অব্যাহত লোকসানে বগুড়ায় কমেছে আলুর আবাদ

বগুড়া জেলার অর্থকরী ফসলগুলোর মধ্যে আলু অন্যতম। পাকরি আলু সবজি হিসেবে বেশ জনপ্রিয় বগুড়া ও আশপাশের জেলায়।

কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, স্থানীয় ও উচ্চফলনশীল মিলে ৪৮টি জাতের আলুর আবাদ হয় বগুড়ায়। এর মধ্যে এবার সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে এস্টারিক্স (স্থানীয়ভাবে স্টিক নামে পরিচিত) নামে উচ্চফলনশীল জাতের আলু। তবে কৃষিপণ্যটির উচ্চফলন হলেও বাজারে সে অনুপাতে দাম মিলছে না। গত মৌসুমে লোকসানের পর চলতি বছরও লোকসানে পড়েছেন চাষীরা। অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন। এ অবস্থায় আলু আবাদ কমিয়ে দিয়েছেন কৃষক।

অবশ্য কৃষি বিভাগ বলছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৬ শতাংশ জমির আলু উত্তোলন করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর আবাদ কমলেও ফলনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।

বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে জেলায় ৫৫ হাজার ৬০ হেক্টর জমিতে ১১ লাখ ৯৯ হাজার ৯১০ টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। ওই বছর আবাদ হয়েছিল ৬০ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে, যা ছিল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫ হাজার ৩৭৫ হেক্টর বেশি। সর্বশেষ ফলন পাওয়া যায় প্রায় ১৩ লাখ ৩৫ হাজার ৭৭০ টন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আবাদি জমি ও ফলন দুটিই বেড়েছিল। চলতি অর্থবছরে চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৫৫ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে। সেখানে চাষ হয়েছে ৫৪ হাজার ৪৬৫ হেক্টরে। ১ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে আবাদ কম হয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্চ ফলনের কারণে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে। চলতি বছর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ৩৫ হাজার ৭৭০ টন। সেখানে ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৩৬ শতাংশ জমি থেকে আলু উত্তোলন করে পাওয়া গেছে প্রায় চার লাখ টন। প্রথমদিকে আলুর ফলন কম পাওয়া যায়। পরের দিকে ফলন বাড়ে। ফলন বৃদ্ধির ফলে বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় আলুর দাম কমে গিয়ে লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষক।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, নতুন মৌসুম শুরু হলেও এবার বাজারে স্বস্তির পরিবর্তে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা। সাধারণত বছরের এ সময়ে নতুন আলুর আগমনে বাজারে দাম কিছুটা ভালো থাকে। কিন্তু চলতি মৌসুমে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাজারে এখনো বিপুল পরিমাণ পুরনো আলুর মজুদ থাকায় নতুন আলুর দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষকদের ওপর। নতুন আলু পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৯-১২ টাকায়। এতে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে যাচ্ছেন চাষীরা।

বগুড়া সদর উপজেলার আশোকোলা গ্রামের মো. ফিরোজ বলেন, ‘গত বছর লোকসানের কারণে আলু বিক্রি করা যায়নি। বিঘাপ্রতি ১৮-২০ হাজার টাকা খরচ করে বিক্রি করার সময় অর্ধেকও ওঠেনি। এ বছরও একই অবস্থা। বাজারে আলুর দাম একেবারেই কম। দুই বছরে ঋণ করে চাষ করছি। এ বছর ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার টাকা।’

শহরের আলু ব্যবসায়ী মো. সাদেকুর রহমান বলেন, ‘গত বছর লাভের আশায় ১১ টাকা কেজি দরে আলু কিনে প্রায় ২০০ বস্তা হিমাগারে রাখা হয়। সব মিলিয়ে কেজিপ্রতি খরচ দাঁড়ায় ১৯-২০ টাকা। খোলাবাজারে সেই আলু বিক্রি হয়েছে ১৬-১৮ টাকা। লাভের পরিবর্তে আরো লোকসানে পড়তে হয়েছে। বর্তমানে খোলাবাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে ২০-২৫ টাকা কেজি।’

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে আগাম জাতের আলু উৎপাদনে কেজিপ্রতি খরচ পড়ছে প্রায় ১৪-১৬ টাকা। অথচ বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে প্রতি কেজি ৯-১২ টাকায়।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছর বিভিন্ন উপায়ে আলু সংরক্ষণ করা হলেও দাম আর বাড়েনি। আলু সংরক্ষণে হিমাগার রয়েছে জেলায় প্রায় ৪২টি। এসব হিমাগারে প্রায় সাড়ে চার লাখ টন আলু সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। গত বছরের প্রায় ৪০ শতাংশ আলু এখনো হিমাগারে রয়েছে। বিপুল পরিমাণে আলু হিমাগারে রেখেই চাষে নামেন চাষীরা। যেখানে সংরক্ষণের জায়গা সংকটের সঙ্গে সঙ্গে আলুর দামও আর বাড়েনি। ভালো ফলনের সঙ্গে ভালো দাম না পাওয়ায় আলুচাষীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।

সার্বিক বিষয়ে বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বগুড়া সদর, শিবগঞ্জ, সোনাতলা, কাহালুসহ বিভিন্ন উপজেলায় চাষীরা আলু উত্তোলন শুরু করেছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৬ শতাংশ জমির আলু উত্তোলন করা হয়েছে। আবাদ কমলেও যে পরিমাণ ফলন পাওয়া গেছে তাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে।’

আরও