ডিসিদের নির্লিপ্ততায় বাড়ছে না করের পরিধি

জেলা পর্যায়ে রাজস্ব দপ্তরের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্বাবধান ও পরিবীক্ষণের দায়িত্ব জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) ওপর ন্যস্ত।

তবে কর আহরণের পরিধি বা করজাল সম্প্রসারণে তাদের কার্যকর সম্পৃক্ততা এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছেনি। ফলে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও কর নির্ধারণ, আদায় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর), তবুও মাঠ প্রশাসনের সক্ষমতা যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে করজাল বহু গুণ সম্প্রসারণ সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

স্থানীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্য, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন জেলা প্রশাসকরা। তাই তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের মাধ্যমেই নতুন করদাতা শনাক্তকরণ এবং কর অনুবর্তিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমান কাঠামোয় জেলা প্রশাসকদের সরাসরি কর আদায়ের দায়িত্ব না থাকলেও বিভিন্ন সেবা প্রদান ও লাইসেন্সিং কার্যক্রমে কর-অনুবর্তিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যেমন ভূমি রেজিস্ট্রেশন, ট্রেড লাইসেন্স বা অন্যান্য প্রশাসনিক সেবা প্রদানের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর রিটার্ন জমা আছে কিনা, তা যাচাই করা গেলে কর ফাঁকি অনেকাংশে কমে আসত। কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের কার্যকর এনফোর্সমেন্ট এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।’

ব্যাখ্যা করে এনবিআরের সাবেক এ চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘অনেক সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কর রিটার্ন প্রদর্শনের শর্ত থাকলেও সব ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়িত হয় না। ফলে করদাতা না হয়েও অনেকে সরকারি সেবা গ্রহণ করছে, যা রাজস্ব আহরণের পরিধি বাড়াতে বাধা সৃষ্টি করছে। জেলা প্রশাসনসহ অন্যান্য সেবা প্রদানকারী সংস্থা যদি নিজ নিজ পর্যায়ে কর-অনুবর্তিতা যাচাইয়ের দায়িত্ব পালন করে, তবে আলাদা করে কর আদায় না করেও রাজস্ব ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা সম্ভব। তবে বর্তমানে এ সমন্বয় ও এনফোর্সমেন্ট কাঠামো দুর্বল থাকায় রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত বৃদ্ধি হচ্ছে না।’

জেলা প্রশাসকের (ডিসি) পদটি দীর্ঘদিনের বিবর্তনের সাক্ষী। ১৭৭২ সালে পদটির মূল পরিচয় ছিল ‘কালেক্টর’ বা রাজস্ব সংগ্রাহক। পরে ১৭৮৬ সালে সেই কর্মকর্তারা ‘ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট’ হিসেবে দায়িত্ব পান। বর্তমানে তারা পরিচিত ‘জেলা প্রশাসক’ নামে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে জেলা প্রশাসকদের প্রধান দায়িত্ব ছিল দুটি—সরকারি রাজস্ব আহরণ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা। তারা সে আমল থেকেই বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, তবে ১৯৬০ সালে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের আমলে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়ন কার্যক্রমের দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের ওপর অর্পণ করা হয়। তখন থেকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ডেপুটি কমিশনার’ হিসেবে উন্নয়নমূলক দায়িত্বও পালন করতে শুরু করেন।

রাজস্ব আহরণে জেলা প্রশাসকদের কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে সুস্পষ্ট আইনগত কাঠামো তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আয়কর আইন, কর আইন ও কাস্টমস আইনের আওতায় বিভিন্ন ধরনের কর আহরণ করা হয়। কর নির্ধারণ (অ্যাসেসমেন্ট), আহরণ, কর প্রশাসন ও আইন বাস্তবায়নের দায়িত্ব এনবিআর এবং সংশ্লিষ্ট কর কমিশনারদের ওপর ন্যস্ত। জেলা পর্যায়েও কাস্টমস ও ট্যাক্স কমিশনাররা এ আইনগুলো প্রয়োগের দায়িত্ব পালন করেন। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকদের সম্পৃক্ত করতে হলে একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো প্রণয়ন করার প্রয়োজন হবে।’

করযোগ্য আয় করেন এমন পেশাজীবীদের তালিকা ও তাদের করজালের আওতায় নিয়ে আসতে গত বছর জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়েছিল সরকার। ওই বছর এর আগেই বার্ষিক সম্মেলনে এ বিষয়ে তারা প্রস্তাব রাখেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, জেলা, উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, আইনজীবীসহ সরকারি-বেসরকারি কর্মজীবীদের একটা অংশ করযোগ্য আয় করেন। তবে তাদের অনেকেই করজালের আওতাভুক্ত নন। যারা কর দেয়ার মতো আয় করছেন, কিন্তু কর দিচ্ছেন না তাদের তালিকা তৈরি করে কর আদায় করতে হবে।

জানতে চাইলে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কর আদায় ও আওতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এনবিআরের পক্ষ থেকে সহযোগিতা চাইলে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করি। এ কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয়।’

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে প্রায় সোয়া এক কোটি কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএনধারী) আছেন। এর মধ্যে গত বছর প্রায় সাড়ে ৪২ লাখ করদাতা নিজেদের আয়-ব্যয়ের খরচ জানিয়ে রিটার্ন জমা দিয়েছেন। বাকিরা রিটার্ন দেননি। আর দেশে প্রায় আট লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভ্যাটের জন্য নিবন্ধিত থাকলেও নিয়মিত রিটার্ন জমা দেয় সাড়ে পাঁচ লাখ প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ প্রায় ৩০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়েও রিটার্ন জমা দেয় না। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। আর আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেলা প্রশাসকরা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও করযোগ্য ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করে রাজস্ব কর্তৃপক্ষকে দিতে পারেন, যাতে করজালের আওতা বিস্তৃত হয়। জেলা পর্যায়ে নিয়মিত সমন্বয় সভা, সচেতনতা কার্যক্রম ও কর মেলার আয়োজনের মাধ্যমে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কর প্রদানে উৎসাহ বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে বকেয়া রাজস্ব আহরণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে তারা ভূমিকা রাখতে পারেন।

সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলার প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে জেলা প্রশাসক বিভিন্ন সরকারি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ রাখেন। আয়কর বিভাগ প্রয়োজন মনে করলে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চাইতে পারে। এক্ষেত্রে মূল দায়িত্ব ইনকাম ট্যাক্স বিভাগের হলেও তারা জেলা প্রশাসকদের সহযোগিতা নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে।’

ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের অধীন সম্পদ আরো দক্ষভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি সম্ভব বলে মনে করেন অনেকে। তারা বলছেন, এর জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় কর ও ভূমি তথ্যভাণ্ডার হালনাগাদ করা, সরকারি হাট-বাজার ও জলমহাল স্বচ্ছভাবে ই-ইজারা দেয়া এবং অবৈধ দখলমুক্ত করে খাসজমি বাণিজ্যিকভাবে লিজ দেয়ার মতো পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। সব মিলিয়ে জেলা প্রশাসকদের সরাসরি কর ধার্যের ক্ষমতা না থাকলেও তাদের প্রশাসনিক সমন্বয়, তদারকি ও সামাজিক প্রভাব করের পরিধি ও রাজস্ব আহরণ বাড়াতে একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে।

সাবেক সচিব শামীম আল মামুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘করের আওতা বাড়াতে জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা থাকতে পারে, তবে তাদের কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। এনবিআরের কর্মকর্তারা সাধারণত এ প্রক্রিয়া থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন। তাদের একটি অংশ জেলা প্রশাসকদের সম্পৃক্ততা চান না। কিন্তু ডিসিরা যুক্ত হলে করের ভিত্তি সম্প্রসারণ সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জেলা প্রশাসন থেকে যেহেতু ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করা হয়, তাই কারা লাইসেন্স নিয়েছে এবং তারা ব্যবসা করছে কিনা, এ তথ্য যাচাই করে যারা কর দিচ্ছে না তাদের মনিটর করা সম্ভব।’

চলতি অর্থবছর থেকে ৩৯ ধরনের সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দেখানো বাধ্যতামূলক করে সরকার। এসব সেবা নিতে হলে রিটার্ন দাখিল না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সেবা দিতে পারবে না এবং তা করলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তালিকায় রয়েছে ২০ লাখ টাকার বেশি ঋণ গ্রহণ, কোম্পানির পরিচালক বা স্পন্সর শেয়ারহোল্ডার হওয়া, আমদানি-রফতানি নিবন্ধন গ্রহণ বা নবায়ন, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, বিভিন্ন পেশাজীবী লাইসেন্স নবায়ন, জমি-ফ্ল্যাট ক্রয় বা হস্তান্তর নিবন্ধন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, ব্যাংক হিসাব ও সঞ্চয়পত্র, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, সরকারি-বেসরকারি বেতন গ্রহণ, মোটরযান নিবন্ধন, এনজিও কার্যক্রম, ই-কমার্স লাইসেন্স, দরপত্রে অংশগ্রহণ, ভবন নির্মাণ অনুমোদনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও প্রশাসনিক সেবা। এছাড়া বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ঋণপত্র খোলা, বড় অংকের আমানত, বিদেশী অনুদান ছাড়, বিভিন্ন লাইসেন্স নবায়ন, ক্লাব সদস্যপদ, সেবা প্রদান চুক্তি, আমদানি-রফতানি বিল দাখিল, হোটেল-হাসপাতাল লাইসেন্স নবায়ন এবং সামাজিক বা করপোরেট অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রেও রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে কর আদায়ের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে নতুন গ্রোথ সেন্টার ও বাজারগুলোতে করদাতাদের উদ্বুদ্ধ করে আয়কর, ভ্যাট ও টার্নওভার কর আদায়ে জেলা প্রশাসন নানা ধরনের সহায়তা করতে পারেন। তাছাড়া পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি আইন অনুসারে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা সার্টিফিকেট মামলার অফিসার হিসেবে বকেয়া কর আদায়ে সরাসরি ভূমিকা পালন করে থাকেন।’

আরও