চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চল। জমির টপ সয়েল (উপরিভাগের মাটি) কেটে নেয়া, জমির শ্রেণী পরিবর্তন এবং নগরায়ণে অঞ্চলটিতে প্রায় দেড় দশকে কমেছে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ। তবে কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আমন উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দেয়নি। বরং উৎপাদন বেড়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরে যেখানে ৫ লাখ ৮০ হাজার ৯২৩ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছিল, সেখানে চলতি অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৭৪ হাজার ৭২৪ হেক্টরে। বিপরীতে একই সময়ে চাল উৎপাদন ১৪ লাখ ৫০ হাজার টন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ লাখ ৩১ হাজার টনে। অর্থাৎ ১৫ বছরে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর আবাদযোগ্য জমি হারানোর মধ্যেই উৎপাদন বেড়েছে প্রায় তিন লাখ টন।
অবশ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কারণে উন্নত জাতের ধান, সেচ ও সার ব্যবস্থাপনার উন্নতি ফলন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখলেও নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও জমির ব্যবহার পরিবর্তনের কারণে কৃষিজমি সুরক্ষার প্রশ্ন আরো জোরালো হয়ে উঠছে। কৃষিজমি সুরক্ষা ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে নীতিগত উদ্যোগ জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন তারা।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, কৃষি অঞ্চলটিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো উৎপাদন ছাড়াল ১৭ লাখ ৩০ হাজার টন। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৬ লাখ ৫৭ হাজার ৮৯২ টন চাল উৎপাদনের রেকর্ড ছিল। গত অর্থবছরে এ অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ২৩ শতাংশ জমির আমন ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এতে উৎপাদন নেমে আসে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৮২৫ টনে।
কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কৃষি অঞ্চলটিতে আবাদি জমির পরিমাণ সামান্য ওঠানামা করেছে, কিন্তু চালের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে যেখানে প্রায় ৫ লাখ ৮০ হাজার ৯২৩ হেক্টর জমিতে ১৪ লাখ ৩১ হাজার ৭৮৬ টন চাল উৎপাদন হয়েছিল, সেখানে চলতি অর্থবছরে আবাদি জমি কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৭৪ হাজার ৭২৪ হেক্টর। তবে আমন উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৩০ হাজার ৯৮৯ টনে।
সর্বশেষ পাঁচ বছরের হিসাবে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ অঞ্চলে বন্যার কারণে ২৩ শতাংশ জমির ফসল নষ্ট হওয়ায় চূড়ান্ত আবাদ হয় ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৬৫৮ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয় ১২ লাখ ৭০ হাজার ৮৩৫ টন চাল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩৯৩ হেক্টর জমি আবাদ করে চাল উৎপাদন হয় ১৬ লাখ ৫৭ হাজার ৮৯২ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৭৪২ হেক্টর জমিতে চাল উৎপাদন হয় ১৬ লাখ ১ হাজার ৭৮৪ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩০ হেক্টর জমি আবাদ করে চাল উৎপাদন হয় ১৬ লাখ ১৯ হাজার ২৯০ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে আমন আবাদ হয় ৫ লাখ ৭১ হাজার ৪১৩ হেক্টর জমিতে। চাল উৎপাদন হয় ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৭১৫ টন।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত চট্টগ্রামের কৃষকরা উন্নত জাত, প্রযুক্তি ও নিবিড় চাষাবাদ ব্যবস্থার মাধ্যমে আবাদি জমি কমে যাওয়ার মধ্যেও উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে জমির সংকোচন, নগরায়ণ ও আবাসন, চাষাবাদে অনীহা থাকায় জমির পরিমাণ বাড়েনি। আমন উৎপাদন বাড়ার পেছনে উন্নত জাত ও প্রযুক্তির ভূমিকা থাকলেও কৃষিজমি সুরক্ষায় নীতিগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশের মোট চাল উৎপাদনের বড় একটি অংশ আমন মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় জমি সংকোচন ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (চট্টগ্রাম অঞ্চল) অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বা পার্বত্য চট্টগ্রাম কৃষি উৎপাদনের জন্য দেশের উত্তরবঙ্গের মতো এতটা জনপ্রিয় নয়। অন্যান্য অঞ্চলে যখন ধান আবাদ শেষ হয় তখন এ অঞ্চলে চারা রোপণ শুরু হয়। লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীতে জমি থেকে পানি দেরিতে নামে। এ কারণে আমন আবাদের জমি গত দেড়-দুই দশক ধরে প্রায় একই অবস্থায় রয়েছে। তবে বেশকিছু পতিত জমি আছে এ কৃষি অঞ্চলে, যেগুলো চাষাবাদ হয় না। সেই জমিগুলো আগামী মৌসুমে চাষাবাদের আওতায় আনতে কাজ শুরু করেছি। নতুন করে যাতে আরো ৩০-৫০ হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদ বাড়ানো যায়, সেটি নিয়ে কাজ শুরু করেছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘শুধু আমন নয়, আউশ, বোরো ও সবজি উৎপাদনে এ অঞ্চলের অনাবাদি জমিগুলো যাতে আবাদের আওতায় আনা যায়, সেজন্য মাঠ পর্যায়ে আমরা কাজ করব। এ অঞ্চলকে কৃষি জোন করে তোলার চেষ্টা থাকবে। তবে এ অঞ্চলের মানুষ হয় প্রবাস নয়তো ব্যবসাকে প্রাধান্য দেয়। এ কারণে আবাদে আগ্রহ কম। জনসংখ্যা বাড়ছে, কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি বাড়ছে। সে কারণে চাষাবাদ বাড়ানো এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে অনাবাদি জমিকে আবাদযোগ্য করে তোলার কোনো বিকল্প নেই।’
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে আবাদযোগ্য জমি কমে আসার কারণে নিবিড়তা বাড়ানোই উৎপাদন বৃদ্ধির বড় কৌশল হয়ে উঠেছে। একই জমিতে একাধিক ফসল আবাদ, সময়মতো রোপণ ও উন্নত জাত ব্যবহারের মাধ্যমে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। তবে মাঠপর্যায়ে সেচ সুবিধা, শ্রম সংকট ও জলবায়ুজনিত অনিশ্চয়তার কারণে সব এলাকায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিবিড়তা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। কৃষিজমির নিবিড়তা বাড়ানোর উদ্যোগের সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা ও সহায়তা না থাকলে উৎপাদনের বর্তমান ধারা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
পরিসংখ্যান বলছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ফসলের নিবিড়তা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২০২ শতাংশ হলেও সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ১৯৭ শতাংশে। অন্যদিকে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ১ লাখ ২৯ হাজার ৬৪১ হেক্টর জমিতে বছরে তিনবার ফসল আবাদ হতো। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫ হেক্টরে। তবে উপকূল অঞ্চলে চর জেগে ওঠা, জমিতে লবণাক্ততার প্রভাব বেড়ে যাওয়া, দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে দেরিতে ফসল আবাদ, কৃষিজমিতে আবাসন গড়ে ওঠা, টপ সয়েল কেটে নেয়ার কারণে কমেছে তিন ফসলি জমি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তিন ফসলি জমির পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৯১৩ হেক্টর। অর্থাৎ ২০০৫-০৬ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত টানা ১৩ বছর তিন ফসলি জমিতে উৎপাদন বাড়লেও শেষ পাঁচ বছরে কমেছে প্রায় ৪১ হাজার হেক্টরের বেশি।