দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা নোয়াখালী, জাতীয় রাজনীতি তথা সংসদ নির্বাচনে সবসময়ই আলোচনার অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল। ৪ হাজার ২০২ দশমিক ৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ জেলায় সংসদীয় আসন রয়েছে ছয়টি। ১৯৯১-২০০৮ সাল পর্যন্ত আসনগুলো ছিল বিএনপির দখলে। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে বিএনপির দুর্গখ্যাত ছয়টি আসনই চলে যায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দখলে। যদিও এর মধ্যে নোয়াখালী-৫ ও ৬ আসনে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে বিভিন্ন সময়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুরনো দুর্গে ফিরতে চান বিএনপি প্রার্থীরা। হেভিওয়েট প্রার্থী নিয়ে মাঠে নেমেছে দলটি। অবশ্য বসে নেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরাও। দল দুটির কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা প্রার্থী হয়েছেন। নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এর বাইরেও ভোটের মাঠে সরব উপস্থিতি রয়েছে ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের প্রার্থীদের।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, জেলায় মোট ভোটার ২৮ লাখ ৬৭ হাজার ৬৪১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৪ লাখ ৯৬ হাজার ৬৪৮ ও নারী ১৩ লাখ ৭০ হাজার ৯৭৯ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১৫ জন।
চাটখিল ও সোনাইমুড়ি উপজেলা আংশিক নিয়ে গঠিত নোয়াখালী-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন। আসনটিতে ১৯৯১ সালে বিএনপি থেকে সালাউদ্দিন কামরান এ আসনে নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি) সালের নির্বাচনেও সালা উদ্দিন কামরান জয়ী হন। অবশ্য একই বছরের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি থেকে মাহাবুবুর রহমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনেও মাহাবুবুর রহমান এবং ২০০৮ সালে বিএনপি থেকে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে ২০১৪-২০২৪ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য ছিলেন আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) এইচএম ইব্রাহিম। আসনটিতে স্বাধীনতার পর থেকে জামায়াতের কোনো প্রার্থীই জয়ী হতে পারেননি। এবার দলটি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ মোহাম্মদ সাইফ উল্লাহ। এছাড়া ভোটে লড়বেন ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের প্রার্থী মো. মশিউর রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রসের মো. মমিনুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির মো. নুরুল আমিন, স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ ইফতেখার উদ্দীন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের রেহানা বেগম ও ইসলামী আন্দোলনের জহিরুল ইসলাম।
নোয়াখালী-২ আসনটি সেনবাগ ও সোনাইমুড়ি উপজেলার আংশিক নিয়ে গঠিত। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন সাবেক বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক। এ আসনটিও ১৯৯১-২০০৮ সাল পর্যন্ত বিএনপির দখলে ছিল। টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য ছিলেন জয়নুল আবদিন ফারুক। যদিও ২০১৪-২০২৪ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য ছিলেন আওয়ামী লীগের মোরশেদ আলম। তিনি বেঙ্গল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এ আসন থেকেও কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হতে পারেননি জামায়াত প্রার্থী। এবার নির্বাচনে দলটির কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও জেলা নায়েবে আমির অধ্যক্ষ মাওলানা সাইয়্যেদ আহমদ মনোনয়ন পান। অবশ্য পরে ১০ দলীয় জোট থেকে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক সুলতান মুহাম্মদ জাকারিয়াকে সমর্থন জানানো হয়। জাকারিয়া দলীয় প্রতীক শাপলা কলি নিয়ে নির্বাচন করছেন। আসনটিতে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির মো. শাহাদৎ হোসেন, খেলাফত মজলিসের তোফাজ্জল হোসেন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের মো. মোশাররফ হোসেন মন্টু, ইসলামী আন্দোলনের খলিলুর রহমান, স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী মোহাম্মদ মফিজুর রহমান ও আবুল কালাম আজাদ।
নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনে ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু। এ আসনটিও ১৯৯১-২০০৮ সাল পর্যন্ত বিএনপির দখলে ছিল। তবে এখান থেকে বিএনপির হয়ে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বুলু। পরবর্তী সময়ে ২০১৪-২০২৪ সাল পর্যন্ত গ্লোব গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রশিদ কিরণ আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন। এবারের নির্বাচনে বরকত উল্লাহ বুলুর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা মো. বোরহান উদ্দিন। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উঠে আসতে ভোটারদের কাছে টানছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. রাজিব উদ দৌলা চৌধুরী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের মো. সিরাজ মিয়া, শরীফ আহমেদ (স্বতন্ত্র), খেলাফত মজলিসের মোরশেদ আলম ও ইসলামী আন্দোলনের মোহম্মদ নূর উদ্দিন।
সদর ও সুবর্ণচর উপজেলা নিয়ে গঠিত নোয়াখালী-৪ আসন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি ১৯৯১-২০০১ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য ছিলেন। তবে ২০০৮-২০২৪ সালে আসনটির দখল নেয় আওয়ামী লীগ। টানা ১৬ বছর সংসদ সদস্য ছিলেন একরামুল করিম চৌধুরী। এ আসনেও কোনো নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি জামায়াত প্রার্থী। এবারের নির্বাচনে দলের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও জেলা আমির ইসহাক খন্দকার দাঁড়িপাল্লা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া ভোটের মাঠে রয়েছেন ইনসানিয়াত বিপ্লবের মো. ইউনুস নবী, জাতীয় পার্টির মো. শরিফুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের মো. ফিরোজ আলম মাসুদ, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) বিটুল চন্দ্র তালুকদার, গণঅধিকার পরিষদের আবদুজ জাহের ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ ইস্তেয়াক হোসেন।
নোয়াখালী-৫ আসনে ১৯৯১ সালে জাতীয় পার্টি থেকে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর পর ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি থেকে এএইচএম এনামুল হক, একই বছরের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে ওবায়দুল কাদের, ২০০১ সালে বিএনপি থেকে পুনরায় ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে ২০০৮-২০২৪ সাল পর্যন্ত ওবায়দুল কাদের আসনটিতে সংসদ সদস্য ছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীত প্রতীকে নির্বাচন করছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান শিল্পপতি ফখরুল ইসলাম। আর দাঁড়িপাল্লা নিয়ে লড়ছেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসাইন। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভোটের মাঠে রয়েছেন ইসলামিক ফ্রন্টের মোহাম্মদ শামছুদ্দোহা, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের কামাল উদ্দিন পাটোয়ারী, মওদুদ আহমেদের স্ত্রী হাসনা জসীমউদ্দীন মওদুদ (স্বতন্ত্র), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবু নাছের, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) মুন তাহার বেগম, ওমর আলী (স্বতন্ত্র), জনতার দলের শওকত হোসেন, রিপাবলিকান পার্টির তৌহিদুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির খাজা তানভীর আহাম্মদ, খেলাফত মজলিসের আলী আহমদ, মোহাম্মদ ইউনুছ ও মোহাম্মদ নওশাদ।
জেলার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ আসন নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া)। এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামিম। যদিও এর আগে তিনি হাতিয়ার রাজনীতির সঙ্গে তেমন একটা যুক্ত ছিলেন না। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে অধ্যাপক ওয়ালি উল্যাহ, ১৯৯৬ সালে বিএনপি থেকে প্রকৌশলী ফজলুল আজিম, ২০০১ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ আলী নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রকৌশলী ফজলুল আজিম আবারো নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে এ আসন আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়। ২০১৪ ও ১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে আয়েশা ফেরদাউস নির্বাচিত হন। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে আয়েশা ফেরদাউসের স্বামী মোহাম্মদ আলী নির্বাচিত হন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন মো. মাহবুবের রহমান। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন প্রকৌশলী ফজলুল আজিম ও প্রকৌশলী তানভির আহমেদ। ফলে আসনটিতে বিএনপি প্রার্থীর জন্য বড় রকমের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ ও শাহবাগ থানা আমির শাহ মাহফুজুল হক নির্বাচন করলেও পরবর্তী সময়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য সমন্বয়ক হান্নান মাসউদকে সমর্থন জানানো হয়। এছাড়া ভোটের মাঠে সরব রয়েছেন এটিএম নবী উল্যাহ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের মোহাম্মদ আবদুল মোতালেব, গণঅধিকার পরিষদের মোহাম্মদ আজহার উদ্দিন, জাতীয় পার্টির (জাপা) নাছিম উদ্দিন মো. বায়েজীদ, ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম শরীফ, এলডিপির মোহাম্মদ আবুল হোসেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির আমিরুল ইসলাম মোহাম্মদ আবদুল মালেক, স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমীন ও শামীমা আজিম।
প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই প্রচারণা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন উন্নয়নের। এ বিষয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মাহাবুব আলমগীর আলো ও সদস্য সচিব হারুনুর রশিদ আজাদ বলেন, ‘নোয়াখালীকে একসময় বিএনপির ঘাঁটি বলা হতো। এখনো ছয়টি আসনই বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে রয়েছে। বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের একতরফা ভোটের কারণে আসনগুলো তাদের দখলে চলে যায়। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হলে ছয়টি আসনই পুনরায় তারা ফিরে পাবেন। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরায় নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত ও ঐক্যবদ্ধ। তাদের মাঝে এখন কোনো ভেদাভেদ ও বিরোধ নেই। সবাই ধানের শীষের প্রার্থীদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন।’
এদিকে জামায়াতসহ জোটের প্রার্থীরা সংঘবদ্ধভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এনসিপি, জামায়াতসহ তাদের জোট সক্রিয়ভাবে প্রত্যেকটি আসনে মিছিল, সভা-সেমিনার ও জনসভা করছে।