বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) সমন্বিত মনিটরিং ও মোবাইল কোর্টের ২০২২-২৬ সালের ৩০টি অভিযানের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে এসব অভিযানে বিএফএসএর সঙ্গে অংশ নেয় বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর ধানমন্ডির একটি সুপারশপে প্রায় দুই কেজি অসুস্থ গরুর কলিজা পাওয়া যায়। একই অভিযানে অপরিষ্কার পরিবেশে মুরগির গিলা ও কলিজা সংরক্ষণ, কসাইখানা নোংরা রাখা এবং মাংস প্রক্রিয়াকরণে স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রমাণ মেলে। এছাড়া কর্মীদের মাস্ক, অ্যাপ্রন ও হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার না করার বিষয়টিও ধরা পড়ে। তবে প্রতিষ্ঠানটিকে তাৎক্ষণিক জরিমানা না করে ত্রুটি সংশোধনে ৩০ দিনের সময় দেয়া হয়। পরে সন্তোষজনক অগ্রগতি পাওয়ায় কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পাশাপাশি ৬০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে খাদ্যনিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
চলতি বছরের এপ্রিলে ফার্মগেটের একটি সুপারশপে লেবেল ছাড়াই ফল ও কাঁচা মাছ বিক্রি করতে দেখা যায়। সেখানে অন্যান্য খাবারের সঙ্গে একই ফ্রিজে কাঁচা মাংস সংরক্ষণের প্রমাণও মেলে, যা ক্রস-কন্টামিনেশনের ঝুঁকি তৈরি করছিল। অনিয়মটি নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর ৩৮ ধারা অনুযায়ী মামলাযোগ্য হলেও প্রতিষ্ঠানটির ব্যাখ্যা সন্তোষজনক বিবেচিত হওয়ায় মামলা করা হয়নি।
ফেব্রুয়ারিতে মগবাজারের একটি সুপারশপে অপরিষ্কার অবস্থায় গরুর পায়া সংরক্ষণ এবং অন্য একটি সুপারশপে যথাযথ লেবেল ছাড়াই গোলাপজল ও কেওড়ার জল বিক্রির প্রমাণ পাওয়া যায়। এর আগে জানুয়ারিতে ধানমন্ডির আরেকটি সুপারশপে কালো হয়ে যাওয়া নষ্ট গরুর মগজ পাওয়া যায়। সেখানে একই স্থানে মাংস কাটা ও সংরক্ষণসহ আরো কয়েকটি অনিয়মও শনাক্ত হয়।
তবে ঢাকার কাঁচাবাজারগুলোয় আরো গুরুতর অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। গত ২৮ জুলাই মিরপুর-১-এর শাহ আলী কাঁচাবাজার থেকে প্রায় ৪০ কেজি জেলিযুক্ত চিংড়ি ও অসুস্থ খাসির পচা কলিজা জব্দ করে ধ্বংস করা হয়। খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগ বাজারে প্রায় ৩৫ কেজি পোয়া মাছে রাসায়নিক রঞ্জকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়।
একই বাজারে মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করা এবং বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স ছাড়াই ঘি ও নুডলসসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রির অনিয়মও ধরা পড়ে।
নিউমার্কেটের বনলতা কাঁচাবাজারে রঙ মেশানো মুগডাল এবং বিএসটিআইয়ের লেবেলবিহীন গুড় ও মুড়ি বিক্রির প্রমাণ পাওয়া যায়। মাছ ও মাংসের উৎস-সংক্রান্ত ক্রয় চালান বা রসিদ দেখাতে না পারায় জিয়া এন্টারপ্রাইজ ও একটি মাছের দোকানকে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। কচুক্ষেত বাজারেও জেলিযুক্ত চিংড়ির পাশাপাশি বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স ছাড়াই চানাচুর, গুড়, ঘি ও নুডলসসহ বিভিন্ন অননুমোদিত খাদ্যপণ্য বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঠামোগত ও পরিবেশগত সীমাবদ্ধতার কারণে খোলা কাঁচাবাজারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যপণ্য বিক্রি হচ্ছে। এতে বাড়ছে ক্রস-কন্টামিনেশনের ঝুঁকি। অন্যদিকে বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার কারণে সুপারশপকে নিরাপদ মনে করা হলেও সেখানেও যথাযথ তাপমাত্রায় পণ্য সংরক্ষণ না করা, ফ্রিজের কার্যকারিতা তদারকিতে ঘাটতি, কর্মীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি না মানা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির মতো অনিয়ম রয়েছে। এসব অনিয়ম জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) ড. মোহাম্মদ শোয়েব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সুপারশপে দুধ ও দইয়ের জন্য নির্ধারিত প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং মাছ-মাংস সংরক্ষণের উপযোগী তাপমাত্রা সবসময় বজায় রাখা হয় না। ফ্রিজের কার্যকারিতা তদারকিতে লগবুক ব্যবহার না করা, কর্মীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধির ঘাটতি, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য এবং অধিক মুনাফার আশায় অননুমোদিত ক্ষতিকর রাসায়নিক ও প্রিজারভেটিভ ব্যবহারও বড় সমস্যা।’
অনুমোদিত উপাদানের পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য দীর্ঘদিন ভালো রাখতে অননুমোদিত ক্ষতিকর রাসায়নিক ও রঙ ব্যবহার অত্যন্ত উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অধিক মুনাফার জন্য এ ধরনের উপাদান ব্যবহার শুধু ভোক্তাদের জন্য নয়, ব্যবসায়ীদের নিজেদের পরিবারের সদস্যদের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।’
বিএফএসএর কর্মকর্তারা জানান, সমন্বিত অভিযানে অনিয়ম ধরা পড়লে সব ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক জরিমানা বা মামলা করা হয় না। ত্রুটির ধরন ও মাত্রা বিবেচনায় সংশোধনের জন্য সাতদিন, ১০ দিন বা এক মাসের সময় দেয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ত্রুটি সংশোধন না হলে কিংবা গুরুতর অনিয়ম অব্যাহত থাকলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়। ফলে এসব অভিযানের লক্ষ্য শুধু জরিমানা আদায় নয়, খাদ্য ব্যবসায়ীদের নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য করা এবং দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (আইন ও নীতি) এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘অনেকে মনে করেন সুপারশপে বেশি খরচ করলে বা এসি পরিবেশ থাকলে হয়তো ভালো পণ্য পাওয়া যাবে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কাঁচাবাজারের পাশাপাশি সুপারশপের পণ্যগুলোতেও অনিয়ম ও ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া যাচ্ছে। তবে সুপারশপগুলো দিনে দিনে সচেতন হচ্ছে তাদের নিজেদের বিক্রির স্বার্থেই, বাইরের কাঁচাবাজার নিয়ন্ত্রণ করা দুষ্কর।’
যেখানে র্যাপিড টেস্টের সুযোগ রয়েছে, সেখানে মোবাইল ল্যাবরেটরি ভ্যান নিয়ে যাওয়া হয় জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে গভীর পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। যেমন কিছুদিন আগেই চিংড়ি মাছে জেলি পুশ করার দায়ে সমন্বিত অভিযানে মৎস্য কর্মকর্তার উপস্থিতিতে জরিমানা ও চিংড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। আমদানীকৃত নিষিদ্ধ রাসায়নিক বা ক্ষতিকর উপাদান সরাসরি ধরা পড়লে আমরা কাউকে ছাড় দিই না। আইসিডিডিআর,বি, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এবং এফএওর অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার ডেটা ডিসেমিনেশনের মাধ্যমে আমরা অংশীজনদের সচেতন করছি। পাশাপাশি দেশের ৬৪টি জেলা থেকে স্যাম্পল সংগ্রহ করে তা নিয়মিত পরীক্ষা ও আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’