ট্রেন কম চললেও বাড়ছে রেলের জ্বালানি ব্যবহার

রেলের তথ্যমতে, জনবল, লোকোমোটিভ, কোচসহ রোলিং স্টকের তীব্র সংকটে কয়েক বছর ধরে নাজুক অবস্থায় রয়েছে রেলওয়ে।

কভিড-পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ৯৯টি ট্রেন এখনো চালু করতে পারেনি রেলওয়ে। কমেছে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলও। এর সঙ্গে ইঞ্জিন, কোচ ও জনবল সংকটে শিডিউলে থাকা অনেক ট্রেনের যাত্রাও বাতিল হচ্ছে। এত কিছুর পরও বাংলাদেশ রেলওয়ের জ্বালানি ব্যবহার কমেনি, বরং অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি চুরি, লোকোমোটিভ সংকট ও অপারেশনাল অব্যবস্থাপনার কারণে এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ঠেকাতে পারছে না রেলওয়ে।

রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি চুরির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে চলন্ত ট্রেনে। বিশেষ করে পণ্যবাহী ট্রেন, বেশি স্টপেজ বা দীর্ঘ যাত্রাবিরতিতে থাকা ট্রেন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে পথে অপেক্ষমাণ ট্রেন থেকে তেল চুরির অভিযোগ বেশি। গত কয়েক বছরে লোকোমোটিভে ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম বসানো হলেও এ প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলন্ত ট্রেনের পাশাপাশি ডিপো, স্টেশন ও সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যান্য পর্যায়ে জ্বালানির অপব্যবহার ও চুরি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে জ্বালানি ব্যবহারের ঊর্ধ্বমুখী ধারা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

রেলের জ্বালানি ব্যবহার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। এর আগেই চলন্ত ট্রেন থেকে তেল চুরি ঠেকাতে লোকোমোটিভে জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস বসানোর কাজ শুরু করে রেলওয়ে। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রায় সব লোকোমোটিভেই এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। করোনাকালে লকডাউনের কারণে দীর্ঘ সময় ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় জ্বালানি ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। তবে ২০২২ সালে তা আবার অস্বাভাবিক হারে বাড়তে শুরু করে। ২০২১-২২ অর্থবছরে সীমিত পরিমাণ কয়লা বাদে রেলের মোট জ্বালানি ব্যবহার ছিল ২৪ হাজার ৫৮৫ টন। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ৪৯ হাজার ৯৬৬ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরো বেড়ে ৫৫ হাজার ১৩২ টনে দাঁড়ায়।

রেলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে ট্রেনগুলোর মোট চলাচল ছিল ২ কোটি ১০ লাখ ৯৫ হাজার কিলোমিটার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ২৬ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়ে ২ কোটি ৬৬ লাখ ৩ হাজার কিলোমিটারে দাঁড়ায়। অথচ একই সময়ে জ্বালানি ব্যবহার ১০৩ দশমিক ২৪ শতাংশ বেড়ে ২৪ হাজার ৫৮৫ থেকে ৪৯ হাজার ৯৬৬ টনে পৌঁছায়। পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ সালে দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ কমে ২ কোটি ৬৫ লাখ ৮১ হাজার কিলোমিটারে নেমে এলেও জ্বালানি ব্যবহার উল্টো ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়ে ৫৫ হাজার ১৩২ টনে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ট্রেনের মোট চলাচল সামান্য কমলেও এক বছরেই অতিরিক্ত ৫ হাজার ১৬৬ টন জ্বালানি ব্যবহার হয়েছে।

রেলের তথ্যমতে, জনবল, লোকোমোটিভ, কোচসহ রোলিং স্টকের তীব্র সংকটে কয়েক বছর ধরে নাজুক অবস্থায় রয়েছে রেলওয়ে। করোনাকালে কয়েক মাস ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকার পরও সংকটের কারণে ৯৯টি ট্রেন আর চালু করা যায়নি। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ৫০ ও পশ্চিমাঞ্চলে ৪৯টি ট্রেন রয়েছে। এসব ট্রেন দেশের বিভিন্ন রুটে উভয়মুখী যাত্রীসেবা দিত। একই সংকটে পূর্বাঞ্চলে ওয়ার্কিং টাইমটেবিলে থাকা প্রতিদিন ১৪ থেকে ২৪টি ট্রেনও বন্ধ থাকছে। এমনকি আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রা বাতিলও এখন নিয়মিত ঘটনা। অন্যদিকে গত কয়েক বছরে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল নেমে এসেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে। এত ট্রেন ও সার্ভিস বন্ধ থাকার পরও রেলের জ্বালানি ব্যবহার প্রত্যাশিত হারে কমেনি; বরং বিভিন্ন সময়ে ট্রেন চলাচল বৃদ্ধির তুলনায় জ্বালানি ব্যবহার বেড়েছে কয়েক গুণ।

এ বিষয়ে রেলের যুগ্ম মহাপরিচালক (যান্ত্রিক) মুহাম্মদ কুদরত-ই-খুদা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলের জ্বালানি ব্যবহার শুধু চলাচলকারী ট্রেনের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; ট্রেন চলাচল বাড়লে জ্বালানি ব্যবহারও বাড়ে। বন্ধ থাকা ট্রেনগুলোর বেশির ভাগই দ্বিতীয় শ্রেণীর। বিপরীতে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দীর্ঘ রুটে আন্তঃনগর ট্রেন চালু হয়েছে। ফলে ট্রেনের সংখ্যা কমলেও মোট ট্রেন চলাচল বাড়ায় জ্বালানি ব্যবহার বেড়ে থাকতে পারে।’

সাম্প্রতিক সময়েও রেলের বিভিন্ন ট্রেনে তেল চুরির ঘটনা সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে আখাউড়া জংশনে একটি পণ্যবাহী ট্রেন থামিয়ে তেল চুরির ঘটনায় ট্রেনচালক মো. নাসির উদ্দিন, সহকারী ট্রেনচালক আবদুর রাজ্জাক ও ট্রেন পরিচালক মো. ওমর ফারুকসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া বিভিন্ন ট্রেনে তেল চুরির অভিযোগ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, লোকোমোটিভে ট্র্যাকিং ডিভাইস বসানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চুরির খবর প্রকাশের পরই কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিচ্ছে।

একক ট্রেন হিসেবে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি ব্যবহার হয় পণ্যবাহী ট্রেনে। ধীরগতিতে চলার পাশাপাশি যাত্রীবাহী ট্রেনকে অগ্রাধিকার দিতে বিভিন্ন স্টেশনে এসব ট্রেনকে প্রায়ই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অথচ গত ছয় বছরে পণ্যবাহী ট্রেনের চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পণ্যবাহী ট্রেনের মোট চলাচল ছিল ১৬ দশমিক ১০ লাখ কিলোমিটার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা কমে ১৩ দশমিক ৩৬ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৩ দশমিক ৬৮ লাখ কিলোমিটারে দাঁড়ায়। এরপর ২০২১-২২ অর্থবছরে ১২ দশমিক ৯৫ লাখ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১ দশমিক ৯৬ লাখ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৮ দশমিক ৫২ লাখ কিলোমিটারে। অর্থাৎ ছয় বছরে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল কমেছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল এতটা কমে যাওয়ার পরও সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবহার বেড়ে যাওয়া রেলওয়ের আয়-ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

রেলের জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধির পেছনে লোকোমোটিভ সংকট ও শিডিউল বিপর্যয়ের পাশাপাশি ট্রেন দুর্ঘটনা এবং পথিমধ্যে বারবার ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ঘটনাকেও দায়ী করছে যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগ। তাদের ভাষ্য, নির্ধারিত সময়ে ট্রেন চলতে না পারলেও অনেক ক্ষেত্রে ইঞ্জিন চালু রাখতে হয়। গত কয়েক বছরে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিঘ্ন বাড়ায় দীর্ঘ সময় ইঞ্জিন আইডলিংয়ে রাখতে হচ্ছে, আর এ সময়েও ডিজেল খরচ হচ্ছে। ফলে ট্রেন চলাচল না বাড়লেও জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে। এছাড়া পুরনো লোকোমোটিভ ব্যবহার এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও বিশ্রাম ছাড়াই সেগুলো দিয়ে নিয়মিত ট্রেন পরিচালনার কারণেও জ্বালানির অপচয় হচ্ছে বলে দাবি বিভাগের কর্মকর্তাদের।

রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২০ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের বেশ কয়েকটি লোকোমোটিভে ২২টি জিপিএস ফুয়েল ট্র্যাকার বসানো হয়। পরে পর্যায়ক্রমে প্রায় সব লোকোমোটিভেই এ ধরনের ট্র্যাকার বসানো হয়েছে। তবে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জ্বালানি ব্যবহারের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় তেল চুরি ঠেকানোর এ উদ্যোগ পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বলে মনে করছেন রেলের পরিবহনসহ বিভিন্ন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘করোনার পর শতাধিক ট্রেনের চলাচল বন্ধ হয়েছে। এখনো প্রতিদিন অনেক ট্রেনের যাত্রা বাতিল হচ্ছে এবং পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলও প্রতি বছর কমছে। এর পরও জ্বালানি ব্যবহার কেন কমছে না বরং বাড়ছে, তার ব্যাখ্যা যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগকেই দিতে হবে।’ জ্বালানি চুরি শুধু চলন্ত ট্রেনে সীমাবদ্ধ নয়। বিপণন কোম্পানির ডিপো থেকে জ্বালানি সংগ্রহ, রেলের ডিপোতে মজুদ এবং সেখান থেকে বিভিন্ন স্টেশন ও ওয়ার্কশপে সরবরাহের পথেও অপচয় ও চুরির ঘটনা ঘটে। শুধু লোকোমাস্টারদের ওপর দায় চাপিয়ে এ সংকটের সমাধান হবে না; ট্রেন চলাচলের সঙ্গে জ্বালানি ক্রয়, সরবরাহ ও প্রকৃত ব্যবহারের হিসাব সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করলে অপচয় অনেকটাই কমানো সম্ভব।’

জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলের জ্বালানি চুরির বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত। এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা হয়েছে। যেসব পয়েন্টে তেল চুরির ঝুঁকি বেশি, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি বা দপ্তরের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে সর্বোচ্চ কঠোরতা বজায় থাকবে। তবে নতুন কোনো পদ্ধতি চালুর পর একটি সমস্যা শতভাগ দূর করতে কিছুটা সময় লাগে। রেলওয়ের জ্বালানি অপচয় ও চুরি বন্ধে আমরা কাজ করছি।’

আরও