শেষটা মধুর হলো না। হতাশা নিয়ে আঁখিজলে বিশ্বকাপকে বিদায় জানাতে হলো ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার ও পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে। নিজের শেষ বিশ্বকাপে মাত্র এক গোল করলেন ‘সিআর সেভেন’। ঘানার বিরুদ্ধে করা সে গোলেই ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিয়েছেন নিজের নাম। প্রথম ফুটবলার হিসেবে পাঁচ বিশ্বকাপে গোল করার নজির একমাত্র তারই। এর পরই শুরু বৈরী যাত্রা। কোচের সঙ্গে প্রকাশ্যে মতান্তর, ফর্ম হারানো, প্রথম একাদশ থেকে বাদ পড়া, সব মিলিয়ে শেষটা একেবারেই ভালো হলো না। কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর কাছে হেরে নক্ষত্রের পতন।
বিশ্বকাপ অধরা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বয়স ৩৭ বছর। শেষ বিশ্বকাপ অভিযান শুরুর আগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সমালোচনা করে বিতর্কের জন্ম, যার জেরে ক্লাব থেকে ছাঁটাই। বিশ্বকাপ চলাকালীন প্রধান কোচ ফার্নান্দো সান্তোসের সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে ফের বিতর্কে জড়ান। সে কারণে নক-আউট পর্বে সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম একাদশে অধিনায়ককে রাখেননি সান্তোস। সেদিন অবশ্য ৬-১ গোলে জয় এসেছিল। রোনালদোর অভাব গায়ে মাখেননি সতীর্থরা। তাই ‘ছোট্ট’ মরক্কোর বিপক্ষেও সিআর সেভেনকে সাইড বেঞ্চে বসিয়ে রাখার বিষয়ে দ্বিতীয়বার ভাবতে হয়নি কোচকে। গোল হজমের পর ৫১ মিনিটের মাথায় অবশ্য অধিনায়ককে মাঠে নামানো হয়। কিন্তু দাগ কাটতে পারেননি বিশ্বের অন্যতম সেরা এ ফুটবলার। একবার গোলের কাছাকাছি গেলেও সে প্রয়াস রুখে দেন প্রতিপক্ষের গোলকিপার। ১-০ গোলে পর্তুগালকে বিদায় সম্ভাষণ জানায় ইতিহাস গড়া আফ্রিকার দেশ মরক্কো। এদিন শেষ বাঁশি বাজার পর বাঁধ ভাঙে রোনালদোর চোখের জল। কাঁদতে কাঁদতেই মাঠ ছাড়েন পর্তুগালের বহু যুদ্ধের নায়ক। দেশকে ইউরো কাপ জেতালেও বিশ্বকাপ জেতাতে পারলেন না—এ হতাশা থাকবে সারা জীবনই।
নিজেকে যতই পেশাদারত্বের মোড়কে ঢেকে রাখা হোক না কেন, ফুটবল তো প্রচণ্ড আবেগের খেলা। আর বিশ্বকাপে ফুটবলাররা লড়াই করেন দেশের জন্য, বুকে পতাকা এঁকে। সে লড়াইয়ে দেশকে জেতাতে না পারলে চোখের বাঁধ ভাঙাটা স্বাভাবিক। রোনালদোর মতো মহাতারকা ট্র্যাজিক নায়ক হয়ে গেলে হতাশা আরো বাড়ে। সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরাই বিশ্বকাপ থেকে তার এমন বিদায়ে হতাশ।
১৭ থেকে ৭
রোনালদোর বিশ্বকাপ অভিষেক হয়েছিল জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে, অ্যাঙ্গোলার বিরুদ্ধে। তখন তিনি খেলতেন ১৭ নম্বর জার্সি পরে। প্রথম গোল করেন ইরানের বিপক্ষে। ২১ বছর ১৩২ দিনের মাথায় গোলটি করায় বিশ্বকাপে পর্তুগালের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হিসেবেও নাম লেখান। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচ গোলশূন্য থাকায় টাইব্রেকারে সেবার রোনালদোর শটই দলকে নিয়ে যায় সেমিফাইনালে। প্রথমে ফ্রান্স ও পরে জার্মানির কাছে হেরে সেবার চতুর্থ হয় পর্তুগাল। ১৭ নম্বর থেকে রোনালদোর জার্সি নম্বর ৭ হয় পরের বিশ্বকাপে। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত সেই আসরে তিনি দলকে নেতৃত্বও দেন। যদিও সেবারের চ্যাম্পিয়ন স্পেনের কাছে হেরেই বিদায় নিশ্চিত হয়েছিল পর্তুগালের। চারটি ম্যাচের একটিতেই কেবল গোল করেছিল তারা। দক্ষিণ কোরিয়াকে গোল-বন্যায় (৭-০) হারিয়েছিল। ওই ম্যাচে ষষ্ঠ গোলটি ছিল সিআর সেভেনের।
চোটের কারণে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপেও চেনা ছন্দে ছিলেন না রোনালদো। প্রথম ম্যাচে জার্মানির কাছে ০-৪ গোলে হারে তার দল। দ্বিতীয় ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র হয়। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ঘানার বিরুদ্ধে ২-১ গোলে জয় পায় পর্তুগাল। জয়সূচক গোলটি ছিল পর্তুগিজ তারকার। এ জয় সত্ত্বেও সেবার গ্রুপ পর্বের বাধা টপকাতে পারেনি পর্তুগাল। বিশ্বকাপে রোনালদোর স্মরণীয় ম্যাচ অবশ্য ২০১৮ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে। সেদিন ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সের ফুটবলার হিসেবে তিনি হ্যাটট্রিকের নজির গড়েন। ওইবার তার গোলেই ১-০ ব্যবধানে মরক্কো হেরেছিল। যদিও রাউন্ড অব সিক্সটিনে উরুগুয়ের কাছে ১-২ গোলে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল। এবার কোয়ার্টার ফাইনালে শেষ হলো রোনালদোর বিশ্বকাপ স্বপ্ন।
নকআউটের দুঃখ
পাঁচ বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে মোট আট ম্যাচ খেলেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। কিন্তু এর কোনো ম্যাচেই তিনি গোল করতে পারেননি। তার ৫৭০ মিনিটের এ খেলায় গোল লক্ষ্য করে ২৭টি শট নিয়েছেন। শেষ ম্যাচেও তিনি ফ্রি-কিক নিলেন, আক্রমণে উঠে বিপক্ষের বক্সেও পৌঁছে গেলেন। যদিও কিছু করতে পারলেন না। কাতার থেকে ফিরতে হলো একেবারে খালি হাতেই। উল্টো তাকে আর আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেখা যাবে কিনা, সেটা নিয়েই তৈরি হলো সংশয়।
গড়েছেন নজির
বিদায়ের দিনে রোনালদো খেলেছেন ১৯৬তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এর মাধ্যমে তিনি দেশের হয়ে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা কুয়েতের বাদের আল-মুতাওয়ার কীর্তিতে ভাগ বসান। পর্তুগালের হয়ে আর একটি ম্যাচ খেললেই এককভাবে সে নজির গড়বেন। বিশ্বকাপে রোনালদো খেলেছেন ২২টি ম্যাচ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বাধিক গোলেরও মালিক তিনি। ক্লাব ও দেশের হয়ে ৮০০-এর বেশি গোল করা একমাত্র ফুটবলার। পর্তুগালকে ২০১৬ সালে ইউরো ও ২০১৮-১৯ মৌসুমে উয়েফা নেশনস লিগ জিতিয়েছেন। মাঠের বাইরে থেকেও একজন খেলোয়াড় যে খেলতে পারেন, আবেগে-অনুপ্রেরণায় দলের জয়ের পথ তৈরি করে দিতে পারেন, ‘সিআর সেভেন’ সেটাও দেখিয়েছিলেন অনেকবার।
কথা ছিল শেষ বিশ্বকাপ তিনি ভরিয়ে দেবেন। দাপিয়ে বেড়াবেন মাঠজুড়ে। গোল উদযাপন করবেন নিজস্ব ভঙ্গিমায়। কারণ তিনি প্রমাণ করেছিলেন, ভাগ্যের দেখিয়ে দেয়া পথ নয়, বরং ভাগ্যই তাকে কুর্নিশ জানায়, যিনি পরিশ্রম করে নিজের ভাগ্য তৈরি করে নিতে জানেন। তার একটাই মন্ত্র—ম্যাজিক নয়, শক্তির সাধনায় অটুট প্রাচীর ভাঙার মধ্যেই আছে জীবনের সফলতা! আর সেই মন্ত্র মেনেই তিনি ফুটবল বিশ্বকে দেখিয়েছেন, রেকর্ডের পেছনে নয়, রেকর্ডই তার পেছনে ছুটেছে বারবার। জীবন যেমন মাধুর্যময়, তেমনি নিষ্ঠুরও। মহানায়কের মতো নয়, বরং একরাশ বিতর্ক, মাথায় কাঁটার মুকুট পরে বিদায়ের পথে হেঁটে গেলেন সিআর সেভেন।