সরকারি হাসপাতালের ৮৪ শতাংশের বেশিই ডেঙ্গুর তথ্য দেয় না স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে

আক্রান্ত ও মৃত্যুর সরকারি পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট সরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৬১৯টি। এর মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৪৯২টি, জেলা হাসপাতাল ৬১টি, সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ৩৮টি এবং বিশেষায়িত ২৮টি।

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে, দীর্ঘ হচ্ছে হাসপাতালে রোগী ভর্তি ও প্রাণহানির তালিকা। পরিস্থিতি মোকাবেলায় আক্রান্ত ও মৃতের সঠিক পরিসংখ্যান যখন সবচেয়ে জরুরি, তখন দেশের ৮৪ শতাংশের বেশি সরকারি হাসপাতাল থেকেই ডেঙ্গু রোগীর কোনো তথ্য পাচ্ছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ফলে সরকারিভাবে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেশের সংক্রমণ ও মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, তথ্যের এ ঘাটতি ডেঙ্গুর হটস্পট শনাক্ত, চিকিৎসাসেবার প্রস্তুতি ও রোগ নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণকে আরো জটিল করে তুলবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট সরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৬১৯টি। এর মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৪৯২টি, জেলা হাসপাতাল ৬১টি, সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ৩৮টি এবং বিশেষায়িত ২৮টি। এর মধ্যে কেবল ৯৭টি হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু রোগীর তথ্য পাচ্ছে অধিদপ্তর। বাকি ৫২২টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো তথ্যই আসছে না। অর্থাৎ মাত্র ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ সরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গুর তথ্য সরবরাহ করছে। বিপরীতে প্রায় ৮৪ দশমিক ৩ শতাংশ হাসপাতালের তথ্যই অধিদপ্তরের হিসাবে অনুপস্থিত।

সারা দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে রোগীরা ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিলেও তাদের সবার তথ্য কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুরের মতে, ডেঙ্গুর তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গুর তথ্যের স্বচ্ছতার ব্যাপারে কমিটেড না। ফলে কে তথ্য পাঠাল আর কে পাঠাল না, এ ব্যাপারে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। বরং তথ্য কম পেলে কম দেখানো যায়। বিপুলসংখ্যক হাসপাতাল ডেঙ্গুর তথ্য পাঠাচ্ছে না, এজন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একবারও কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় না। কাউকে তিরস্কারও করে না, শাস্তি তো দূরের কথা। এ থেকে বোঝা যায়, তারা দায়সারাভাবে ডেঙ্গুর তথ্য প্রকাশ করছে। কিংবা ইচ্ছে করে তথ্য লুকাচ্ছে।’

প্রায় দিনেই দেখা যায়, ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হলেও সে তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে থাকছে না। ফলে অধিদপ্তরের প্রকাশিত আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দিয়ে দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি মূল্যায়ন নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।

রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, ঢাকার অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এরই মধ্যে ডেঙ্গু ও ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, ভর্তি হয়েছে (প্রতিদিন) ৯০০ থেকে ১ হাজার। মারা গেছে পাঁচ-সাতজন। প্রকৃত তথ্য উঠে না এলে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি আমরা যারা বেসরকারিভাবে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছি, আমাদেরও হিমশিম খেতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘গত কয়েকদিন আগে শিরায় দেয়ার স্যালাইন পাওয়া যাচ্ছিল না। ডেঙ্গু রোগী কত বাড়লে অবস্থা এমন হতে পারে, চিন্তা করা যায়! কিন্তু সরকারি তথ্যে সে ধরনের সংকট আমরা দেখতে পাইনি। এমন চিত্র সার্বিক স্বাস্থ্য খাতের জন্য ইতিবাচক নয় বলে মনে করি।’

অধিদপ্তরে তথ্য পাঠানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতাল হিসেবে আমরা প্রতিদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ডেঙ্গু ও হামের তথ্য পাঠাচ্ছি। সেখানে সরকারি হাসপাতালগুলো যদি রিপোর্ট না করে, এটা দুঃখজনক।’

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি অক্টোবরের প্রথম নয় দিনে প্রাণ হারিয়েছে ৫০ জন। আর চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট ২৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এখন পর্যন্ত। নতুন করে, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৩০০ ডেঙ্গু রোগী। এ নিয়ে চলতি বছরে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার ৪৫১।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ডেঙ্গু-সংক্রান্ত ড্যাশবোর্ডে প্রকাশিত মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরের শুরুতে ডেঙ্গুতে প্রাণহানি তুলনামূলক কম থাকলেও বর্ষা মৌসুমের পর তা দ্রুত বেড়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে মারা যান। মার্চ ও এপ্রিলে কোনো মৃত্যু হয়নি। মে মাসে একজন ও জুনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়। এরপর জুলাইয়ে ৩৬ ও আগস্টে ৪৩ জন প্রাণ হারায় ডেঙ্গুতে। সেপ্টেম্বরে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৮-এ। চলতি অক্টোবরের প্রথম নয় দিনেই মারা গেছে ৫০ জন। এর মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ ১০ জনের মৃত্যু হয় গত ৬ অক্টোবর।

বিভাগ ও এলাকাভিত্তিক হিসাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৮০ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ৩৫ জন এবং দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া খুলনায় ৬০ জন, চট্টগ্রাম ও বরিশালে ২৫ জন করে, ময়মনসিংহে ২৩, রাজশাহীতে ২১, রংপুরে ছয় ও সিলেটে চলতি বছর তিনজন মারা গেছেন ডেঙ্গুতে। যদিও এ পরিসংখ্যান কেবল সরকারি ৯৭টি ও বেসরকারি বড় কয়েকটি হাসপাতাল থেকে পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে। দেশের সিংহভাগ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকেই তথ্য পাঠানো হয় না।

ডেঙ্গু রোগীর তথ্য সরবরাহ না করা আইনত অপরাধ বলে মন্তব্য করেন কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে দেখেছি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আর হাসপাতালের তথ্যের মধ্যে বিস্তর গরমিল। এবার দেখছি, ৮৪ শতাংশের বেশি সরকারি হাসপাতালই ডেঙ্গুর তথ্য দেয় না। অথচ সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ডেঙ্গুর তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো বাধ্যতামূলক। যারা এ তথ্য জানাচ্ছে না, তারা অপরাধ করছে। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে দায়িত্বে অবহেলা করছে।’

ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠবে বলে জানান মশা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে আসা ড. কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, ‘ক্রমেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে সঠিক তথ্য খুবই প্রয়োজন। বিশেষ করে ডেঙ্গুর হটস্পট নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সঠিক পরিসংখ্যানের বিকল্প নেই।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত দুই মাসে প্রকাশিত ডেঙ্গু-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশির ভাগ দিনই একই সংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি দেখানো হয়েছে। আবার প্রতি শুক্র ও শনিবার মৃতের সংখ্যা শূন্য বা এক-দুজন দেখানো হচ্ছে। অথচ বিভিন্ন জেলা প্রতিনিধির মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে এসব পরিসংখ্যানের ব্যাপক অমিল পাওয়া যায়।

সব সরকারি হাসপাতাল কেন ডেঙ্গুর তথ্য দিচ্ছে না, সে বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অ্যান্ড অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ডা. ইসমত আরা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সারা দেশ থেকে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ডেঙ্গু-সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করেন। ফলে তথ্যে কিছু বাদ যাওয়া বা ভুল হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালভিত্তিক নিয়মিত প্রতিবেদন নিশ্চিত করা, তথ্য না পাঠানোর কারণ অনুসন্ধান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালের রোগী শনাক্ত, ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য সমন্বিতভাবে সংগ্রহ করতে না পারলে ডেঙ্গু মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ ও সম্পদের সঠিক বণ্টন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন তারা।

তবে ডেঙ্গু-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশে ভুল বা তথ্য বাদ পড়ার আশঙ্কা কম বলে দাবি করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ডা. ইসমত আরা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সারা দেশ থেকে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ডেঙ্গু-সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করেন। ফলে তথ্যে কিছু বাদ যাওয়া বা ভুল হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম।’ যদিও ৬১৯টি সরকারি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ৯৭টি থেকে ডেঙ্গুর তথ্য পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।

আরও