আরো বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করছে সরকার, যা প্রশাসনের ভেতরে কিছুটা উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ও আতঙ্কও তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আইন অনুযায়ী সরকার বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাতে পারে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যথাযথ মূল্যায়ন ও প্রক্রিয়াগত সতর্কতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একসঙ্গে অনেক কর্মকর্তার বিষয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হলে প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যেও কিছুটা দ্বিধা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সতর্কতা তৈরি হতে পারে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে পতিত আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত) সরকারের আমলে প্রশাসন পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব এবং কিছু কর্মকর্তার রাষ্ট্রের প্রতি পেশাগত দায়বদ্ধতার পরিবর্তে নির্দিষ্ট দলের প্রতি আনুগত্যও দায়ী। অতীতের রাজনৈতিক প্রভাব ও আমলাতান্ত্রিক বিভাজনের ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার, আমলা ও রাজনীতিবিদ—সব পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতায় পরিবর্তন প্রয়োজন। যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারত্বের ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন ও পদায়নের সংস্কৃতি গড়ে তোলা গেলে এ ধরনের সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন তারা।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অবসরে পাঠানোর প্রক্রিয়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি (এপিডি) অনুবিভাগের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সম্প্রতি বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের বিষয়ে জানতে এপিডি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আকনুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। এক্ষেত্রে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে যাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, তাদের কার্যক্রম ও সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তের কারণে অন্য সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্বিগ্ন বা শঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।’
বিতর্কিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডেপুটি কমিশনারের দায়িত্ব পালন করা ৩২ কর্মকর্তাকে গত সোমবার বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। এ কর্মকর্তাদের সবাই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। এছাড়া চলতি বছরের ১ মার্চ চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা মোতাবেক প্রাক্তন কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। এর আগে গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি চাকরির বয়স ২৫ বছর হওয়া ২২ জন সাবেক ডিসিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় অন্তর্বর্তী সরকার। বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো সবাই বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা।
এ ধরনের বাধ্যতামূলক অবসর দুর্ভাগ্যজনক বলে মনে করেন সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ পরিস্থিতির জন্য বর্তমান সরকারকে দায়ী করলে হবে না। অতীতে কিছু আমলা চরম মাত্রায় দলদাসত্ব করেছে, বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছে। তবে সবাই যে একই ধরনের আচরণ করেছেন, তা নয়। একই সঙ্গে রাজনীতিবিদদের একাংশও এসব কর্মকর্তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন। ফলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের একটি অংশকে নিয়ে শুদ্ধি অভিযানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এতে অনেক সময় দায়িত্বশীল ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তারাও ক্ষতির মুখে পড়েন। এটি রাষ্ট্রের জন্য যেমন ভালো নয়, তেমনি কোনো সরকারের জন্যও ইতিবাচক নয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান চাইলে আমলাদেরও নিজেদের চরিত্র ও মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। তাদের পেশাদারত্বে ফিরে আসতে হবে। একই সঙ্গে রাজনীতিবিদদেরও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।’
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী, চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর সরকার যেকোনো সময় কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে চাকরি থেকে অবসর দিতে পারে। জনপ্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তাদেরও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে। ২৩ জুলাই তিনজন ডিআইজি, ১২ জন অতিরিক্ত ডিআইজি ও দুজন পুলিশ সুপার পদমর্যাদার মোট ১৭ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এর আগে সরকার ৩৩ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে (১৪ জন ডিআইজি, ১৮ জন অতিরিক্ত ডিআইজি ও একজন এসপি) বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। গত ৩ মে ১৭ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে এবং ২২ এপ্রিল একই বিধানে ১১ জন ডিআইজি ও দুজন অতিরিক্ত ডিআইজিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সময় বিতর্কিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাসহ নানা অভিযোগে আরো ২০-২৫ জন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। প্রক্রিয়াটি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এসব কর্মকর্তা বিসিএস (পুলিশ) ১৫, ১৭, ১৮ ও ২০ ব্যাচের, যাদের মধ্যে উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) থেকে অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক (এডিশনাল আইজি) পর্যন্ত রয়েছেন।
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের আমলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে বিতর্কিত ভূমিকা রেখেছিলেন এমন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তারও একটি প্রাথমিক তালিকা করা হয়েছে। বর্তমানে তাদের একটি বড় অংশকে ওএসডি করে রাখা হয়েছে; যাদের মধ্যে বিসিএস ২১, ২২, ২৪, ২৫ ও ২৭তম ব্যাচের ডিসি; মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের পিএস (একান্ত সচিব) এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে, তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে।
জনপ্রশাসন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাধ্যতামূলক অবসর কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তাদের মতে, দেশে এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক বা অন্য কোনো নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমে আসে।
সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তারা মূলত রাজনৈতিক সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদিক হাসান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তারা মূলত রাজনৈতিক সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। তাদের নিজস্বভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ সীমিত। সম্প্রতি যেসব কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হচ্ছে ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় তারা জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু একজন জেলা প্রশাসকের তো রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন না করার সুযোগ থাকে না। আইন অনুযায়ী তাকে সেই দায়িত্ব পালন করতেই হয়। সে অর্থে তারা অনেকটা পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। এ ধরনের সংস্কৃতি অবশ্য নতুন নয়। ১৯৯১ সালের পর থেকে সরকার পরিবর্তনের প্রায় প্রতিটি পর্বেই দেখা গেছে, নতুন সরকার এসে আগের সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের কাউকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে, কাউকে ওএসডি করেছে, আবার কাউকে চাকরি থেকে সরিয়ে দিয়েছে।’
লোকপ্রশাসন বিভাগের এ অধ্যাপক বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে দেশে একটি কার্যকর, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক সিভিল সার্ভিস গড়ে তোলা কঠিন হবে। কারণ কর্মকর্তাদের মধ্যে সবসময় অনিশ্চয়তা ও ভয়ের পরিবেশ থাকবে। আমার মতে, রাজনৈতিক সরকারগুলোর উচিত সিভিল সার্ভিসকে আস্থায় নেয়া। নিজেদের লোক খুঁজে বের করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যদি কোনো কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন বা অসদাচরণ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনটি জাতীয় নির্বাচনের (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনকে সভাপতি করে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করে। এতে বলা হয়, তিনটি নির্বাচনের অভিনব পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয় এবং বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ সেল গঠন করা হয়, যা নির্বাচন সেল নামে পরিচিত লাভ করে। ২০১৪-২০২৪ পর্যন্ত নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে ওঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি। নির্বাচনি অনিয়মে কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী যুক্ত থাকায় এবং তদন্ত কমিশনের জন্য বরাদ্দকৃত সময় অপ্রতুল হওয়ায় সুনির্দিষ্টভাবে এদের নাম ও কার কী ভূমিকা ছিল, তা বের করা সম্ভব হয়নি।
সরকারি কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরের বিষয়ে সাবেক সচিব ড. আবুল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত কর্মদক্ষতা, আচরণ কিংবা কোনো অপরাধমূলক অভিযোগ থাকলে সেগুলো বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। একসঙ্গে অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলে তা ইতিবাচক বার্তা দেয় না। এতে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিতে কর্মকর্তাদের মধ্যে অনীহা তৈরি হতে পারে। যাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেয়া হবে, তারাও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ইতস্তত বোধ করবেন। কর্মকর্তাদের মনে সবসময় এ আশঙ্কা থাকে যে ভবিষ্যতে কোনো কারণে তাদেরও একই পরিণতির মুখে পড়তে হতে পারে। তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সে সাহস আর থাকবে না।’
সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও কার্যকর কর্মসম্পর্ক থাকা প্রয়োজন জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘যাদের দায়িত্ব দেয়া হবে, তারা যেন দেশের স্বার্থে নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু যদি পদায়নে রাজনৈতিক পরিচয় বা আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়া হয়, তাহলে সিদ্ধান্তগুলো বিতর্কিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রেরই ক্ষতি হয়।’