।

সূর্যসেন হলের শিক্ষার্থী হৃদয় হোসাইন রকি বলেন, ‘হলের খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকায় শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রতিদিনের নিম্নমানের খাবারের প্রভাব শরীর ও স্বাস্থ্যে পড়লেও অনেক শিক্ষার্থী তা প্রকাশ করতে পারছেন না। আবার অনেকে বিষয়টি বুঝতেও পারছেন না।’

ক্যান্টিনের মেনুতে শাকসবজির পরিবর্তে মাংসের পদ বেশি থাকার পেছনে রান্নার সময় ও শ্রমের বিষয়টি কাজ করে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ক্যান্টিন মালিক। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শাকসবজি ও বিভিন্ন তরকারি পরিষ্কার, কাটা ও রান্না করতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে। অন্যদিকে বাজার থেকে কাটা মাংস এনে রান্না করা সহজ ও দ্রুত। ফলে সময় ও শ্রম সাশ্রয়ের জন্য মাংসের পদকে প্রাধান্য দেয়া হয়। একই কারণে বাজারে যে সবজির দাম কম থাকে, সেটি দিয়ে দিনের পর দিন তরকারি রান্না করা হয় বলেও জানান তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে প্রায় অর্ধশত ক্যান্টিন রয়েছে। এসব ক্যান্টিন ও ডাইনিংয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী খাবার খান। ফলে খাবারের মান, পুষ্টিমান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু ক্যান্টিন পরিচালনার বিষয় নয়; শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গেও এটি সরাসরি সম্পর্কিত।

খাবারের পুষ্টিমান নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। ‘ফুড অ্যান্ড ঢাকা ইউনিভার্সিটি: আ রিপোর্ট’ শীর্ষক এক গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ক্যান্টিন ও মেসের খাবারে শিক্ষার্থীদের ক্যালরি গ্রহণের ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। ফলে কম দামে খাবার পাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছেন কিনা সেটিও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক আবিরা নাওয়ার বলেন, ‘নিরাপদ খাবার পাওয়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মৌলিক অধিকার। শুধু হল প্রশাসনের সচেতনতা যথেষ্ট নয়, পুরো ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ক্যান্টিনে শাকসবজি, ফল, দুধ ও ডিমের মতো পুষ্টিকর খাবারের বিকল্প বাড়ানো প্রয়োজন।’

কোনো কোনো ক্যান্টিনে খাবারের স্বাদ বাড়াতে টেস্টিং সল্ট ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন বলেন, ‘অতিরিক্ত টেস্টিং সল্ট ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। খাবারে লবণের পাশাপাশি টেস্টিং সল্ট ব্যবহার করলে সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

ডাকসুর এক বছরের কার্যক্রমে পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, ক্যারিয়ার ও অবকাঠামো খাতে বিভিন্ন উদ্যোগের দাবি থাকলেও শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের খাবারের ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন কতটা ঘটেছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ এক বছর পরও হলের ক্যান্টিনগুলোতে একই ধরনের খাবার, একই অভিযোগ এবং একই ধরনের মান নিয়ন্ত্রণের সংকটের কথা বলছেন শিক্ষার্থীরা।

খাবারের সমস্যা সমাধানে ডাকসুর পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছেন নেতারা। ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ‘খাবারের দাম কমিয়ে মান বাড়ানোর লক্ষ্যে টিসিবির সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গাফিলতির কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।’

ডাকসু জিএস এসএম ফরহাদ বলেন, ‘গত ১০৫ বছরের ইতিহাসে এবারের ডাকসু সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে।’ প্রশাসনের ন্যূনতম সহযোগিতা পাওয়া গেলে আরো বেশি কাজ করা সম্ভব হতো বলে তিনি দাবি করেন। বিভিন্ন স্পন্সরের সহযোগিতায় অন্তত ৩০ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

খাবারের মান নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, ‘প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রতিটি হল প্রশাসনকে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের খাবারের গুণগত মান নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব ও অভিযোগ পেলেই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’

আরও