আট মাস ধরে নিষ্ক্রিয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

অভিযোগ পড়েছে তিন শতাধিক, তদন্ত বন্ধ কমিশন না থাকায়

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ‘মব’ শব্দটি বেশি পরিচিতি পেয়েছে। উচ্ছৃঙ্খল জনতার এসব কাণ্ড মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে বলে প্রায়ই মত দেন বিশ্লেষকরা।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ‘মব’ শব্দটি বেশি পরিচিতি পেয়েছে। উচ্ছৃঙ্খল জনতার এসব কাণ্ড মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে বলে প্রায়ই মত দেন বিশ্লেষকরা। প্রতিনিয়ত এমন ঘটনা ঘটলেও আট মাস ধরে স্থবির হয়ে আছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম। অথচ এ সময়ে জমা পড়েছে তিন শতাধিক অভিযোগ। তবে কমিশন না থাকায় অভিযোগগুলো তদন্ত করে কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারছেন না সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯’-এ বলা আছে, কমিশন একটি সংবিধিবদ্ধ স্বাধীন সংস্থা হবে এবং এর স্থায়ী ধারাবাহিকতা থাকবে। চেয়ারম্যানের সঙ্গে সদস্য হিসেবে থাকবেন সর্বোচ্চ ছয়জন। একজন থাকবেন সার্বক্ষণিক সদস্য। চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে সার্বক্ষণিক সদস্য চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

এদিকে গত বছরের ৭ নভেম্বর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সদস্য ও কমিশনের অন্য সদস্যরা পদত্যাগ করেন। এরপর আর কমিশন গঠন করা হয়নি। আট মাস ধরেই ফাঁকা পড়ে আছে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, সার্বক্ষণিক সদস্য ও কমিশন সদস্যের পদ।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সূত্রে জানা যায়, কমিশনের পদত্যাগের দিন থেকে গত জুন পর্যন্ত তিন শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। এর বেশির ভাগই পারিবারিক সমস্যা, জমিজমা, সম্পত্তি দখলসংক্রান্ত বিষয়। তবে কমিশন শূন্য থাকায় সেগুলো নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘‌পুরো কমিশন থাকলে দেওয়ানি আদালতের ক্ষমতা বলে “‍মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে’’—এমন ঘটনায় নিজেদের উদ্যোগ নিয়ে তদন্ত করা যেত। কমিশনে চারটি বেঞ্চ রয়েছে। এ অভিযোগ বেঞ্চে ওঠে। কিন্তু কমিশন না থাকলে বেঞ্চে উপস্থাপনার সুযোগ নেই। ফলে এসব নিয়ে আমাদের কাজ করারও সুযোগ নেই। কমিশন থাকলে অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করা যেত, নির্দেশনা দেয়া যেত। কমিশন চেয়ারম্যান কিংবা সার্বক্ষণিক সদস্যের নির্দেশনা ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নেই।’

কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, গত বছর মোট ৭৫১টি অভিযোগ এসেছিল কমিশনে। এর মধ্যে ৩৭৩টি নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। বিচারকাজ চলমান রয়েছে ২২৮টি অভিযোগের। অন্যদিকে অভিযোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে ১৫০টির।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের উপপরিচালক সুস্মিতা পাইক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভুক্তভোগীর অভিযোগ নিয়েই আমাদের কাজ। অভিযোগ পেলে তদন্ত করি। প্রয়োজনভেদে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে সুপারিশ করি। তবে গত ৭ নভেম্বর কমিশন চেয়ারম্যান ও সদস্যরা বিদায় নেয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত আমরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারিনি। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলেও কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছি না। কেননা কমিশন ব্যতীত এসব ক্ষেত্রে আমাদের কোনো ক্ষমতা নেই।’

নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় ভুক্তভোগীকে বিকল্প পথ দেখিয়ে দেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে সুস্মিতা পাইক বলেন, ‘অনেকের সমস্যা ও কষ্টের তীব্রতা বিবেচনায় নিয়ে আমরা অনেক সময় আন-অফিশিয়ালি পুলিশসহ বিভিন্ন দপ্তরকে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করছি। এটি যদিও আমাদের কাজের মধ্যে পড়ে না। তার পরও মানুষের সহযোগিতায় করতে হচ্ছে।’

দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করে বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। প্রতি মাসেই সংস্থাটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো নানা ঘটনার প্রতিবেদন তুলে ধরে। আসকের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি-মে মাস পর্যন্ত অসংখ্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে দেশে। এ সময় দেশে গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়েছে ৭৮ জনের। সীমান্ত হত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৩টি। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেছে সাতটি। এছাড়া সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ২৩টি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা একটি, চারটি ঘটনা ঘটেছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলার এবং জমি দখলের ঘটনা ঘটেছে একটি।

আসকের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যু হয়েছে ৫৫ জনের। আহত হয়েছে ২ হাজার ৪৭৩ জন। কারা হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ৩৭ জনের। এর মধ্যে আন্ডার ট্রায়াল আসামি ২২ জন এবং দোষী সাব্যস্ত আসামি ১৫ জন। জানুয়ারি-মে সময়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২৮৬টি। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯৭টি। শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২৪১টি। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা রয়েছে ১৬টি।

আরেক মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য বলছে, গত বছরের নভেম্বর-মে পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যু হয়েছে ৫৬ জনের। আহত হয় ২ হাজার ৭৩০ জন। কারা হেফাজতে মৃত্যু ৫৭। অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ৩২৬ জনের। সীমান্তে হত্যার শিকার হয়েছেন ২১ জন। সংখ্যালঘু নির্যাতন, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, হামলা বা জমিজমাসংক্রান্ত ঘটনা ঘটেছে ৯৪টি; ধর্ষণের শিকার ৪৪৩, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ১১২টি ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে ২১টি। এ সময়ে নারী ও শিশু হত্যার শিকার হয়েছে ৫০৩ জন। একই সময়ে দেশে গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়েছে ৮১ জনের এবং আহত হয়েছে ১৮৯ জন।

এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ আট মাস ধরে অভিভাবকহীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। ক্ষোভ প্রকাশ করে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাটি হয়তো সরকারের কাছে ‘গুরুত্ব’ পাচ্ছে না, সেজন্যই এতদিন নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে।

দ্রুত সময়ের মধ্যে কমিশন গঠনের পরামর্শ দিয়ে মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আট মাস ধরে মানবাধিকার কমিশনে চেয়ারম্যান বা কোনো সদস্য নেই। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি কমিশন এতদিন শূন্য থাকে কীভাবে বুঝি না। বর্তমান সময়ে সরকারের কাছে এটি কোনোই গুরুত্ব পাচ্ছে না, যা খুবই দুঃখজনক। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তথ্য কমিশনও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। রাষ্ট্র এসবের গুরুত্ব কেন বুঝছে না, সেটি আমরা বুঝি না।’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনটি আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের অধীনে। এ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরীর মন্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও সাড়া দেননি।

আরও