প্রায় ২০ বছর আগে ব্রহ্মপুত্রের নাব্য সংকটে অস্তিত্ব হারায় ঐতিহ্যবাহী কুড়িগ্রামের চিলমারী নৌ-বন্দর। কর্মহীন হয়ে পড়েন এ বন্দরের কয়েক হাজার শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট অনেকে। এরপর থেকে নদের নাব্য ফিরিয়ে এনে বন্দরটি পুনরায় চালুর দাবি করে আসছিলেন জেলার ব্যবসায়ী, কর্ম হারানো শ্রমিকসহ রাজনৈতিক নেতারা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর চিলমারীর এক জনসভায় বন্দরটি পুনরায় চালুর ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ওই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর বন্দর কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন তত্কালীন নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান। ২০২১ সালের ৮ জুলাই একনেক বৈঠকে বন্দর চালুর অনুমোদন মেলে। তারপর প্রকল্প অনুমোদন করা হয় ২৩৫ কোটি টাকার। কিন্তু দীর্ঘ এ ছয় বছরে বন্দরের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ শেষ না হওয়ায় শুরু হয়নি উন্নয়নকাজ।
এতে অনেকটাই হতাশ স্থানীয় শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ এ জেলার মানুষ। দ্রুত নৌ-বন্দরটি চালু করা হলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি জেলার উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে আশা তাদের। এদিকে ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হলেই বন্দর উন্নয়নকাজ শুরু করার কথা জানান সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে দেখা গিয়েছে, বর্তমানে ব্রহ্মপুত্র নদের চিলমারী নৌ-বন্দরে বড় বড় নৌকা থাকলেও নেই পণ্যবাহী জাহাজ। এ অবস্থা চলছে দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। রমনা ঘাট নামে পরিচিত এ নদী বন্দরে অবস্থান করা এসব নৌকায় পারাপার হচ্ছেন যাত্রীরা। অথচ ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা এ বন্দর ব্যবহার করে কম খরচে ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে পণ্য আনানেয়া করতেন ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উদ্বোধন করা হলেও জেটিসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মিত না হওয়ায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে বন্দরটি। অন্যদিকে বন্দরটি পুনরায় চালু হলে কর্মস্থান হবে—এমন আশায় দিন গুনছেন শ্রমিকরা।
চিলমারী নৌ-বন্দরে অবস্থিত নৌকা ঘাটের শ্রমিক আমজাদ আলী জানান, অনেক দিন থেকেই শুনে আসছি বন্দর চালু হবে, কিন্তু হচ্ছে না। বন্দরটি দ্রুত চালু হলে আমরা কাজ করতে পারতাম।
চিলমারী উপজেলার ব্যবসায়ী সিদ্দিকুর রহমান জানান, একসময় বন্দরের নাম-ডাক থাকায় ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই হাঁকাও গাড়ী তুই চিলমারীর বন্দরে’—এ গান গেয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন মরমী শিল্পী আব্বাস উদ্দিন। দ্রুত বন্দরটি চালু হলে পাশের দেশ থেকে কম খরচে পণ্য আনানেয়ার মাধ্যমে আগের অবস্থায় আনা সম্ভব। এতে করে অবহেলিত এ জেলার ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটার পাশাপাশি বাড়বে কাজের সুযোগ ও সরকারের রাজস্ব।
চিলমারী নৌ-বন্দরের ইজারাদার শহিদুল্লাহ কায়সার জানান, বর্তমানে চিলমারী নৌ-বন্দরে ভারত থেকে পাথর ও কয়লা নিয়ে প্রতি মাসে মাত্র দুই-তিনটি জাহাজ আসায় খুবই সামান্য রাজস্ব আসছে। তবে সম্ভাবনাময় বন্দরটি চালু হলে সরকারের রাজস্ব অনেক বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন তিনি।
বর্তমানে বন্দরটি পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন তিনজন পাইলট। দায়িত্ব পালন করছে নৌ-বন্দর পুলিশও। বন্দরের কার্যক্রম পুরোপুরি চালু না হওয়ায় অনেকটাই বেকার সময় পার করছেন তারা।
চিলমারী নৌ-বন্দরে দায়িত্ব পালন করা প্রধান পাইলট মো. মাহবুবুর রহমান জানান, ‘বন্দরের উদ্বোধনের পর থেকে আমরা তিনজন পাইলট দায়িত্ব পালন করে আসছি। বর্তমানে ভারত থেকে আসা পাথরবোঝাই জাহাজগুলোকে পথ দেখিয়ে ঘাটে নিয়ে আসার কাজ করছি।’
ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়ে জেলা প্রশাসন অফিস সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চিলমারী নৌ-বন্দরের উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মানের বন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে ১১ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ চলমান রয়েছে। দ্রুত জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ করে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করা হবে বলে জানায় জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
এ ব্যাপারে চিলমারী নৌ-বন্দরের সহকারী পোর্ট অফিসার মো. আসাদুজ্জামান জানান, চিলমারী নৌ-বন্দরটি চালু রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ বন্দর স্থাপনের কাজও চলমান। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হলেই বন্দরের জেটিসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হবে।