‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র লেখক কে?

শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র লেখক কে তা নিয়ে সম্প্রতি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বইটি লেখার পুরস্কারস্বরূপ এক কর্মকর্তাকে পুলিশের শীর্ষ পদে বসানো হয়েছিল।

শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র লেখক কে তা নিয়ে সম্প্রতি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বইটি লেখার পুরস্কারস্বরূপ এক কর্মকর্তাকে পুলিশের শীর্ষ পদে বসানো হয়েছিল। তবে কয়েকজন ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ ও বইটির প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এটিকে নিছক রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবেই দেখছেন। তাদের দাবি, এ আত্মজীবনী সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা জাবেদ পাটোয়ারীকে দিয়ে লেখানো নয়। এ গ্রন্থের সঙ্গে জাবেদ পাটোয়ারীর কোনো সম্পৃক্ততার কথা শোনা যায়নি বলেও জানিয়েছেন তারা। তবে শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সংকলন ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’-এর সঙ্গে জাবেদ পাটোয়ারী যুক্ত ছিলেন। তাদের মতে, যেহেতু প্রশ্ন উঠেছে, তাই ঘটনার তদন্ত হওয়া উচিত। বইটি যে চারটি পাণ্ডুলিপি বা খাতা থেকে লেখা হয়েছে সেগুলোর ফরেনসিক বা ক্যালিগ্রাফি পরীক্ষা করানো যেতে পারে।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)। প্রকাশনা সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘“‍অসমাপ্ত আত্মজীবনী” নিয়ে কিছু পত্রিকার প্রতিবেদন আমাদের নজরে এসেছে। সম্ভবত অভিযোগকারীরা অন্য একটি প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত অন্য একটি গ্রন্থের সঙ্গে “‍অসমাপ্ত আত্মজীবনী”কে গুলিয়ে ফেলেছেন। ইউপিএল প্রকাশনার মানদণ্ড কঠোরভাবে বজায় রাখে। এখন পর্যন্ত এমন কোনো গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ আমরা পাইনি যার ভিত্তিতে “‍অসমাপ্ত আত্মজীবনী”র রচনাকার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আমরা আশা করি, তদন্তে প্রকৃত তথ্য প্রতিষ্ঠিত হবে।’

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটিকে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে থাকা অবস্থায় এটি রচনা শুরু করেন কিন্তু তিনি তা শেষ করে যেতে পারেননি। ২০১২ সালের জুনে প্রকাশিত এ গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা ও ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা। বইটির ভূমিকা অনুযায়ী, শেখ মুজিবুর রহমানের হলুদ, জীর্ণ ও খুবই নরম চারটি খাতাকে অনুসরণ করে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রকাশ করা হয়। খাতাগুলো ২০০৪ সালের আগস্টের শেষের দিকে পাওয়া। পাণ্ডুলিপি তৈরি থেকে বই প্রকাশ পর্যন্ত এ কাজে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, বেবী মওদুদ, অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, আবদুর রহমান (রমা), মনিরুন নেছা নিনু, প্রফেসর এএফ সালাহউদ্দীন আহমদসহ আরো বেশ কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ছিলেন।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ শামসুজ্জামান খান সম্পাদনা করেছেন—এমন কথা শুনেছেন বলে জানিয়েছেন লেখক, গবেষক ও অনুবাদক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি যখন জাতীয় জাদুঘরের ডিজি ছিলাম তখন জানতাম শামসুজ্জামান খান এ কাজটা সম্পাদনা করছেন। সম্পাদনা করার জন্য তিনি প্রায়ই গণভবনে যান এবং এটা আমরা বিশ্বাস করতাম। আর জাবেদ পাটোয়ারী স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) কিছু গোপনীয় দলিল আরেকটি বইয়ের (সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) জন্য তুলে দিয়েছেন। এটা অনেক পরের ঘটনা। তবে এ দুইটার মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে করি না।’

তিনি আরো বলেন, ‘জাবেদ পাটোয়ারী লিখেছেন (অসমাপ্ত আত্মজীবনী) বলে মনে হয় না। তবে শামসুজ্জামান খান অনেক পরিমার্জন করতে পারেন। আত্মজীবনীতে পরিমার্জনের নিয়ম আছে। শামসুজ্জামান খান এটার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন সে ব্যাপারে আমি প্রায় নিশ্চিত, উনি প্রায়ই এটার জন্য গণভবনে যেতেন।’

অসমাপ্ত আত্মজীবনীর লেখক নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে বলে মনে করেন না জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ড. চৌধুরী শহীদ কাদের। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সে সময়ের ঘটনাপঞ্জি এবং ঐতিহাসিক চরিত্রের অনেকেই এখনো প্রাসঙ্গিক। তাদের কাছ থেকেও খোঁজখবর নেয়া যেতে পারে। এটা মূলত রাজনৈতিক বিতর্ক ছাড়া আর কিছু নয়। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে যে সময়কালের রাজনীতির নিখুঁত বিবরণ উঠে এসেছে, সেটা জাবেদ পাটোয়ারী বা তার মতো কারো পক্ষে লেখা খুবই দুরূহ। তবে এত বড় বিষয় নিয়ে যেহেতু অভিযোগ উঠেছে সেজন্য এটা নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। জাবেদ পাটোয়ারী লিখে দিয়েছেন নাকি উনিসহ ১২৩ জন সংকলনের দায়িত্বে ছিলেন সে বিষয়টিও আমার কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে যেকোনো সম্পাদনার দায়িত্বে একটা বড় গ্রুপ থাকতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘পাণ্ডুলিপিগুলো তো রয়েছে। সেগুলোর ফরেনসিক বা ক্যালিগ্রাফিক পরীক্ষা করানো যেতে পারে। এটা খুবই সহজ বিষয়। যেহেতু এত বড় একটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে সেজন্য সংশ্লিষ্টদের উচিত বিবিসি বা বিদেশী গণমাধ্যমের মতো অথেনটিসিটি নিয়ে কাজ করেন এমন কারো হাতে পাণ্ডুলিপিগুলো দেয়া।’

এমন গ্রন্থ যদি কাউকে দিয়ে লেখাতেই হয় তবে জাবেদ পাটোয়ারীকে দিয়ে কেন—এমন প্রশ্ন তুলে কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটা নিয়ে একটা ভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে। যে টাকার অংকটার কথা বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের একজন লেখককে এত টাকা দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর খাতা মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ নিজ চোখে দেখেছেন। শেখ মনি নিয়ে এসেছিলেন, তখন বাংলার বাণী সাপ্তাহিক কাগজ ছিল। তার ভাষ্য হচ্ছে, শেখ মনি পাণ্ডুলিপি নিয়ে এসেছিলেন কাজ করার জন্য। সম্পাদনা বিভিন্নজন করতে পারেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর জীবনের সঙ্গে বা কাজের সঙ্গে যারা পরিচিত তারা বলেছেন যে এটি তারই (শেখ মুজিবুর রহমান) লেখা। আমিও তাদের কথাই বিশ্বাস করি।’

জাবেদ পাটোয়ারী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জাবেদ পাটোয়ারী কোনো স্বীকৃত লেখক নন। কোনোদিন লেখক হিসেবে কেউ তাকে উল্লেখ করেছেন এমনটি দেখিনি বা শুনিনি। যদি শামসুজ্জামান খান, আনিসুজ্জামান, মুহম্মদ জাফর ইকবালের নাম বলা হতো, তা-ও কিছুটা গ্রহণযোগ্য হতো।’

ইতিহাসবিদ ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চারটি খাতা পেয়েছিলেন শেখ হাসিনা। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর হাতের লেখার প্রতিচিত্র আছে। “‍কারাগারের রোজনামচা”, “‍আমার দেখা নয়া চীন” এগুলো লিখল কারা? আমি এসব উদ্ভট দাবিকে অস্বীকার করছি।’

শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সংকলন গ্রন্থ ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’-এর সঙ্গে জাবেদ পাটোয়ারী যুক্ত ছিলেন। হাক্কানী পাবলিশার্স কর্তৃক ২০১৮ সালে প্রকাশিত ওই বইয়ের মুখবন্ধে শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘২০০৮ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০০৯ সালে সরকার গঠন করার পর এসবিকেই দায়িত্ব দিই এ ফাইলগুলো (ডকুমেন্টস) কম্পিউটারে টাইপ করে প্রকাশের ব্যবস্থা করতে এবং মূল ডকুমেন্ট স্ক্যান করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংগ্রহ করার জন্য। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এ কাজটা তারা সম্পন্ন করেছেন। একটা টিম দিন-রাত পরিশ্রম করেছে। এই টিমের নেতৃত্বে আছেন মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। দীর্ঘদিন একই পদে আমি তাকে রেখেছি। শুধু এই কাজটা সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার জন্য।’

আরও