রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, ইউনিট-১-এ ফুয়েল লোডিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। এর মাধ্যমে দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হয়েছে। বাংলাদেশ পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পারমাণবিক বর্জ্য ও স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত যৌথ কনভেনশনে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি একটি নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পারমাণবিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে দেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
গতকাল অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। ভিয়েনায় আইএইএ সদর দপ্তরে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দ্রুত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্যে আইএইএ মহাপরিচালকের সহযোগিতা কামনা করেন প্রযুক্তিমন্ত্রী। একই সঙ্গে পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার সম্প্রসারণ, পারমাণবিক নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় হয়। ফকির মাহবুব আনাম পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে আইএইএ মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসির ভূমিকার জন্য তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশ ও আইএইএর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে পরমাণু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে বাংলাদেশের সক্ষমতা আরো শক্তিশালী করার বিষয়ে মতবিনিময় হয়।
মন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে আইএইএর কারিগরি সহযোগিতা কর্মসূচির মাধ্যমে স্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য, পানি ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে সুফল পেয়ে আসছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ২০২৬-৩২ মেয়াদের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) স্বাক্ষর করেছে, যা আগামী বছরগুলোয় প্রযুক্তিগত সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।’
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী বৈঠকে ‘রেস অব হোপ: ক্যান্সার কেয়ার ফর অল’ উদ্যোগকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে আইএইএ মহাপরিচালক ও আইএইএ সচিবালয়ের নেতৃত্বের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ২০২৫ সালে ‘‘রেস অব হোপ’’ উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে এবং এ অংশীদারত্বকে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর কর্মসূচিতে রূপ দিতে আইএইএর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। এর অন্যতম অগ্রাধিকার হলো একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ ক্যান্সার কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে আরো সমন্বিত, সহজলভ্য ও রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ‘সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্ঞান বিনিময় এবং টেকসই ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে আইএইএর কারিগরি সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি বাংলাদেশে ক্যান্সার চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণে ‘রেস অব হোপ’ উদ্যোগের আওতায় সহযোগিতা আরো জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী বলেন, ‘পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, খাদ্য ও কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণে কাজে লাগাতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘তরুণ গবেষক ও বিজ্ঞানীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের অগ্রাধিকার।’ শিক্ষার্থী, বিজ্ঞানী ও গবেষকদের জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, ফেলোশিপ এবং যৌথ গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণে আইএইএর মহাপরিচালকের প্রতি আহবান জানান মন্ত্রী।
মন্ত্রী শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির প্রসার, পারমাণবিক নিরাপত্তা জোরদার এবং টেকসই উন্নয়নে আইএইএর পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরো গভীর করার আহ্বান জানান। এ সময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন, ভিয়েনায় নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত তৌফিক হাসান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম মঈনুল ইসলাম এবং যুগ্ম সচিব শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।