বিবিএসের জরিপ

জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশের ৪৭ শতাংশ মানুষ

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছন্দে ফেরেনি। দেশে জানমাল ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষ উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছন্দে ফেরেনি। দেশে জানমাল ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষ উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। শারীরিক হামলা, ঘরবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ এবং মূল্যবান সম্পদের নিরাপত্তা নিয়েও এক ধরনের শঙ্কা কাজ করছে। সরকার ডেভিল হান্ট, ডেভিল হান্ট ফেজ-২-সহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও আইন-শৃঙ্খলায় স্বস্তি ফেরেনি, আতঙ্ক কাটেনি সাধারণ মানুষের। এমন তথ্যই উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে (সিপিএস) ২০২৫-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। জরিপে দেখা গেছে, জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন ৪৭ দশমিক ১৭ শতাংশ মানুষ। এছাড়া দেশের ৩৩ দশমিক ৯১ শতাংশ মানুষ শারীরিক হামলার আশঙ্কায় থাকার কথা বলেছেন। ঘরবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানে হামলার শঙ্কার কথা জানিয়েছেন ৪১ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশের ৬৪ জেলার ৪৫ হাজার ৮৮৮টি খানায় এ জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী মোট ৮৪ হাজার ৮০৭ জন নারী ও পুরুষ অংশ নেন। নাগরিকদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে নিরাপত্তা, সুশাসন, সরকারি সেবার মান, দুর্নীতি, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার ও বৈষম্যসংক্রান্ত ছয়টি লক্ষ্য মূল্যায়নের জন্য জরিপটি করা হয়েছে। জরিপে দেশের জনগণের নিরাপত্তা ও ভীতির তথ্য উঠে এসেছে। ৮৪ দশমিক ৮১ শতাংশ মানুষ নিজের আঙিনায় নির্বিঘ্নে চলাফেরা নিরাপদ মনে করলেও শারীরিক হামলা, সম্পদ ভাংচুর, মূল্যবান সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। পুরুষের চেয়ে নারীদের ক্ষেত্রে উদ্বিগ্নের হার বেশি। গরিব শ্রেণীর চেয়ে ধনীরা বেশি উদ্বেগ রয়েছে, এমন তথ্যও উঠে এসেছে জরিপে।

জরিপে দেখা যায়, দেশের মানুষ নিজেদের মূল্যবান সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। দেশের প্রায় অর্ধেক (৪৭ দশমিক ১৭ শতাংশ) মানুষ নিজেদের মূল্যবান সম্পদ চুরি, ভাংচুর হওয়া নিয়ে বেশি চিন্তিত। উদ্বিগ্ন মানুষদের এ হার গ্রামের চেয়ে শহরে বেশি। শহরের প্রায় ৫০ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং গ্রামের ৪৫ দশমিক ৬১ শতাংশ মানুষ নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। বিভাগভেদে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন রাজধানী ঢাকার মানুষ। ঢাকার ৫৯ দশমিক ১৭ শতাংশ মানুষ উদ্বিগ্ন মূল্যবান সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে। এরপর আছে বরিশাল ৫৪ দশমিক ২১, ময়মনসিংহের ৪৬, রংপুরের ৪৬, চট্টগ্রামের ৪৩ দশমিক ৬১, রাজশাহীর প্রায় ৪১, সিলেটের ৩৭ শতাংশ এবং সবচেয়ে কম চিন্তিত খুলনার (৩৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ) মানুষ। এক্ষেত্রেও নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি উদ্বিগ্ন। ৫১ শতাংশ ধনী শ্রেণীর বিপরীতে গরিব শ্রেণীতে উদ্বিগ্ন মানুষের হার ৪১ দশমিক ১৬ শতাংশ।

বিবিএসের উপপরিচালক (সেন্সাস উইং) ও পারসেপশন সার্ভের প্রকল্প পরিচালক রাশেদ-ই-মাসতাহাব বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেদনটি মূলত করা হয়েছে মন্ত্রিপরিষদের আকাঙ্ক্ষা থেকে। আমাদের জরিপে দেশের মানুষ নিরাপত্তা নিয়ে কী ভাবছে সেটি উঠে এসেছে। নিজের এরিয়ায় প্রায় ৮৬ শতাংশ মানুষ নিরাপদ মনে করে। কিন্তু সেটা কত মিটারের মধ্যে সেটা বলা যাবে না। জরিপে মানুষ উদ্বেগের কথা জানিয়েছে, শঙ্কার কথা বলেছে। এ জরিপ ২০১৮ সালে প্রথমবার করেছিল আইন ও বিচার বিভাগ। তিন বছর পর পর করার কথা থাকলেও ২০২২ সালে আর হয়নি। এখন আবার আমরা করলাম।’

জরিপে দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৩ দশমিক ৯১ শতাংশ মানুষ শারীরিকভাবে হামলার শিকার হওয়ার উদ্বেগ হওয়ার কথা বলেছেন। এর মধ্যে শহরে এ হার ৪১ দশমিক ২৮ শতাংশ, গ্রামে ৩০ দশমিক ৫০ শতাংশ। দেশের আট বিভাগের চেয়ে ঢাকা বিভাগের মানুষ শারীরিকভাবে আক্রমণের শিকার হওয়ার শঙ্কায় বেশি। বিভাগটির ৪৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ মানুষ উদ্বিগ্ন। এরপরে রয়েছে বরিশালের ৩৪ দশমিক শূন্য ৮, রংপুরের ৩২ দশমিক ২৩, চট্টগ্রামের ৩০ দশমিক ৫৪, রাজশাহীর ২৮ দশমিক ৩০, সিলেটের ২৫ দশমিক ২১, খুলনার ২৪ দশমিক ৬৯ এবং ময়মনসিংহ বিভাগের ২০ দশমিক ৬৯ শতাংশ মানুষ। পুরুষের (৩০ দশমিক ৭৩ শতাংশ) তুলনায় নারীরা (৩৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ) বেশি শারীরিক হামলার শিকার হওয়া নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় দেড় বছর হতে চললেও অন্তর্বর্তী সরকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুরু থেকে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের ব্যর্থতা, যথোপযোগী পদক্ষেপের অভাবে মানুষের নিরাপত্তা শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহি আকবরের মতে, সরকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে শুরু থেকে ব্যর্থ হয়েছে। যে কারণে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এখন সরকার ডেভিল হান্ট টু-এর ঘোষণা দিয়েছে। ডেভিল হান্ট টু যদি সফল হয় তাহলে নির্বাচন উৎসবমুখর হবে। যদি এটি আগের মতো হয় তাহলে একটি নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচন নাও পেতে পারি। আমার প্রত্যাশা হবে সরকার ডেভিল হান্ট টু সফল করবে।’

জরিপে দেখা গেছে, ঘরবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার শঙ্কায় রয়েছে ৪১ দশমিক ৭৪ শতাংশ মানুষ। শহরের প্রায় ৪৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। গ্রামে এ হার ৪০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। রাজধানী ঢাকার প্রায় ৫৩ শতাংশ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ও প্রতিষ্ঠান ভাংচুরের শঙ্কায় রয়েছে। এরপর বরিশালের ৪৮ দশমিক ৭১, রংপুরের ৪০ দশমিক ৩৭, চট্টগ্রামের ৩৭ দশমিক ৮৭, রাজশাহীর ৩৬ দশমিক ৭৫, ময়মনসিংহের ৩৬ দশমিক ৭৩, সিলেটের ৩৪ দশমিক ৩৯ এবং খুলনার ৩২ দশমিক ৭৭ শতাংশ মানুষ তাদের নিজেদের বাড়িঘর, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর, হামলা ও লুটপাটের শঙ্কায় রয়েছে। এ নিয়ে নারীরা (৪৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ) পুরুষের (৩৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ) তুলনায় বেশি উদ্বিগ্ন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘সাধারণ মানুষ দেখে যে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরে পুলিশ কত দ্রুত এবং কঠোরভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছে। তার ওপর ভিত্তি করেই মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়। পদক্ষেপ না নিতে পারলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। বর্তমানের বাস্তবতার নিরিখে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা আনা যাবে না। পাশাপাশি পুলিশের ঢিলেঢালা ভাব কমিয়ে এনে তাদের আরো সক্রিয় করতে হবে। পুলিশকে তার নিজের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। কোথাও কোথাও দেখেছি অপরাধ সংঘটিত হলেও তারা ব্যবস্থা নিতে পারছে না।’

বিবিএসের জরিপে আরো উঠে এসেছে নিরাপত্তায় ব্যবস্থা নিয়ে সন্তুষ্টির ক্ষেত্রে নিজের আঙিনায় নির্বিঘ্নে চলাফেরাকে নিরাপদ মনে করে দেশের ৮৪ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং রাতের বেলা ঘরকে নিরাপদ মনে করে ৯২ দশমিক ৫৪ মানুষ। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মতামত দিতে পারে ২৭ দশমিক ২৪ শতাংশ মানুষ। তবে ২১ দশমিক ৯৯ শতাংশ মানুষ মনে করেন এখানে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলে বিশ্বাস করে ২৪ দশমিক ৬২ শতাংশ মানুষ। বাংলাদেশে সরকারি সেবা নিতে ঘুস দেয়ার প্রবণতা বেড়েছে বলে জরিপে বলা হয়েছে। এখনো দেশের ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশ মানুষ ঘুস দিয়ে সরকারি পরিষেবা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে নোয়াখালী ও কুমিল্লা অঞ্চলের মানুষ সেবা নিতে বেশি ঘুস বিনিময় করে। এছাড়া সরকারি পরিষেবা নিয়ে সন্তুষ্টির কথা বলেছেন ৪৭ দশমিক ১২ শতাংশ মানুষ।

তবে আগের চেয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হয়েছে দাবি করেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুলিশের সক্ষমতার কথা বললে, আমাদের সক্ষমতা কিন্তু আগের মতোই আছে। দুই লাখ পুলিশ ফোর্স আছে, তাদের মনোবলও অনেকটা ফিরে এসেছে। এখন পুরোপুরি পেশাদারত্বের ভিত্তিতে সেবা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আইন মানার প্রবণতা কমেছে। এটার জন্য সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। ৫ আগস্টের পর থেকে এখন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে অনেক উন্নতি হয়েছে। নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশে সবসময় সহিংসতা হয়। এখন যে সহিংসতা হবে সেটা নির্বাচনকেন্দ্রিক। সে কারণে মনে হবে আইন-শৃঙ্খলা হয়তো চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটা আশা করি ঠিক হয়ে যাবে।’

আরও