ভূগর্ভস্থ পানির আধারের দুই মিটারের মধ্যে ল্যান্ডফিলের তরল বর্জ্যের সংরক্ষণাগার

দূষণের ঝুঁকিতে খুলনা ও বরিশাল নগরীর সুপেয় পানি

কোনো স্থানে পচনশীল বর্জ্য ফেলে রাখলে ধীরে ধীরে তা পচতে শুরু করে। বর্জ্য পচার সঙ্গে সঙ্গে নির্গত হয় বিষাক্ত তরল পদার্থ (লিচেট)। স্বাস্থ্যসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অন্যতম শর্ত নির্গত বিষাক্ত তরল আলাদা করে ক্লে লেয়ার দিয়ে সংগ্রহ করে পরিশোধন করা।

কোনো স্থানে পচনশীল বর্জ্য ফেলে রাখলে ধীরে ধীরে তা পচতে শুরু করে। বর্জ্য পচার সঙ্গে সঙ্গে নির্গত হয় বিষাক্ত তরল পদার্থ (লিচেট)। স্বাস্থ্যসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অন্যতম শর্ত নির্গত বিষাক্ত তরল আলাদা করে ক্লে লেয়ার দিয়ে সংগ্রহ করে পরিশোধন করা। কিন্তু বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল ছাড়া কোথাও এ শর্ত মানা হচ্ছে না। ফলে দেশের বড় শহরগুলোয় বর্জ্য নির্গত তরল পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে খুলনা ও বরিশাল শহরের ল্যান্ডফিলের লিচেট ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের দুই মিটারের কম দূরত্বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত ল্যান্ডফিল খুলনা ও বরিশালের সুপেয় পানির উৎসের জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের বড় আটটি শহরের ল্যান্ডফিলের পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা করেছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন গবেষক। গবেষণায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ল্যান্ডফিলের পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে ল্যান্ডফিলের প্রভাবে মাটি, পানি ও বায়ু মারাত্মকভাবে দূষিত হতে পারে। ল্যান্ডফিল ব্যবস্থাপনার জন্য শর্ত হলো বর্জ্য নির্গত তরল আলাদা পুকুরে জমা করতে হয়। আর সে পুকুরের তলদেশ ও চারপাশে ক্লে বা প্লাস্টিকের নিরাপত্তা বেষ্টনী দেয়া প্রয়োজন। এতে নির্গত তরল আশপাশের কৃষিজমি, নদী-খাল কিংবা ভূগর্ভস্থ পানিতে ছড়িয়ে পড়বে না। কিন্তু ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ছাড়া দেশের অন্য ল্যান্ডফিলে লিচেট সংরক্ষণের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নেই। পরিবেশবিজ্ঞানীদের ভাষ্যমতে, লিচেটে ভারী-হালকা ধাতুসহ নানা ধরনের রাসায়নিক মিশ্রিত থাকে। এজন্য বর্জ্য পরিশোধনের সময়ও নির্গত তরল যাতে কোনোভাবেই মাটি বা পানির সঙ্গে মিশতে না পারে, সেজন্য বিশেষ সতর্কতা গ্রহণ করতে হয়। এছাড়া বর্জ্য নির্গত তরলকেও আলাদাভাবে পরিশোধনের পরই ড্রেন বা নিষ্কাশন লাইনে ছাড়তে হয়।

ল্যান্ডফিলে উৎপন্ন লিচেট মানবস্বাস্থ্যের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যের জন্যও হুমকি বলে জানিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমাদের সিটি করপোরেশনগুলো সঠিকভাবে লিচেট পরিশোধন করছে না। তাই আশপাশের কৃষিজমি ও জলাশয় যে মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ঝুঁকি কমাতে সিটি করপোরেশনকেই পদক্ষেপ নিতে হবে।’

গবেষণায় বলা হয়েছে, খুলনার বর্জ্যের ভাগাড়ের লিচেট থেকে ভূগর্ভস্থ পানির উৎসের দূরত্ব মাত্র ১ দশমিক ৯৫ মিটার, যা খুলনার মতো সুপেয় পানি সংকটে থাকা অঞ্চলের জন্য গুরুতর আশঙ্কার কথা। একইভাবে বরিশাল সিটি করপোরেশনের বর্জ্যের ভাগাড়ের লিচেট থেকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের দূরত্ব ২ দশমিক ৫৭ মিটার এবং চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে এ দূরত্ব ৫ দশমিক ৮৫ মিটার।

গবেষণায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ল্যান্ডফিল সম্পর্কে বলা হয়েছে, এগুলো নদী এবং সমুদ্রের খুব কাছাকাছি হওয়ায় বর্জ্য ও তরল বর্জ্যের দূষণ খুব দ্রতই ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় দেশের বিভিন্ন বর্জ্যের ভাগাড় কৃষিজমি, নদী ও খালে দূষণ ছড়াচ্ছে বলে প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরা।

গবেষক দলের সদস্য খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী হামিদুল বারী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এক ভয়ংকর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি শহর ছাড়া আর কোথাও বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা নেই। সব শহর-পৌরসভায় রাস্তার পাশে, কৃষিজমি ও নদীতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। খুলনায় আমরা যে চিত্র দেখেছি, এটার যদিও পরিবেশগত ঝুঁকি রয়েছে, কিন্তু নির্দিষ্ট একটা স্থানে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। আমরা এখানে ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে গবেষণা করেছি। তবে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও এতে পরিবেশ বিপর্যয় নেমে আসবে।’

খুলনা শহরে বসবাস করছে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। শহরটিতে সুপেয় পানির চাহিদা মেটানোর একমাত্র ভরসা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান খুলনা ওয়াসা। সাগরের নিকটবর্তী এলাকা হওয়ায় এ শহরের পানি কিছুটা নোনা স্বাদের, তাই স্থানীয়দের পানযোগ্য পানির চাহিদা মেটাতে সারা বছর চাপ থাকে খুলনা ওয়াসার ওপর। খুলনায় এ চাহিদা পূরণে ভূগর্ভের পানির ওপর অতিনির্ভরতা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ল্যান্ডফিলের লিচেট নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে নগরবাসীর সুপেয় পানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে।

অরক্ষিত লিচেট নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই মন্তব্য করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ‘লিচেট পন্ডের নিচে যদি কোনো আবরণ কিংবা প্রটেক্টর না দেয়া হয় সেটা অবশ্যই ভূগর্ভস্থ পানিতে গিয়ে মিশবে। এবার যত নিচ থেকেই পানি তোলা হোক না কেন সেটা পানিকে বিষাক্ত করেই ছাড়বে।’

খুলনা ও বরিশালের মতো পানি সংকটের জেলায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের এত কাছাকাছি লিচেট পন্ড অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এ দুই জেলাসহ সারা দেশের ভূগর্ভস্থ পানি সুরক্ষায় সরকারকে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য মাটির ওপরের পানি ব্যবহারের বিকল্প নেই। কিন্তু এখনো কৃষি থেকে শুরু করে খাওয়ার পানি—সব ক্ষেত্রেই আমরা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল।’

দেশের বিদ্যমান ল্যান্ডফিলগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরেকটি গবেষণা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদা পারভীন। তার গবেষণা প্রতিবেদনে ঢাকার দুই সিটির ল্যান্ডফিল সম্পর্কে বলা হয়, এগুলো থেকে নির্গত লিচেট পার্শ্ববর্তী কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। ভারী ধাতু ও পদার্থমিশ্রিত এসব লিচেট কৃষিজমিতে মিশে ফসল ও আশপাশের গাছপালায়ও ছড়িয়ে পড়ছে। এসব ফসল থেকে উৎপন্ন খাবার মানবদেহে ক্যান্সারসহ প্রাণঘাতী নানা ব্যাধির ঝুঁকি তৈরি করছে। জানতে চাইলে অধ্যাপক ফাহমিদা পারভীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা গবেষণায় দেখিয়েছি কীভাবে লিচেট পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী লিচেট যেখানে জমা হবে তার তলদেশ ছিদ্রমুক্ত হবে। অর্থাৎ তলদেশ এমনভাবে ঢালাই দিতে হবে বা পলির আস্তর দিতে হবে যাতে কোনোভাবেই নির্গত তরল মাটির সঙ্গে না মেশে। লিচেট মাটির সঙ্গে মিশলে তা কৃষিজমি ও ভূগর্ভস্থ পানির সঙ্গে মিশে যায়।’

গবেষণায় বরিশাল সিটি করপোরেশনের লিচেট পন্ডও ভূগর্ভস্থ পানির খুব কাছেই বলা হয়েছে। নগরীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিনিয়ত নিচে নামছে। উপরিভাগে পর্যাপ্ত উৎস থাকলেও খাওয়ার পানির জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে লাখ লাখ মানুষকে। একসময় গভীর নলকূপের মাধ্যমে সুপেয় পানি পাওয়া গেলেও এখন নগরবাসী সাবমারসিবল পাম্পে ঝুঁকছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীবেষ্টিত বরিশালেও নানা কারণে তীব্র হচ্ছে সুপেয় পানির সংকট। এর মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে লিচেটের মতো বিষাক্ত পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি।

আরও