দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ

দৈনিক ৩১ জোড়ার সক্ষমতায় চলছে চার ট্রেন, নতুন একটি ঘিরে সামনে আসছে জটিলতা

বর্তমানে রেলওয়ের বহরে থাকা কোরিয়ান কোচের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৯ দশমিক ১৪ থেকে ১৯ দশমিক ৩০ মিটার। ইন্দোনেশিয়ান, চায়না ও পিএইচটি টাইপ কোচের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ দশমিক ৮ মিটার। লোকোমোটিভসহ ২০-২২টি কোচের রেক পরিচালনা তুলনামূলকভাবে সম্ভব হলেও কক্সবাজার ও পর্যটক এক্সপ্রেসে নিয়মিত ২২-২৬টি পর্যন্ত কোচ যুক্ত থাকে।

দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথে দৈনিক ৩১ জোড়া ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে চলছে মাত্র চার জোড়া ট্রেন। এর মধ্যেই ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের মহানগর এক্সপ্রেসের সার্ভিস কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে নতুন এ সার্ভিস চালুর প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অংশের সিঙ্গেল লাইন, স্বল্পদৈর্ঘ্যের লুপ লাইন, লোকোমোটিভ সংকট এবং কক্সবাজারে ওয়াশফিট ও মেরামত সুবিধার ঘাটতিতে নতুন এ ট্রেন চালানো ঘিরে সামনে আসছে নানা জটিলতা।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ চালুর আগে এর সঙ্গে সংযুক্ত পুরনো রেল অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। চট্টগ্রাম-দোহাজারী অংশের প্রায় ৫০ কিলোমিটার পুরনো মিটারগেজ সিঙ্গেল লাইন, কর্ণফুলী নদীর পুরনো সেতুর পরিবর্তে নতুন সেতু নির্মাণে ধীরগতি এবং বিভিন্ন স্টেশনের লুপ লাইন আধুনিকায়ন না হওয়ায় নতুন ট্রেন পরিচালনায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ষোলশহর-দোহাজারী অংশে ট্রেন ক্রসিং নিয়ে সমস্যা প্রকট।

রেলের সর্বশেষ ওয়ার্কিং টাইমটেবিল অনুযায়ী, ৪৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ষোলশহর-দোহাজারী পথে সাইডিং লাইন রয়েছে ১৫টি। কিন্তু এসব লাইনের অধিকাংশই ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এবং সে সময়ের তুলনামূলক ছোট ট্রেনের জন্য তৈরি। বর্তমানে ব্যবহৃত দীর্ঘ রেকের সঙ্গে এসব লুপ লাইনের দৈর্ঘ্যের সামঞ্জস্য নেই। ষোলশহর স্টেশনের দীর্ঘতম লুপ লাইন ৫০০ মিটার, জানালী হাটে ৪৭০ মিটার ও গোমদণ্ডীতে ৫৪০ মিটার। ধলঘাট, পটিয়া ও কাঞ্চননগরের লুপ লাইনগুলোর দৈর্ঘ্য ৩৬০ থেকে ৩৯০ মিটারের মধ্যে।

রেলওয়ে সূত্রের দাবি, জানালী হাট, গোমদণ্ডী ও ষোলশহর স্টেশনে ঢাকা-কক্সবাজার রুটের দীর্ঘ রেকের ট্রেনের ক্রসিং করা সম্ভব নয়। ফলে কোনো একটি ট্রেন সময়সূচি অনুযায়ী নির্ধারিত স্টেশনে পৌঁছতে ব্যর্থ হলে সেটিকে আগের কোনো স্টেশনে অপেক্ষা করাতে হতে পারে। এতে যাত্রার সময় ১ ঘণ্টা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে রেলওয়ের বহরে থাকা কোরিয়ান কোচের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৯ দশমিক ১৪ থেকে ১৯ দশমিক ৩০ মিটার। ইন্দোনেশিয়ান, চায়না ও পিএইচটি টাইপ কোচের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ দশমিক ৮ মিটার। লোকোমোটিভসহ ২০-২২টি কোচের রেক পরিচালনা তুলনামূলকভাবে সম্ভব হলেও কক্সবাজার ও পর্যটক এক্সপ্রেসে নিয়মিত ২২-২৬টি পর্যন্ত কোচ যুক্ত থাকে। ফলে ষোলশহর-দোহাজারী অংশের মধ্যবর্তী স্টেশনগুলোয় এসব ট্রেনকে সাইডলাইনে রেখে ক্রসিং করানো কঠিন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোকোমোটিভ সংকট। রেলওয়ের বিভিন্ন রুটে লোকোমোটিভ বিকল ও রিলিফ লোকোমোটিভের সংকটের কারণে সময়সূচি ব্যাহত হচ্ছে।

নতুন ট্রেন পরিচালনায় আরেকটি বড় সমস্যা কক্সবাজারে ওয়াশফিট ও হালকা মেরামত সুবিধার ঘাটতি। বর্তমানে কক্সবাজারে চলাচল করা ঢাকা-কক্সবাজার রুটের পর্যটক ও কক্সবাজার এক্সপ্রেসের ওয়াশফিট, সাময়িক যান্ত্রিক মেরামত কার্যক্রম পরিচালিত হয় ঢাকায়। কক্সবাজারে এসব সুবিধার অবকাঠামো শতভাগ নির্মাণ হয়নি। রয়েছে যন্ত্রপাতির সংকটও। আবার প্রয়োজনীয় জনবল ও লোকোমোটিভের টার্নটেবিল (লোকোমোটিভের সম্মুখভাগ পরিবর্তন) না থাকায় ট্রেন অপারেশন বিঘ্নিত হচ্ছে।

এ অবস্থার মধ্যেই মহানগর এক্সপ্রেসকে কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে। কয়েক মাস আগে রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এ ঘোষণা দেন। মাঠপর্যায়ের যাচাই-বাছাই শেষে আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে সার্ভিসটি চালুর প্রস্তুতি চলছে। বর্তমানে মহানগর এক্সপ্রেস ঢাকা-চট্টগ্রাম অংশে নরসিংদী, ভৈরববাজার, আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, কসবা, কুমিল্লা, লাকসাম, নাঙ্গলকোট, ফেনী ও কুমিরাসহ বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়। কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হলে এসব এলাকার যাত্রীরা সরাসরি পর্যটন নগরীতে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, কমলাপুর থেকে রাত সাড়ে ৮টায় ছেড়ে ট্রেনটি সকাল ৬টার দিকে কক্সবাজারে পৌঁছাবে। কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশে ফিরতি ট্রেন ছাড়বে সকাল ৯টায়। একদিকে যাত্রায় সময় লাগবে প্রায় সাড়ে ৯ ঘণ্টা। এরই মধ্যে পরিবহন বিভাগ, বাণিজ্যিক বিভাগসহ রেলের সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে সমন্বয় করে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

রেলের পরিবহন খাতের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে জানান, যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় নতুন ট্রেন চালুর এ উদ্যোগে বিদ্যমান রেল অবকাঠামোর সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসছে। কারণ ঢাকা-কক্সবাজার রেলপথের প্রায় দেড়শ কিলোমিটার অংশ এখনো সিঙ্গেল লাইন। এর সঙ্গে রয়েছে তীব্র লোকোমোটিভ সংকট। স্বল্পদৈর্ঘ্যের লুপ লাইন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত রিলিফ ট্রেন না থাকায় ট্রেন অপারেশন ঝুঁকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারাও।

সব সমস্যা সমাধান করেই মহানগর এক্সপ্রেসের সার্ভিস কক্সবাজার পর্যন্ত নেয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মো. সফিকুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে ট্রেন চললেও অন্যান্য জেলা থেকে সরাসরি যাত্রীরা কক্সবাজার যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। এ কারণে বিভিন্ন স্টেশনে বিরতি দিয়ে একটি ট্রেনকে কক্সবাজার পর্যন্ত নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ষোলশহর-দোহাজারী অংশের সিঙ্গেল লাইন ও লুপ লাইনের কারণে কিছু ক্রসিং সমস্যা অবশ্য রয়েছে। তবে প্রকৌশল বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।’

আরও