উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা কয়েকদিনের ভারি বর্ষণে দেশের উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের পদ্মা অববাহিকায় আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত এক সপ্তাহে পদ্মা নদীর পানি অস্বাভাবিক গতিতে বৃদ্ধি পাওয়ায় প্লাবিত হয়েছে কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রধান এ নদীর পানি এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও প্রায় ছুঁইছুঁই অবস্থায় রয়েছে। আকস্মিক এ প্লাবনে নদী-তীরবর্তী চরাঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ফসলি জমি সম্পূর্ণ তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি চরের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
বানের পানিতে শত শত হেক্টর জমির রোপা আমন, আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ এবং সবজি খেত সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে, যা কৃষকদের চরম লোকসানের মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে চরাঞ্চলগুলোয় নতুন আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে বিষধর সাপের উপদ্রব। চারদিকে পানি উঠে যাওয়ায় সাপগুলো শুকনো জায়গা ও মানুষের বসতভিটায় আশ্রয় নিচ্ছে। রাসেলস ভাইপারসহ বিভিন্ন বিষধর সাপের ভয়ে দুর্গত এলাকার মানুষ চরম আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বন্যাকবলিত এলাকার স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম ও জরুরি ওষুধ মজুদ রাখার দাবি জানিয়েছেন।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (আজ) পর্যন্ত পদ্মার পানি সামান্য বাড়তে পারে। এরপর অববাহিকার উজান অংশে বৃষ্টিপাত কমলে পানি স্থিতিশীল হয়ে দ্রুত নামতে শুরু করবে, ফলে বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা কম। তবে পানি নেমে গেলে দেখা দিতে পারে নদীভাঙন।
কুষ্টিয়ার প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, জেলার দৌলতপুর উপজেলার নদীবেষ্টিত রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের প্রায় ৪০টি গ্রামের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ। তলিয়ে গেছে অধিকাংশ রাস্তাঘাট। কোথাও বাড়ির উঠান, কোথাও বসতঘরের চারপাশ, আবার কোথাও পুরো বাড়িই এখন পানির মধ্যে। স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক পরিবারের চলাচলের প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে ডিঙি ও ছোট নৌকা।
পানি ঢুকে পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দুই ইউনিয়নের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয়ভাবে সরাসরি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে এসব বিদ্যালয় ভবন বন্ধ করে দেয়া হয়নি; পানিবন্দি মানুষ প্রয়োজনে যাতে সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন, সে জন্য ভবনগুলো খোলা রাখা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। মাত্র এক সপ্তাহে নদীর পানি বেড়েছে প্রায় ৮৮ সেন্টিমিটার।
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে বৃহস্পতিবার বিকালে পদ্মার পানি বিপৎসীমার প্রায় ৯২ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। বর্তমানে নদীর পানি রয়েছে ১৩ মিটারের আশপাশে। বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পদ্মার পানি বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও অতিরিক্ত বৃষ্টি। স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্যেও উজানের পানির বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে স্থানীয়দের মধ্যে এ নিয়ে রয়েছে ভিন্ন আলোচনা। তাদের দাবি, ভারতের ফারাক্কা বাঁধ খুলে দেয়ার পর উজানের পানি ও বৃষ্টির পানি একসঙ্গে নেমে আসায় পদ্মার পানি দ্রুত বেড়েছে। এতে অল্প সময়ের মধ্যে নদীসংলগ্ন চর ও নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। যদিও ফারাক্কা বাঁধের পানি ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে কোনো তথ্য দেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মন্ডল বণিক বার্তাকে জানান, তার ইউনিয়নের ২০ থেকে ২৩টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মানুষের চলাচলের প্রধান অবলম্বন এখন ডিঙি ও ছোট নৌকা। বেশকিছু বাড়িঘর সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে। অধিকাংশ বাড়ির চারপাশে পানি উঠে গেছে। যেসব বাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে, সেসব পরিবারের সদস্যদের নৌকার মাধ্যমে তুলনামূলক নিরাপদ ও উঁচু এলাকায় নেয়া হচ্ছে।
চিলমারী ইউনিয়নের ১৯টি গ্রামের মধ্যে ১৭টির নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ। এরই মধ্যে ইউনিয়নের প্রায় সব রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্ধ রাখা হয়েছে ইউনিয়নের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মান্নান উদ্দিন বলেন, ‘ঢল যেভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী একদিনের মধ্যে আরো অনেক বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করতে পারে। এ বিষয়ে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গত মানুষের মাঝে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।’
পানি শুধু বসতভিটা ও সড়কেই থেমে নেই; এর প্রভাব পড়েছে কৃষিতেও। কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দুই ইউনিয়নে প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। এসব জমিতে থাকা আমন ধান, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি আরো বাড়লে কৃষি খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মুশতাক আহমেদ ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফারুক আহমেদ জানান, চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রাস্তাঘাটও ডুবে গেছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাদের স্কুলে আসা বন্ধ রেখেছে। তবে বিদ্যালয়ে সরাসরি পাঠদান বন্ধ থাকলেও শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানান তারা। একই সঙ্গে পানিবন্দি মানুষ যাতে প্রয়োজনে বিদ্যালয় ভবনে আশ্রয় নিতে পারে, সে সুযোগও রাখা হয়েছে।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসাউদ্দৌলা বলেন, ‘উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পদ্মার পানি বেড়েছে। প্রতি বছরই দৌলতপুরের রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিন ধরে পদ্মা নদীর পানিস্তর ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। সদর উপজেলার শাহজাহানপুর, আলাটুলি ও নারায়ণপুর ইউনিয়ন এবং শিবগঞ্জ উপজেলার পাঙ্কা, উজিরপুর ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হওয়ায় বহু বাসিন্দা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আতিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রায় ৩৬২ হেক্টর জমির আমন-আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ও সবজি পানিতে তলিয়ে গেছে।
অন্যদিকে, সদর ও শিবগঞ্জের প্রায় ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও জলমগ্ন হওয়ায় সেখানে সাময়িকভাবে ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আহসান হাবিব বলেন, জেলার তিনটি প্রধান নদী—পদ্মা, মহানন্দা ও পুনর্ভবার পানি আরো কিছুটা বাড়তে পারে। তবে কোনোটিরই বিপৎসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা নেই।
এদিকে রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল সকাল ৯টায় রাজশাহী পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৭ দশমিক ২০ মিটার। পানি বাড়তে থাকায় পদ্মার দক্ষিণ পাড়ের চরখিদিরপুর, খানপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলে বন্যার পানি ঢুকেছে। অনেক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেন, ‘পদ্মার পানি বাড়লেও রাজশাহী শহররক্ষা বাঁধ নিয়ে এখনো কোনো ঝুঁকি নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ড সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ঝুঁকি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
রাজশাহী শহরের পাশে পদ্মার ওপারে ভারত সীমান্তঘেঁষা চরখিদিরপুর ও খানপুরের বেশির ভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ ও মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন, সেসব এলাকায় জরুরি ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। বন্যার্তদের মধ্যে খাবারও বিতরণ করা হচ্ছে।