দেশে কর্নিয়াজনিত অন্ধত্বে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি হলেও প্রয়োজনের তুলনায় কর্নিয়া সংগ্রহ হচ্ছে খুবই কম। বাংলাদেশে এ সংকটের একটি চিত্র পাওয়া যায় সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির প্রকাশিত তথ্যে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেশে পাঁচ লাখের বেশি কর্নিয়াজনিত অন্ধত্বে আক্রান্ত মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বছরে গড়ে মাত্র ৫০টি কর্নিয়া সংগ্রহের তথ্যও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবিত অবস্থায় চক্ষুদানের অঙ্গীকার, সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার, মৃত্যুর পর পরিবারের অনীহা এবং কর্নিয়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এ কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। এমন বাস্তবতায় আজ দেশে পালিত হচ্ছে ‘মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস’। বিশেষজ্ঞদের মতে, চক্ষুদান নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আই ব্যাংকের সক্ষমতা, প্রশিক্ষিত জনবল ও দেশব্যাপী কর্নিয়া সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ অন্ধত্বে আক্রান্ত। তাদের মধ্যে পাঁচ লাখের বেশি মানুষের অন্ধত্বের কারণ কর্নিয়ার সমস্যা। এসব মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার অন্যতম উপায় হলো অন্য মানুষের দান করা কর্নিয়া প্রতিস্থাপন।
সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির সমন্বয়ক বা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে যুক্ত মো. সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে সক্রিয়ভাবে কর্নিয়া সংগ্রহের কাজ করছে সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি। এ ব্যবস্থাকে অ্যাকটিভ আই ব্যাংকিং বলা হয়। অন্যদিকে প্যাসিভ আই ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কর্নিয়া আমদানি করে প্রতিস্থাপন করা হয়। তবে এতে ব্যয় অনেক বেশি। আমদানি করা কর্নিয়া প্রতিস্থাপনে প্রতিষ্ঠানভেদে প্রায় দেড় লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। বিপরীতে সন্ধানী সংগৃহীত কর্নিয়া সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করে।’
সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার মধ্যে কর্নিয়া সংগ্রহ করতে হয়। জীবিত অবস্থায় চক্ষুদানের অঙ্গীকারের পাশাপাশি মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যদের দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করাও জরুরি। এক্ষেত্রে দাতার পরিবারের সদস্যদের আগে থেকেই তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংগঠনটি।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেটিনা ব্লু বিভাগের ইউনিট হেড এবং ভিট্রিও রেটিনার সহযোগী অধ্যাপক ডা যাকিয়া সুলতানা নীলা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে মরণোত্তর চক্ষুদান কার্যক্রমে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। চক্ষু বিশেষজ্ঞরা মানুষকে কাউন্সেলিং করছেন, সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশ কর্নিয়া সোসাইটিও এ বিষয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি সন্ধানী দীর্ঘদিন ধরে মরণোত্তর চক্ষুদানে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু এত উদ্যোগের পরও মানুষের আগ্রহ বাড়ছে না। এর অন্যতম কারণ সামাজিক কুসংস্কার ও পরিবারের অনীহা। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি, সামাজিক সংকোচ ও নানা ট্যাবু কাজ করে। ফলে দাতার অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত কর্নিয়া সংগ্রহ সম্ভব হয় না।’
১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ২ নভেম্বরকে ‘মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর থেকে প্রতি বছর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।