দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বড় অংশই পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারিভাবে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশের ২১ হাজার ৮৬টি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৯ হাজার ৭৫৭টি বেসরকারি, যা মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশ। বাকিগুলোর মধ্যে ৬৯১টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আর ৬৩৮টি আপগ্রেডেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তবে গত ১২ মার্চ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এসব আপগ্রেডেড সরকারি বিদ্যালয়ের নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রাখার আদেশ জারি করেছে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাধ্যমিক পর্যায়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আধিক্য এ স্তরে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এসব বিদ্যালয়ের বেশির ভাগেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নেই। মানসম্মত শিক্ষকও নেই। এছাড়া সরকারি স্কুলগুলোর বেশির ভাগই শহরে অবস্থিত হওয়ায় গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে, যা শিক্ষায় বৈষম্য তৈরি করছে।
ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মাধ্যমিক স্তরে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৯৪ লাখ ৫ হাজার ৭৮৫। এর মধ্যে শহরাঞ্চলে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৯ লাখ ২৬ হাজার ৮৪৯ আর গ্রামাঞ্চলে ৬৪ লাখ ৭৮ হাজার ৯৩৬। গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠান বেশি শহরাঞ্চলে। ৬৯১টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৫২টি গ্রাম পর্যায়ে আর শহরাঞ্চলে অবস্থিত ৬৩৯টি।
৯৪ লাখ ৫ হাজার ৭৮৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ছেন ৮৭ লাখ ৪১ হাজার ৪৮০ জন আর সরকারি মাধ্যমিকে পড়ছেন ৫ লাখ ৭১ হাজার ৬৮১ জন। এছাড়া আপগ্রেডেড প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছেন ৯২ হাজার ৬২৪ জন। সে হিসেবে ৯২ দশমিক ৯৪ শতাংশ শিক্ষার্থীই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এসএম হাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতের জন্য নীতিমালা থাকলেও অনুসরণ করা হয় না। নামসর্বস্ব এমন অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যেগুলোয় শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নেই। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হলেও বিভিন্নভাবে দুর্নীতি-অনিয়মের ঘটনা ঘটছে, যা এ স্তরের শিক্ষার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে প্রয়োজনীয়সংখ্যক সরকারি স্কুল নেই। মানসম্মত বেসরকারি স্কুলেরও অভাব রয়েছে। ফলে এসব অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ব্যয়বহুল ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে চাইলে সরকারকে অবশ্যই মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বড় অংশ জাতীয়করণ করতে হবে। মেধাবী-দক্ষ শিক্ষক ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে যেসব স্কুলকে জাতীয়করণ করা হবে সেগুলোর শিক্ষকদের যোগ্যতা নিশ্চিত করা। এজন্য সরকার ধাপে ধাপে আত্তীকরণ করতে পারে। যারা সব শর্ত পূরণ করবে তাদের প্রথমে আত্তীকরণ করতে পারে। যারা পারবে না তাদের সময়সীমা দিতে পারে। ওই সময়ের মধ্যে শর্ত পূরণ করতে পারলে তাদের আত্তীকরণ করা হবে, অন্যথায় হবে না।’
ব্যানবেইসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত ৫০ বছরে দেশের বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়লেও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়নি। এ সময়ে মোট বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে ১২ হাজার ২৬৮টি। একই সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৪৯৬টি। এর মধ্যে ৩১৭টি প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হয় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের শাসনামলে (২০১১-২৩ সাল)। জাতীয়করণ করা হলেও এসব বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এমনকি নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতায় নতুন জাতীয়করণকৃত অনেক বিদ্যালয়ে সংকট থাকলেও শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না। শিক্ষাবিদরা বলছেন, যথাযথ পরিকল্পনা ও দক্ষ শিক্ষকের অভাবে এসব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হলেও প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার মানের উন্নয়ন ঘটেনি।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা যদি শিক্ষার ভিত্তি হয়, তাহলে মাধ্যমিক শিক্ষা হলো এর পরের ধাপ। সেটা যদি ঠিকমতো না হয়, তাহলে আমরা এগিয়ে যাওয়ার বদলে হোঁচটই খাব। বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারিভাবে পরিচালিত। কিছু অনিয়ন্ত্রিতও আছে, সেগুলোর মধ্যে কওমি মাদ্রাসা অন্যতম। সরকারের নিয়মতান্ত্রিক কোনো কাঠামোয় তারা নেই। যেগুলো আছে, তার বেশির ভাগই মূল ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত, কিন্তু তা এমপিওভুক্ত অথবা নিজেদের অর্থায়নে চলে। পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে চলে এমন সংখ্যা অতি নগণ্য। যেহেতু সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকে না, নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোয় চলার মতো তাদের সে ব্যবস্থাপনাই নেই। কোথাও আমরা দেখেছি গভর্নিং বডির অরাজকতা। এগুলো যখন অনুমোদন দেয়া হয়েছে তখন থেকেই একধরনের বিশৃঙ্খলা ছিল। আবার বিগত সরকারের সময় দেখা গেছে, প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রভাবে কোনো নিয়মনীতি না মেনে এমন অনেক জায়গায় বিদ্যালয় করা হয়েছে যেখানে কোনো প্রয়োজনই ছিল না।’
সরকারীকরণ করলেও রাজনৈতিক টানাপড়েন থেকে যাবে মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি পর্যায়ে যারা থাকেন তাদের এজেন্ডাই বাস্তবায়ন হবে। এত বিদ্যালয় তো একবারে সরকারীকরণ করা যাবে না। এটির নির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়া থাকতে হবে, সময় লাগবে। কিন্তু এ মুহূর্তে সদিচ্ছা থাকলে সরকার অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক করতে পারে। তাহলে অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করা সহজ হবে। শিক্ষার্থী কম ঝরে পড়বে। শিক্ষা অনেক ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। এখানে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। যারা পারছে তারা পড়ছে। এদিকে নজর দিতে হবে।’
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক শাখা) প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের মতো বিষয়গুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নেয়া হয়। তবে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে। এছাড়া আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গেও আলেচনা করছি, কীভাবে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার মান বাড়ানো যায়। আশা করি সরকার কর্মপরিকল্পনায় এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করবে।’