মার্চেও বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি (আইপিপি) ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বকেয়া বিল পরিশোধে বিপিডিবিকে ২ হাজার ৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে দিয়েছে অর্থ বিভাগ। তবে এবার অর্থছাড়ে তারা বেশকিছু কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছে, ভর্তুকির অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমদানি বিদ্যুতের বিল যেমন পরিশোধ করা যাবে না, তেমনি আইপিপি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের (৯৪টি) বিল ব্যতীত অন্য কোনো ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধ করা যাবে না। পাশাপাশি যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন নেই, সেগুলোর জন্যও ভর্তুকির অর্থ ব্যবহার করা যাবে না। বিপুল বকেয়া পরিশোধের দায় এবং বিদ্যুতের উৎপাদন ও কেন্দ্রের জ্বালানি ঘাটতির মধ্যে ভর্তুকির টাকা ছাড়ে অর্থ বিভাগের এ ধরনের শর্তারোপ বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ ব্যবস্থাপনাকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলবে বলে মনে করছেন বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিপিডিবির কর্মকর্তারা।
এখন থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দেয়া ভর্তুকির অর্থ পেতে বিপিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ যৌক্তিক পর্যায়ে হ্রাস, বর্তমানে অনুমোদিত ট্যারিফ সমন্বয়, আইপিপি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের মাসভিত্তিক ক্ষতির আলাদা হিসাব এবং এসব কেন্দ্রের বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয়ে ভর্তুকির চাহিদার বিষয়ে আগামী মে মাস থেকে অর্থ বিভাগে আলাদা করে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেনের সই করা এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি গত সপ্তাহে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছে। বিপিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিমকে ওই চিঠির অনুলিপি দেয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতি মোকাবেলায় বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতি পরিশোধ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা ব্যবস্থাপনার আওতায় মার্চের জন্য ২ হাজার ৬৭ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে, যা ৮৫টি আইপিপি ও নয়টি ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য পরিশোধ করতে হবে। ওই চিঠিতে এ অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মোট ১৩টি শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন না থাকায় দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভর্তুকি অর্থ পাবে না। এছাড়া এ অর্থ আমদানি বিদ্যুতের বিল পরিশোধেও ব্যবহার করা যাবে না।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিপিডিবির কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঘাটতি থাকছে। এ ঘাটতির পরিমাণ এতটাই বেশি যে ভর্তুকি পাওয়ার পরও কেন্দ্রগুলোর বিপুল বিল বকেয়া জমে গেছে। সরকারি-বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগে নির্মিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের এ বকেয়ার পরিমাণ ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে বিপিডিবির রাজস্ব আয় ও প্রতি মাসে অর্থ বিভাগ থেকে যে টাকা ছাড় করা হয়, তা দিয়ে বিভিন্ন বিদ্যুৎ কোম্পানির বিল সমন্বয় করে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা হয়। এখন বিপুল বকেয়ার মধ্যে ভর্তুকি ছাড়ে অর্থ বিভাগের এমন শর্ত পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলবে। এমনকি ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিল পরিশোধে জটিলতা বাড়বে। তাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও জানান তারা।
দেশে ভারত থেকে আমদানি বিদ্যুৎ চুক্তি রয়েছে ২ হাজার ৭৬০ মেগাওয়াটের (আদানি)। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত আমদানি বিদ্যুতের বিল বকেয়া ৩ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। যার মধ্যে বড় অংশ আদানি পাওয়ারের। এরই মধ্যে বকেয়া বিল পরিশোধে বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিপিডিবিকে চিঠি দিয়েছে আদানি। এমনকি বকেয়া পরিশোধ করা না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার কথাও বলা হয়েছে চিঠিতে।
বিপিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, ভর্তুকি ও বিপিডিবির রাজস্ব আয় থেকে যে অর্থ পাওয়া যায় তা বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানিগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা হয়। অর্থ বিভাগের এ শর্তের কারণে আমদানি বিদ্যুতের বিল পরিশোধ বন্ধ হয়ে যাবে। এতে বকেয়া বিলের যতটুকু সমন্বয় করা হতো সেটিও এখন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে শেরপুরের বিআর পাওয়ার জেনের ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পটুয়াখালীতে চীনা অর্থায়নে নির্মিত আরপিসিএল ও নরিনকো পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি লিমিটেড বা আরএনপিএলের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে এরই মধ্যে জানানো হয়েছে আরএনপিএলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহে পুরোদমে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে। বর্তমানে একটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ নিচ্ছে বিপিডিবি। এ কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ কেনা বাবদ বিপিডিবির প্রতি মাসে বড় অংকের বিল জমা হচ্ছে। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদন না থাকায় ভর্তুকির অর্থ দিয়ে কেন্দ্রটির বিল পরিশোধ করা যাবে না বলে শর্ত দিয়েছে অর্থ বিভাগ।
প্রতি মাসে অর্থ বিভাগ যে টাকা ছাড় করছে তা দিয়ে যে কোম্পানিগুলোর বিল পরিশোধ করা হবে তার বিবরণী পরবর্তী মাসের ভর্তুকি প্রস্তাবের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ভর্তুকি হিসাব করার সুবিধার্থে আইপিপি, আরপিপি থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয়ে পার্থক্যজনিত ক্ষতি, বিপিডিবির মিশ্র জ্বালানি ব্যবহার, কম ট্যারিফের কারণে পাইকারি বিদ্যুৎ বিক্রিতে ক্ষতির বিষয়গুলো প্রতিবেদন আকারে অর্থ বিভাগে জমা দিতে হবে।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভর্তুকির টাকা ছাড়ে অর্থ বিভাগ থেকে এ ধরনের শর্ত আগে কখনো পায়নি বিদ্যুৎ বিভাগ। যেখানে জ্বালানি আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে ভর্তুকি বৃদ্ধির কথা অর্থ বিভাগকে বলা হয়েছে, তার বিপরীতে অর্থছাড়ে এ ধরনের শর্ত বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।’
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের শর্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলবে। দেশের বিদ্যুতের তীব্র চাহিদার সময়ে অর্থ বিভাগের এ ধরনের শর্ত পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন। ভর্তুকি ও বিপিডিবির রাজস্ব দিয়ে প্রতি মাসে যে পরিমাণ অর্থ পাওয়া যায় তা দিয়ে কেন্দ্রগুলোকে ম্যানেজ করতে হয়। সাধারণত আমরা প্রতি মাসে ১২-১৫ তারিখের মধ্যে বিদ্যুৎ বিলের অর্থ পরিশোধ করি। যে অর্থ পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে তেল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাকি কেন্দ্রগুলোর অর্থ অল্প ও সীমিত আকারে পরিশোধ করে কেন্দ্র চালু রাখার চেষ্টা করছি। এ ধরনের শর্ত মেনে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা কঠিন। আমরা বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানাব।’
চলতি অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি রাখা হয়েছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। প্রতি মাসে কম-বেশি ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড় করে অর্থ বিভাগ। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ২৬ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। এ অর্থের সঙ্গে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত আরো ২ হাজার কোটি টাকা করে ভর্তুকি চেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। চলতি অর্থবছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত মাসে অতিরিক্ত ২ হাজার কোটি টাকা বেশি দিলে অর্থবছরে ভর্তুকি বেড়ে দাঁড়াবে মোট ৪৫ হাজার কোটি টাকা। যদিও এ অর্থ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ভর্তুকির তুলনায় অন্তত ১৭ হাজার কোটি টাকা কম।
দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করছে পেট্রোবাংলা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে প্রায় দ্বিগুণ ব্যয়ে আমদানীকৃত এই এলএনজির বড় অংশ ব্যবহার হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এছাড়া ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলও কেনা হচ্ছে চড়া দামে। এসব জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে ভর্তুকির টাকা পেতে অর্থ বিভাগের কঠিন শর্তের বিষয়টি বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে বিদ্যুৎ খাতে। যদিও টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অসুবিধা না হওয়ার কথা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
ভর্তুকির টাকা ছাড়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের শর্তের বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টাকা ছাড়ের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের কিছু শর্ত থাকে। তবুও তো তারা অর্থ দেয়। এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ (মন্ত্রণালয়) ব্যাপার। বিষয়টি নিয়ে আমরা কথা বলেছি। আশা করি বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বিষয়টি নিয়ে কোনো অসুবিধা হবে না।’