যশোরের ঐতিহ্যবাহী লোহাপট্টি

৫০ কোটির বাজার নেমেছে অর্ধেকেরও কমে ব্যবসা ছাড়ছেন অনেকে

যশোর শহরের লোহাপট্টি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এখানে স্ক্র্যাপ লোহা ৪৫-৫০ টাকা কেজি দরে বেচাকেনা হচ্ছে।

যশোরের ঐতিহ্যবাহী ‘লোহাপট্টি’তে লৌহ পণ্যের ব্যবসায় মন্দা চলছে। একসময় সেখানে বছরে অর্ধশত কোটি টাকার ব্যবসা হতো, আজ চড়া দামের বাজারেও সে বেচাকেনা নেমেছে ২০ কোটিরও নিচে। অনেকে এ ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। আবার যারা আছেন তাদের বেশির ভাগই ক্রেতাহীন দোকানে অলস সময় পার করেন। ব্যবসায়ীরা জানান, উন্নয়ন প্রকল্পে স্থবিরতা, কল-কারখানায় কাজ কম আসা ও ক্রেতা খরার কারণে বেচাকেনা অর্ধেকে নেমে এসেছে।

যশোর শহরের লোহাপট্টি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এখানে স্ক্র্যাপ লোহা ৪৫-৫০ টাকা কেজি দরে বেচাকেনা হচ্ছে। লোহার প্লেট ১০০-১২০ টাকা কেজি, লোহার পাইপ আকারভেদে ৮০-১৫০ কেজি, শেপ ১২০-১৫০ টাকা, এক্সেল ৭০-৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে এসব পণ্যের দাম গত এক বছরের তুলনায় কম বলেই দাবি ব্যবসায়ীদের। এছাড়া দা, বঁটিসহ বিভিন্ন ধরনের লৌহজাত পণ্য প্রতিটি ২০০ থেকে হাজার টাকায় এবং কেজি হিসাবে ৩৫০-৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, লৌহজাত এসব পণ্যের দাম এখন কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। তবে বেচাকেনা আগের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। রডের দাম যখন ১৬-২০ টাকা কেজি ছিল, তখনো এ বাজারে বছরে ৫০ কোটি টাকার বেচাকেনা হতো। এখন ২০ কোটি ছাড়ানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

চার দশকের বেশি সময় ধরে লোহাপট্টিতে ব্যবসা করে আসছেন অন্তরা বিয়ারিং হাউজের স্বত্বাধিকারী ওলিয়ার রহমান। সব ধরনের বিয়ারিং, শেপসহ সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ বিক্রি করেন তিনি। ইট-পাথর ভাঙা মেশিনসহ ছোটখাটো মিল কলকারখানা ও নসিমন-করিমন তৈরিতে এসব যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়। তিনি জানান, উন্নয়নকাজ কমে যাওয়ায় এখন ব্যবসাও কমে গেছে। একসময় তার দোকানে দৈনিক ২০-৩০ হাজার টাকার বেচাকেনা হতো। এখন ১০-১২ হাজারের বেশি বেচাকেনা হচ্ছে না।

লোহাপট্টির নিউ ফাতেমা আয়রনের স্বত্বাধিকারী মাসুদ পারভেজ ব্যবসা করছেন ২০ বছর ধরে। তিনি জানান, লোহাপট্টিতে লোহার দাম বাড়েনি। বাজারে রডের দাম যখন ১১০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল, তখনো লোহাপট্টিতে পণ্যের দাম কম ছিল। কিন্তু বাজারে পণ্যের চাহিদা কম, ক্রেতাও কম। কোনো কোনো দোকানে সারাদিনই মাছি মারার মতো বসে থাকতে হয়।

এ ব্যবসায়ীর দাবি, বর্তমানে সরকারি প্রকল্প, বেসরকারি প্রজেক্টের কাজ অনেক কমে গেছে। পাশাপাশি অনেক কলকারখানা বন্ধ বা কাজ কমে গেছে। ফলে এসব জায়গায় মালের চাহিদা অনেক কমে গেছে। যে কারণে বেচাবিক্রিও কমেছে।

নজরুল আয়রন স্টোরের ব্যবসায়ী ইকরামুল ইসলাম রিংকু বলেন, ‘এমনিতেই লোহাপট্টির জৌলুস আর নেই। এখন এ এলাকার বাণিজ্যিক গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। ফলে দোকান ভাড়া, অ্যাডভান্স তিন থেকে পাঁচ গুণ বেড়েছে। এত ব্যয় করে এখানে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন। অনেকেই এ ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন।’

ব্যবসায়ী ইকরামুল ইসলাম জানান, আগে প্রতিদিন গড়ে ২০০-৩০০ কেজি লোহা ও লৌহজাত পণ্য বিক্রি হতো। এখন এ পরিমাণ মালামাল বিক্রি করতে প্রায় পুরো সপ্তাহ লেগে যায়।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যশোরের বহুল পরিচিত লৌহজাত পণ্যের মোকাম ‘লোহাপট্টি’তে একসময় ১২০টির মতো দোকান ছিল। এখন তা অর্ধশতের নিচে নেমে এসেছে। আগে প্রতিটি দোকানে দৈনিক গড়ে ২০ হাজার টাকার বেচাকেনা হিসাব করলেও বছরে অর্ধশত কোটি টাকার বাজার ছাড়িয়ে যেত।

তারা জানান, লোহাপট্টির ব্যবসায়ীরা রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, মোংলাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পুরনো লোহা সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। বিশেষ করে চট্টগ্রাম থেকে ট্রাকে করে জাহাজ কাটা লোহার মালপত্র এখানে আনা হয়। এছাড়া পুরনো বার্জ, কার্গোর বিক্রি করা লোহার মালপত্র, ছোট-বড় বিভিন্ন মিল, কলকারখানার ব্যবহৃত-অব্যবহৃত যন্ত্রাংশ এবং আশপাশ এলাকার যেসব পুরনো ভবন ভাঙা হয়, সেসব ভবনের বিক্রি করা লোহাও এখানে বেচাকেনা হয়। আবার নিলামের মাধ্যমেও এখানকার ব্যবসায়ীরা পুরনো লোহার মালপত্র কেনেন।

এসব লোহা লোহাপট্টি থেকে যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, পাবনা, বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর জেলাসহ সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গে সরবরাহ করা হয়। নসিমন, করিমন থেকে শুরু করে স্থানীয়ভাবে নির্মিত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, ছোট ছোট কলকারখানা, গৃহস্থালিসহ নানা কাজে ব্যবহারের জন্য এখান থেকে লৌহজাত পণ্য কেনেন ক্রেতারা। এছাড়া লোহার, পাইপ, নাট-বল্টু, বিয়ারিং, শেপ, ঢালাই লোহা, ইঞ্জিন বক্স, বিভিন্ন মেশিনারিজের যন্ত্রাংশ এখানে পাওয়া যায়।

যশোরের লোহাপট্টি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এমএস সাইদুর রহমান বাবু জানান, ষাটের দশকে গোহাটা সড়কে লোহার ব্যবসা শুরু হয়। ৮০ ও ৯০-এর দশকে এর ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। একপর্যায়ে এখানে লোহার দোকানের সংখ্যা ১২০টি ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু বর্তমানে এর সংখ্যা অর্ধশতের নিচে। তিনি আরো জানান, মার্কেটে একসময় বছরে অর্ধশত কোটি টাকার বেচাকেনা হতো। যখন রডের দাম ১৬-২০ টাকা কেজি ছিল, তখন এ বেচাকেনা ছিল। এখন রডের দাম ৯০ টাকা কেজি। অথচ এখন এ মার্কেটে বেচাকেনা ২০ কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছে।

আরও