রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে আগামী দিনে সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে যতটা কঠোর হওয়া যায় বিএনপি সরকার ততটাই কঠোর হবে। দেশে পুনরায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশবাসীর কাছে এটি আমার অঙ্গীকার। বিএনপির অঙ্গীকার।’
জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে গতকাল সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতারে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তারেক রহমান এসব কথা বলেন। তার এ ভাষণ বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনেও সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
তারেক রহমান বলেন, ‘প্রতিটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের কাছে রাষ্ট্র ও সরকারকে দায়বদ্ধ রাখার কোনো বিকল্প নেই। আপনাদের কাছে আমার অঙ্গীকারের কারণ আপনারাই বিএনপির সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।’
তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী আমলে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি তথাকথিত ডামি নির্বাচনে আমি আপনাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলাম, ৭ জানুয়ারি সারা দিন পরিবারকে সময় দেবেন। বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন। এবার দেশবাসীর প্রতি আমার আহ্বান, আপনাদের প্রতি আমার বিনীত আবেদন, ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দিন ধানের শীষে ভোট দিন। তারুণ্যের প্রথম ভোট ধানের শীষের জন্য হোক।’
তারেক রহমান বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারি আপনারা ধানের প্রার্থীদের দায়িত্ব নিন। ১৩ তারিখ থেকে আপনাদের নির্বাচিত এমপিরা আপনাদের দায়িত্ব নেবে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আপনাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে কিনা সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমি নেব। যদি আপনাদের সমর্থন পাই তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপির মূলমন্ত্র থাকবে মহানবী (সা.)-এর মহান আদর্শ—ন্যায়পরায়ণতা।’
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘মরহুমা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাফল্যযাত্রা অব্যাহত রাখতে আমি আমার দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বিএনপি রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘদিন থেকে হাতে-কলমে প্রস্তুতি নিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘২০০১ সালে যখন আপনাদের সমর্থনে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছিল আমি তখন সরকারের অংশ হইনি। তবে বিএনপির একজন কর্মী হিসেবে সারা দেশে প্রতিটি জেলা-উপজেলা, গ্রাম-নগর-বন্দরে ঘুরেছি। আপনাদের স্থানীয় সমস্যাগুলো সম্ভাবনাগুলো জানা-বোঝার চেষ্টা করেছি। পরিস্থিতির কারণে বিদেশে থাকতে বাধ্য হলেও হৃদয়-মন-সত্তাজুড়ে ছিল বাংলাদেশ, বাংলাদেশের জনগণ। আমি তাই বিদেশে অবস্থানকালেও দেশের প্রতিটি এলাকায় আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করি। দেশে ফিরেও আমি আবারো এ স্বল্প সময় যতটুকু সম্ভব আপনাদের কাছে ছুটে গিয়েছি। আমি আপনাদের ভালোবাসা পেয়েছি। বিএনপির প্রতি আপনাদের আবেগ ও ভালোবাসা উপলব্ধি করেছি।’
তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপির প্রতি আবারো আপনাদের ভালোবাসা প্রকাশের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি। আপনাদের সমর্থনে বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে। দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে সেই সময় কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো আমাদের অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল-ত্রুটি হয়েছে। সেজন্য আমি দেশবাসীর কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অর্জনগুলোকে অবলম্বন করে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনের জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে আবারো আমি আপনাদের সমর্থন চাই। আমি দেশ ও জনগণের জন্য আপনার ও আপনার পরিবারের সদস্যের জন্য যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি প্রতিটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ধানের শীষে আপনাদের সমর্থন এবং আপনাদের ভোট চাই।’
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘একটি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন অপরিহার্য। নাগরিককে দুর্বল রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে না। আমরা মনে করি, জনগণের পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে দেশের গণতন্ত্র, উন্নয়ন কিংবা বিকেন্দ্রীকরণ—কোনোটিই টেকসই হবে না।’
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে কালক্ষেপণ না করার ঘোষণা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘ক্ষমতায় যেতে পারলে প্রথম দিন থেকেই আমরা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করব। আমাদের লড়াই শুধু ক্ষমতার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের হাত থেকে মুক্ত করে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেয়াই মূল লক্ষ্য।’
তিনি অঙ্গীকার করেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান চলবে সংবিধান মোতাবেক। শাসকরা নিজেদের মালিক মনে করবে না, বরং জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করবে। তিনি বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে সরকারি পদ-পদবিকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দেয়া হয়েছে। আমরা এ সংস্কৃতির অবসান ঘটাব।’
অর্থনীতি নিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘দেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছে, তা রোধ ও ফিরিয়ে আনা গেলে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড ও বেকার ভাতা দেয়ার মতো জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য অর্থের কোনো সংকট হবে না। আমরা পাচার হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে এনে সাধারণ মানুষের পকেটে দিতে চাই।’ এছাড়া বেকারত্ব দূরীকরণ এবং মেধাবীদের মূল্যায়নকে প্রধান অগ্রাধিকার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পূর্বশর্ত হলো সরাসরি ভোটাধিকার। আমরা ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করব এবং স্থানীয় পরিষদের মাধ্যমে এ অধিকার তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেব। ক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দলের হাতে কুক্ষিগত থাকলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না।’
জুলাই অভ্যুত্থানসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘সব শহীদের আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। আমরা বিশ্বাস করি, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ দেশের প্রকৃত মালিকানা ফিরে পাবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ হলেও অতীতে ফ্যাসিস্ট সরকারগুলো জনগণের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। তাই এবার জনগণ নিজেদের প্রকৃত মালিকানা বুঝে নেয়ার সুযোগ পেয়েছে। গত ১৬ বছর এ দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন; এবারের ভোট সেই অধিকার পুনরুদ্ধারের ঐতিহাসিক সুযোগ।’
তারেক রহমান তার ভাষণে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দীর্ঘ সংগ্রামের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘গণতন্ত্রকামী মানুষের জীবনে আজকের এ শুভ সময় এমনি এমনি আসেনি। এর জন্য গত দেড় দশকে বিএনপিসহ সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে অসীম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে হাজার হাজার মানুষকে গুম ও খুন করা হয়েছে। “আয়নাঘর” নামক গোপন বন্দিশালাগুলো ছিল একেকটি জ্যান্ত কবরস্থান।’
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে তৎকালীন সরকারের নির্মমতা তুলে ধরে তিনি অভিযোগ করেন, ‘আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ। বাংলাদেশের জন্ম থেকে এ পর্যন্ত যত গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে যারা শহীদ হয়েছেন, আমি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং আহত ও তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।’
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৭৫-এর ৭ নভেম্বর, ৯০-এর গণআন্দোলন, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড কিংবা চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই অগণিত মানুষ অকাতরে জীবন দিয়েছেন। একটি মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে একটি পরিবারের সব আকাঙ্ক্ষা ও সম্ভাবনারও মৃত্যু ঘটে।’
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এ মানুষগুলো কেন জীবন দিয়েছিল? কী ছিল তাদের চাওয়া? কোনো কিছু দিয়েই প্রাণের এ প্রতিদান দেয়া সম্ভব নয়। তবে আমরা এ বিপুল প্রাণের বিসর্জনকে বৃথা যেতে দিতে পারি না। তাদের সেই স্বপ্ন পূরণের মাধ্যমেই আমাদের প্রকৃত ঋণ শোধ করতে হবে।’
তারেক রহমান দেশের সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে আমাদের সবার লক্ষ্য হবে জাতীয় ঐক্য এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।’ ভাষণের শেষে তিনি ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট দিয়ে গণতান্ত্রিক ধারাকে শক্তিশালী করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।