জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন ২০০৪ অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই অনুযায়ী গতকাল ত্রয়োদশ সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে ইসি।
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, সংসদে জয়ী দলগুলোর আসন সংখ্যার অনুপাতে নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৫০টি আসন বণ্টন করা হয়। ফলে প্রথাগতভাবে এবারো সরাসরি ভোট ছাড়াই সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর মনোনয়ন পাওয়া ৫০ জন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হবেন।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ২১ এপ্রিলের মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দেয়া যাবে; বাছাই চলবে ২২ ও ২৩ এপ্রিল। আর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৯ এপ্রিল । ভোট হবে ১২ মে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংরক্ষিত ৫০টি আসনের কোন দল থেকে কারা এমপি হবে সেটা জানা যাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন, অর্থাৎ ২৯ এপ্রিলের মধ্যে। এ নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের কোনো অংশগ্রহণ না থাকায় দলগুলো তাদের প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে প্রার্থী মনোনীত করে এবং তারা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংরক্ষিত মহিলা আসনে সরাসরি ভোট হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বা প্রায় নেই বললেই চলে। সাধারণত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের জন্য বরাদ্দকৃত আসনের সমসংখ্যক নারী সদস্যকে মনোনয়ন প্রদান করে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে বিএনপি ও তাদের সংসদীয় জোট শরিক গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও গণসংহতি আন্দোলন সংরক্ষিত আসনে এগিয়ে রয়েছে। হিসাব অনুযায়ী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ৩৫টি আসন পাওয়ার কথা থাকলেও সংসদের সরকারি দলকে অতিরিক্ত একটি আসন দেয়ার বিধান থাকায় তাদের আসন সংখ্যা বেড়ে ৩৬টি হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসি। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বিরোধী জোট জামায়াত-এনসিপি পেয়েছে ১৩টি আসন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জোট থেকে একটি সংরক্ষিত আসন যাবে।
চট্টগ্রাম-২, চট্টগ্রাম-৪, শেরপুর-৩ ও বগুড়া-৬ আসনের ফল সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনে কোনো পরিবর্তন আনবে না বলেও জানিয়েছেন ইসি কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের বিধান রয়েছে। তবে এ আসনগুলো জনগণের সরাসরি ভোটে নয়, বরং নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ভোটে পূরণ হয়। আবার সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে ফ্লোর ক্রসিংয়ের বিধান থাকায় কোনো এমপি দলীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিতে পারেন না। কোনো এমপি যদি তার দলের বিপরীতে ভোট দেন বা অন্য দলে যোগ দেন, তবে তার আসন শূন্য হয়ে যাবে। ফলে দলগুলো সাধারণত তাদের প্রাপ্য আসনের সমানসংখ্যক প্রার্থী মনোনয়ন দেয় এবং তারা প্রায়ই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এ কারণে এ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় জনগণের আগ্রহ থাকে না এবং নির্বাচিতরা অনেক সময় সংসদে কেবল ‘অলংকার’ হিসেবেই থাকেন বলে। ১৯৭২ সালে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রথমে ১৫টি আসন রাখা হলেও পরবর্তী সংশোধনীগুলোয় সংখ্যা বেড়ে ৫০ হয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এ নিয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘ফেমা’র প্রেসিডেন্ট মনিরা খান বলেন, ‘আমি সবসময়ই পরোক্ষ নির্বাচনের বিপক্ষে কাজ করে এসেছি। দলগুলো যখন নির্দিষ্টসংখ্যক প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়, তখন এমপিরা সে দলীয় তালিকার বাইরে কাউকে ভোট দিতে পারেন না। ফলে যোগ্য স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বা দল মনোনীত নয় এমন যোগ্য নারীদের সংসদে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।’
তিনি মনে করেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় কোনো দল যদি তাদের ৩০টি আসনের বিপরীতে ৫০ প্রার্থীকে মনোনয়ন দিত এবং সংসদ সদস্যরা ভোটের মাধ্যমে সেখান থেকে নির্দিষ্টসংখ্যক প্রার্থী নির্বাচন করতেন, তাহলে প্রক্রিয়াটি আরো গ্রহণযোগ্য হতো।
সংরক্ষিত আসনের এমপিরা সরাসরি নির্বাচিত এমপিদের মতো সমান সুযোগ-সুবিধা ও সাংবিধানিক মর্যাদা ভোগ করলেও সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তারা প্রায়ই ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর’ জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হন বলে মতপ্রকাশ করেছেন নির্বাচন ও গণতন্ত্রসংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলিমের মতে, সংবিধান অনুযায়ী যে পদ্ধতিতে ভোট হচ্ছে সেটি ‘সিঙ্গেল ট্রান্সফারেবল ভোট’ যেখানে বাস্তবে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট হয় না। নির্দিষ্ট কোনো নির্বাচনী এলাকা না থাকায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের প্রভাব থাকে নগণ্য।