অনেক ব্যাংক থেকে গ্রাহক আমানত তুলে এনে এমটিবিতে রাখছেন

আমি মনে করি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক অনেক ভালো আছে। দেশের ব্যাংক খাতের যে চিত্র আমরা দেখছি, গণমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক সম্পর্কে যেসব সংবাদ ছাপা হচ্ছে, সে তুলনায় আমাদের ব্যাংকের অবস্থা অনেক ভালো।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। প্রায় পাঁচ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে। এর আগে সফলতার সঙ্গে সামলেছেন ঢাকা ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর পদ। চেয়ারম্যান হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি)। সম্প্রতি তিনি দেশের ব্যাংক খাতের নানা সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইমামূল হাছান আদনান

বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের ব্যাংক খাত। কিছু ব্যাংকে গ্রাহকের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে না পারার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক কেমন করছে?

আমি মনে করি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক অনেক ভালো আছে। দেশের ব্যাংক খাতের যে চিত্র আমরা দেখছি, গণমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক সম্পর্কে যেসব সংবাদ ছাপা হচ্ছে, সে তুলনায় আমাদের ব্যাংকের অবস্থা অনেক ভালো। এ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সুশাসন। এটি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, সুশাসনের দিক থেকে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের অবস্থান সেরাদের মধ্যেও সেরা।

এ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সবসময়ই এটি বিশ্বাস করেছে যে পর্ষদের কাজ হলো নীতি প্রণয়ন ও কর্মকৌশল ঠিক করা। ব্যাংকের দৈনন্দিন যাবতীয় কাজের দায়দায়িত্ব ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের। বছরের শুরুতে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে এটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়া হবে, প্রতি মাসে সেটির আপটেড যাবে। প্রতি ত্রৈমাসিকে এর পর্যালোচনা হবে। কোনো সমস্যা ধরা পড়লে প্রয়োজনে কর্মকৌশলে পরিবর্তন আসবে। এটিই এ ব্যাংকের পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নিয়মিত চর্চা। আমি এর আগে অনেক ব্যাংকে কাজ করেছি। কোনো ব্যাংকের পর্ষদে এত বেশি বিস্তৃত পর্যালোচনা হতে দেখিনি। আমরা নিয়মিত ব্যাংকের বিরাজমান ও ভবিষ্যৎ সব ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করি। ব্যাংকের প্রতিটি ঋণ হিসাব নিয়েও এখানে পর্যালোচনা হয়।

তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন, এমটিবি আর্থিকভাবে খুবই স্বাস্থ্যবান ও শক্তিশালী ব্যাংক?

আমি এটি বলব না, মিউচুয়াল ট্রাস্ট দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাংক। তবে আমি অবশ্যই বলব, আমরা ভালো অবস্থানে আছি। আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর মধ্যে এমটিবি একটি।

দেশের ব্যাংক খাতে যে সংকট চলছে, তার প্রভাব মিউচুয়াল ট্রাস্টের ওপর কতটা পড়েছে?

ব্যাংক খাতে বিরাজমান সংকটের সূত্রপাত অনেক আগের। ২০২২ সালে দেশে ডলারের তীব্র সংকট শুরু হয়। ওই সময় দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৫০টিরও বেশি ব্যাংক বৈদেশিক দায় মেটাতে (এলসি দায়) দেরি করেছে কিংবা ব্যর্থ হয়েছে। যে অল্প কয়েকটি ব্যাংক এ সংকট থেকে মুক্ত ছিল এমটিবি তার একটি। আমরা যথাসময়ে এলসি দায় পরিশোধ করেছি। কিছু ক্ষেত্রে অগ্রিমও পরিশোধ করা হয়েছে।

এখন দেশের ব্যাংক খাতে নগদ অর্থের সংকট চলছে। কিন্তু আমাদের ব্যাংকে অর্থের কোনো সংকট নেই। কারণ আমরা সবসময়ই পর্যাপ্ত তারল্য হাতে রাখায় গুরুত্ব দিয়েছি। একটি ব্যাংকের প্রতি আস্থার প্রথম শর্তই হলো গ্রাহক যখন চাইবেন তখনই তার অর্থ ফেরত দিতে হবে। এ মুহূর্তে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত (এডি রেশিও) ৭৭-৭৮ শতাংশ। দেশের যে কয়েকটি ব্যাংকের হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ আছে, তার একটি মিউচুয়াল ট্রাস্ট। আমরা সবসময়ই গ্রাহকসেবাকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। এখন তারই প্রতিদান পাচ্ছি। দেশের অনেক ব্যাংক থেকে গ্রাহক আমানত তুলে এনে এমটিবিতে রাখছেন। এমনকি আমাদের ব্যাংকে লকারসেবাও স্থানান্তর করছেন তারা।

আপনার ভাষ্য অনুযায়ী মানুষ এখন উপলব্ধি করছে, আমানত রাখার জন্য ভালো ব্যাংক দরকার?

অবশ্যই। দেশের সাধারণ মানুষ বেশি মুনাফার লোভে এমএলএম কোম্পানিগুলোয় টাকা রেখেছিল। কিন্তু দিন শেষে প্রতারিত হয়েছে। বেশি মুনাফা না খুঁজে গ্রাহকদের দেখতে হবে, কোন ব্যাংকে টাকা রাখলে সেটি নিরাপদ। দেশের দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় (এনবিএফআই) টাকা রেখেও অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সচেতনতার অভাবেই এগুলো ঘটেছে। তবে মানুষ এখন আমানত রাখার জন্য ভালো ব্যাংক খুঁজছে। ভালো কিছু অর্জন করতে কষ্টের প্রয়োজন হয়। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের দৃঢ় আস্থা অর্জনে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে।

গ্রাহকদের সচেতনতার অভাব, নাকি প্রতিষ্ঠানের সুশাসনের ঘাটতি—কোনটিকে বেশি দায়ী করবেন?

সুশাসনের ঘাটতিই বিরাজমান সংকটের জন্য দায়ী। একটি প্রতিষ্ঠান খারাপ হতে শুরু করে সুশাসনের ঘাটতির কারণেই। এমএলএম কোম্পানি কিংবা এনবিএফআইগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে সুশাসন ছিল না। আবার সুশাসন ছিল না বলেই দেশের ব্যাংক খাতে আজকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সুশাসন থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠান নষ্ট হওয়ার কথা নয়।

যে ব্যাংকগুলোয় আমানত ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেগুলো একক ব্যক্তি কিংবা কোম্পানির মালিকানায় চলে গিয়েছিল। ওই ব্যক্তির মর্জিমতো সেগুলো পরিচালিত হয়েছে এবং সেটি ঘটেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়। যেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব হলো কেউ অপরাধ করলে সেটি ধরা এবং শাস্তি দেয়া। কিন্তু ওই ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে সেটি হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে অপরাধকে না দেখার ভান করা হয়। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অপরাধে সহযোগিতা করেছে।

আপনি দেশের স্বনামধন্য তিনটি ব্যাংকের এমডি ছিলেন, এখনো একটিতে আছেন। আবার এবিবির চেয়ারম্যানও ছিলেন। এ খাতে সংঘটিত অনিয়ম প্রতিরোধে আপনার ভূমিকা কী ছিল? কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে জানিয়ে প্রতিকার চেয়েছিলেন কিনা?

ব্যক্তিগতভাবে আমি সবসময়ই অনিয়মের প্রতিবাদ করেছি। বিভিন্ন সময় ও মাধ্যমে এ বিষয়ে কথা বলেছি। এক বছরের মধ্যেই তিন-চারবার আমাকে বলা হয়েছে, আমি কেন কথাগুলো বলি। আমার সহকর্মীরাও আমাকে বলেছে, ‘মাহবুব, কথা বইলো না!’ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আমাকে এমনও বলা হয়েছে, ‘তুমি সব জায়গায় সব কথা বলো কেন?’

তার মানে অনিয়মের প্রতিবাদ করায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও আপনাকে চুপ করিয়ে দেয়া হয়েছে?

হুম। চুপ থাকতে বলা হয়েছে। তবে আরেকটা দিকও ছিল। আমরা তো সবাই বাংলাদেশেই থাকি। সাংবাদিক হিসেবে আপনারাও অনেক কিছু ঠিকমতো লিখতে পারেননি। আমাদের তো একটিই সবুজ পাসপোর্ট। আমাকে এ দেশেই থাকতে হবে। আমারও একটি পরিবার আছে। আমার ওপর নির্ভরশীল কিছু মানুষ এখানে আছে। এসব কারণে আমিও একটি লেভেলের ওপর যেতে পারিনি। অনেক ক্ষেত্রে আমাকেও আপস করতে হয়েছে।

প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পূর্ণ করতে যাচ্ছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। দীর্ঘ এ পথযাত্রায় ব্যাংকটির বিস্তৃতি কতটুকু ঘটল?

এ মুহূর্তে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ১৫২টি শাখা-উপশাখা রয়েছে। ২০০টির বেশি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট ও ৩০০-এর বেশি এটিএম-সিআরএম আছে। আমাদের রয়েছে লক্ষাধিক ক্রেডিট কার্ড গ্রাহক, প্রায় সাড়ে তিন হাজার পিওএস মেশিন। সারা দেশে এক লাখের বেশি মাইক্রো মার্চেন্ট রয়েছে আমাদের। আধুনিক প্রযুক্তি সন্নিবেশের দিক থেকে মিউচুয়াল ট্রাস্ট দেশের সেরা ব্যাংকগুলোর একটি। সেপ্টেম্বর শেষে আমাদের কাছে গ্রাহকদের প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকার আমানত জমা ছিল। একই সময়ে আমরা ২৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করেছি। সে হিসাবে আমাদের এডি রেশিও এখন ৭৭-৭৮ শতাংশ।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওর ৮১ শতাংশ এখন করপোরেট। এসএমই, রিটেইল ও কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে আমরা এ অনুপাত ৭০ শতাংশে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছি। একেবারে নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যাংক খাত সংস্কারে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়েছে। এসব উদ্যোগে আপনার সন্তুষ্টি কেমন?

গত ১৫ বছরে আমরা যে অবস্থায় চলে গেছি, সেটি পুনরুদ্ধারে দুই মাস কিছুই না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর বেশকিছু কাজ শুরু করেছেন। ব্যাংক খাতের অভিভাবক হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হলো মাথার মতো। মাথা ঠিক হয়ে গেলে শরীরের অন্যান্য অঙ্গও কাজ করতে শুরু করবে।

কিন্তু যে কর্মীরা ঘুস-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত তাদের নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সঠিক পথে আনা কতটা সহজ হবে?

দেখুন, প্রক্রিয়াটা ঠিক করতে হবে। প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে সেট করা গেলে কেউ বেঠিক পথে গেলেই সেখানে অ্যালার্ম বেল বাজবে। আমরা হয়তো সরকারের কাছে অনেক প্রত্যাশা করছি। এটি হবে, সেটি হবে। কিন্তু আসলে সব প্রত্যাশার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। যে ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ভেঙে দেয়া হয়েছে, সেগুলোর ব্যবস্থাপনায়ও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের গ্রাহকদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

গ্রাহকদের উদ্দেশে আমার বার্তা হলো আপনাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ। ২৫ বছর ধরে আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। আপনারা সঙ্গে না থাকলে আমরা এ পর্যায়ে আসতে পারতাম না। আমরা সবসময় আপনাদের সেবার মান বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করেছি। আমরা চেয়েছি, আপনারা বাসায় বসেই মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সব সেবা উপভোগ করুন। কোনো কাজের জন্যই যেন ব্যাংকে আসতে না হয়। আমাদের অ্যাপে সব সেবার সন্নিবেশ ঘটানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে অ্যাপে আরো কিছু ফিচার যুক্ত হবে। আমি বলব, আপনারা আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখুন। আমরা আপনাদের সঙ্গে ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব।

আরও